আড়িয়াল বিল রক্ষা আন্দোলনকারীদের উপর রাষ্ট্রের নির্মম নিপীড়ন এবং এর বিপরীতে জনগণের সহিংস হয়ে ওঠার নেপথ্যে

তারিফ উল হক

“বর্তমান শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের সক্ষমতার অধিকাংশই অব্যবহৃত রেখে, কোন ধরণের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং পরিবেশগত সমীক্ষা না করে, জাতীয় পানি নীতি(১৯৯৯) ভঙ্গ করে, জলাভূমির উপর নির্ভরশীল জনগণের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষতি ও জনমতের তোয়াক্কা না করেই সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নতুন একটি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর স্থাপন করার। থাইল্যান্ডের সুবর্ণভূমি বিমান বন্দরের আদলে বঙ্গবন্ধু বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্দেশ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই এবং পরিবেশগত প্রতিক্রিয়া যাচাইয়ের আগেই মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর ও সিরাজদিখান এবং ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ ও দোহার এলাকার আড়িয়ল বিলের জমি অধিগ্রহণের নির্দেশ দিয়ে দিয়েছে সরকার। এরকম অধিগ্রহনের আদেশের একটি কপিতে দেখা যায় গত ১৩ ডিসেম্বর, ২০১০ তারিখে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ১৪ টি মৌজার প্রায় ২৫ হাজার একর ভূমি অধিগ্রহণের আদেশ জারি করা হয়েছে ।”_সূত্র নাইল্যাকাডা

আড়িয়ল বিলের জলাভূমি ও আবাদি জমি অধিগ্রহণের এই তৎপরতার বিরুদ্ধে গত ২৭ ডিসেম্বর ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কের প্রায় ১০ কিমি এলাকা সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত অবরোধ করে রাখে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর এবং ঢাকা জেলার নবাব গঞ্জ ও দোহার এলাকার হাজার হাজার অধিবাসী।





এর পালটা কর্মসূচি হিসেবে গত ৪ জানুয়ারি মঙ্গলবার দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকা-মাওয়া মহাসড়কে বিমানবন্দর নির্মাণের পক্ষে গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান এক মানব-বন্ধন আয়োজন করেন । মানব-বন্ধন এই শেষে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের চৌরাস্তায় এক সমাবেশে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আবদুল মান্নান খান বলেন, “বুকের রক্ত দিয়ে হলেও আড়িয়াল বিলে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর তৈরি করা হবে।” এ সমাবেশে তিনি আরো বলেন, “এ এলাকার একজন মানুষ জীবিত থাকতেও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণকাজে কেউ বাধা দিতে পারবে না ।”

এর পর না-না শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিল এলাকাবাসীরা বিল ভরাট করে বিমানবন্দর ও স্যাটেলাইট সিটি নির্মাণের বিরোধিতা¬¬¬¬¬¬¬ করে এসেছেন । নিচের ছবি গুলোতে আমরা এলাকাবাসীদের বিল রক্ষায় আমরণ লড়াইয়ের সংকল্প দেখতে পাব আবার দেখতে পাব সরকারের কাছে শান্তিপূর্ণ ভাবে তাদের দাবি জানোর চেষ্টাও । এই প্রতিবাদ বা দাবি প্রকাশের সময় পর্যন্ত জনগণ সহিংস হয়ে ওঠে নি, তারা শুধু এটাই বলতে চেয়েছিল যে সরকার তাদের উপর আগ্রাসন চালালে তাদের প্রাণ-প্রিয় আড়িয়াল বিল দখল করলে প্রয়োজনে তারা যে কোন কিছু করতে এমন কি জীবন দিতেও প্রস্তুত ।

আড়িয়াল বিল রক্ষার জন্য মুন্সিগঞ্জ এলাকাবাসীরা গঠন করেন “আড়িয়ল বিল রক্ষা কমিটি” । এই কমিটির আহ্বায়ক শাহজাহান বাদল এবং সদস্য-সচিব সাইদুর রহমান সাইদ । এছাড়া “আড়িয়ল বিল রক্ষা কমিটি-ঢাকা”র আহ্বায়ক ডা. ফখরুল ইসলাম চৌধুরী।
গত ১৮ জানুয়ারি আড়িয়ল বিল রক্ষা কমিটি জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে আড়িয়াল বিল দখল করে বিমান বন্দর তৈরি না করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে । এই সম্মেলনে “আড়িয়াল বিলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে উচ্ছেদ এবং ভূমিহীন ও বেকারত্বের মধ্যে ঠেলে দিয়ে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়,অমানবিক, অবৈজ্ঞানিক উপায়ে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও স্যাটেলাই সিটি স্থাপনের প্রতিবাদে” শীর্ষক এক প্রেস বিবৃতি প্রদান করা হয় । এ বিবৃতিতে বলা হয়, “বিদ্যমান এই অবস্থার প্রেক্ষিতে সাংবাদিক বন্ধুদের মাধ্যমে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমাদের আকুল আবেদন অবিলম্বে আড়িয়াল বিলে সম্পূর্ণ অমানবিক, বে-আইনী ও অ-প্রয়োজনীয় এ বিমান বন্দর স্থাপনের সিদ্ধান্ত বাতিল করবেন এবং লক্ষ লক্ষ মানুষকে বেকার, ভূমিহীন ও তাদের বাপ-দাদার বসত বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করবেন না । আমাদের সামনে খাদ্য সংকট অপেক্ষা করবে । আপনি বলেছেন না প্রতি ইঞ্চি জমি চাষ করতে হবে । সেই বিবেচনাতেও ২৫ হাজার একর জমি নষ্ট করা কি ভাবে চিন্তা করা হচ্ছে সেটাও আমরা ভেবে পাইনা । অন্যথায় জনতার আন্দোলন জনরোষে রূপ নিলে তার দায়-দায়িত্ব সরকারকেই বহন করতে হবে । অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত বাতিল না করলে পরিণতি যে কি হবে তা ভাবতেও আমাদের গা শিউরে ওঠে ।”
এর পর গত ২৬ জানুয়ারি দুপুর ৩ টায় আড়িয়ল বিল রক্ষা কমিটি ঢাকার মুক্তাঙ্গনে এক প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দেয় । এই সমাবেশের জন্য ঢাকা সিটি কর্পোরেশন ও ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনারের লিখিত অনুমতি থাকা সত্ত্বেও পুলিশ লাঠিচার্জ করে এই সমাবেশ পণ্ড করে দেয় ।

২৬ জানুয়ারি বিল রক্ষা কমিটিকে তাদের শান্তি পূর্ণ ও গণতান্ত্রিক উপায়ে আহূত কর্মসূচী পালন না করতে দেয়ার প্রতিবাদে তারা এক প্রেস বিবৃতি প্রদান করে এতে বলা হয়, “আড়িয়ল বিল রক্ষা কমিটির নেতা ডাঃ ফখরুল ইসলাম চৌধুরী, শাহজাহান খান বাদল, জিয়াউর রহমান জিয়ন, সাঈদুর রহমান সাঈদ, নাসিরুল আলম পলাশ, ফয়জুল হাকিম প্রমুখ নেতৃবৃন্দের নেতৃত্বে একটি শান্তিপূর্ণ মিছিল মুক্তাঙ্গনের দিকে বিকেল ৩.৩০ এর দিকে অগ্রসর হলে পুলিশ বিনা উস্কানিতে মিছিলে লাঠিচার্জ করে । ফলে ঘটনাস্থলে কয়েকজন আহত হন । নেতৃবৃন্দ এর পরবর্তীতে জাতীয় প্রেসক্লাবে এসে জড় হন ও উপস্থিতদের সম্মুখে বক্তব্য দিতে শুরু করলে সেখানেও পুলিশ চড়াও হয় ।” বিবৃতিতে আরো বলা হয়, “মুক্তাঙ্গনের সমাবেশে আসার পথে বাবুবাজার, হাঁসাড়া প্রভৃতি স্থানে শত শত বাস আটকে হাজার হাজার বিল এলাকাবাসীকে লাঠিচার্জ করে পুলিশ ।”এর পর থেকেই জনতা বুঝতে পারে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আর সংগ্রাম চালানো যাচ্ছে না । সমাবেশ করতে না দেয়া ও এলাকাবাসীদের উপর লাঠিচার্জের প্রতিবাদে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরের জনতা ঢাকা-মাওয়া সড়কে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে । প্রতিবাদী জনতা ঢাকা-মাওয়া সড়কে শতাধিক বাস পুড়িয়ে ফেলে । পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে শ্রীনগর এলাকার জাতীয় সংসদ সদস্য সুকুমার ঘোষ স্বয়ং উপস্থিত থেকে পুলিশকে দিয়ে গুলিবর্ষণ করেন । এতে ঘটনা স্থলে ৩ জন এলাকাবাসী আহত হন বলে বিল রক্ষা কমিটি বিবৃতিতে জানিয়েছে ।
২৬ তারিখ গুলি চালানোর পর ৩০ জানুয়ারি বিকাল থেকে পুনরায় ঢাকা-মাওয়া সড়ক অবরোধ ও ৩ তারিখ জাতীয় প্রেস ক্লাবে প্রতিবাদ সমাবেশের ঘোষণা দেয় বিল রক্ষা কমিটি ।

আমরা সকলেই ৩১ জানুয়ারি সোমবার মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগরে জনতার বিক্ষোভ সম্পর্কে অবগত আছি । সেখানে এক জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন । আহত হয়েছেন পুলিশ, সাংবাদিকসহ শত শত মানুষ । এর দায় ভার কার? জনতাকে হিংস্র হয়ে উঠতে বাধ্য করা হয়েছে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে, তাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে লাঠিচার্জ করে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে, তাদের উপর গুলি চালিয়ে ।

এর পরও আড়িয়াল বিল এলাকাবাসীর দাবি উপেক্ষিত রেখে বিল এলাকায় চলেছে পুলিশের বর্বর নির্যাতন। শেষ মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরে সোমবার সংঘর্ষ এবং পুলিশের ওপর হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে মঙ্গলবার ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ । বিভিন্ন মামলায় প্রায় ৬ হাজারের অধিক লোককে আসামী করা হয়েছে ।
পরবর্তীতে ২ জানুয়ারী আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা বাতিল ঘোষনা করা হয়েছে।

আর কত রক্ত আর কত প্রাণ এভাবেই কেড়ে নেবে এই অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন