সড়ক র্দুঘটনা ও রাষ্ট্রের বিচার


আবির হাসান

১৩ আগস্ট মারা গেলেন চলচিত্র ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদ, শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর পুত্র মিশুক মুনীর, গাড়ি চালক মোস্তাফিজুর রহমানসহ মোট পাঁচ জন। তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর নিজ যোগ্যতায় যে গুরুত্ব অর্জন করেছেন, সেই গুরুত্বের চাপে বাংলাদেশের সড়ক যোগাযোগের ব্যবস্থাই প্রশ্নের মুখে পড়েছে, নড়েচড়ে বসেছে সরকারও। কিন্তু কারও লেখাতেই গাড়ি চালক মোস্তাফিজুর রহমান ও জমির হোসেনের দিকটি বিবেচিত হয়নি, না বদরুদ্দীন উমর না ফারুক ওয়াসিফ কারো লেখাতেই আসিফ নজরুল তো সরাসরি ঘাতক বলেই দিয়েছেন। এক্ষেত্রে বামপন্থিদের ও ভদ্রলোকদের বিশ্লেষণ-ব্যাখ্যার কোন তফাৎ শ্রমিকরা খুঁজে পাবে না।

শুনেছি রামের হনুমানও দেবতা। তাহলে গাড়ি চালক মোস্তাফিজুর রহমানের লাশ অন্যদের সঙ্গে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য রাখা হলো না কেন? বিপ্লবী কবি মায়াকোভস্কির লাইন ক’টি খুবই প্রাসঙ্গিক-“সাত তোরণের থিবস নগরী গড়েছে কারা?/ইতিহাসে শুধু রাজাদেরই নাম পাবে।/পাথর কখনো রাজারা বয়েছে কাঁধে?”

একটি রাষ্ট্রের সড়ক-নৌ-রেল-বিমানসহ সমস্ত স্থাপনা কেমন হবে, তা নির্ভর করে রাষ্ট্রের চরিত্রের উপর। রাষ্ট্রের কর্তৃত্বে কারা আসীন, তার উপর। তাহলে আমাদের রাষ্ট্রের সড়ক-মহাসড়কগুলোর যে এত বাঁক, তার জন্যও শাসকশ্রেণীই দায়ী। প্রভাবশালীদের জমিজমা রক্ষা করতে গিয়েই ঠিকাদার-ইঞ্জিনিয়াররা রাস্তা ঘুরিয়ে দেন, গরিবের উপর দিয়ে চলে যায় সড়ক-মহাসড়ক। ফলে সৃষ্টি হয় দুর্ঘটনার স্পট ‘বাঁক’।

অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউট এর সাবেক পরিচালক ডঃ শামসুল হক সড়ক দুর্ঘটনার জন্য যে তিনটি বিষয়কে প্রধান কারণ বলেছেন, সেগুলো হচ্ছে সড়কের বিন্যাস, পরিকল্পনা ও পরিবেশ। এই তিনটি বিষয়ই ঠিক করেন রাষ্ট্রের পরিচালক শ্রেণী। এই রাষ্ট্রের পরিচালকশ্রেণী যদি স্বাধীন ও আত্মমর্যাদাশীল হত, তাহলে রাস্তা হত-সরল রেখার মতো। কারণ স্বাধীন ও জাতীয় পুঁজি গড়ে তুলতে হলে অপচয় ও দুর্নীতিমুক্ত পরিকল্পনা হাতে নিতে হয়। অন্যদিকে নদ-নদীগুলোকে মহাজল পথে ও উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া রেলপথ দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ খাতে পরিণত হত। ঢাকা-আরিচা সড়ক যখন পাকিস্তান আমলে তৈরি করা হয়, তখন সেই সময়ের রাজনীতিবিদরা তাদের বাড়ির নিকট দিয়ে রাস্তা নিয়ে যাওয়ার কারণে বিশাল একটি বাঁক তৈরি হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয় হয়েছে পেট্রোল ও শ্রমঘন্টা বাবদ।

রাস্তার বেহাল দশা ও অজ¯্র অ্যাকসিডেন্ট ওয়ালা সড়কে যানজট বাদ দিয়ে ১০/১২ ঘন্টা একজন মানুষ একটানা গাড়ি চালালে তার মাথার পরিস্থিতি কেমন হতে পারে, তা কি ভদ্রলোক শ্রেণী কল্পনা করতে পারে। জ্ঞানত একজন শ্রমিক একটি ইঁদুরও গাড়ি চাপা দিয়ে মারেন না। সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ ড্রাইভারদের প্রতি আহবানে বলেছে, ‘৪। একটানা পাঁচ ঘন্টার বেশি গাড়ি চালাবেন না।’ আজকের শাসক শ্রেণীর পক্ষে এই প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা কতটা সম্ভব? কারণ তাহলে পনের ঘন্টার রাস্তায় গাড়ি প্রতি তিনজন ড্রাইভার লাগবে। আগে শাসকশ্রেণী এই আইন পাস করুক-দূরত্বের অনুপাতে গাড়িতে ড্রাইভার রাখতে হবে, বাস্তবসম্মত মজুরি কাঠামো ঠিক করেই। তাহলে আরো কিছু লোকের কর্মসংস্থান হবে। সে যাই হোক, এরকম সড়ক ব্যবস্থায় কান্তিতে ভরা মাথা নিয়ে দুর্ঘটনা খুবই স্বাভাবিক। ভদ্রলোকরা দুর্ঘটনাকে অস্বাভাবিক মনে করতেই পারেন। কারণ ড্রাইভার, কন্ট্রাক্টর বা সুপারভাইজার, হেলাপারকে মানুষ মনে না করা মধ্যবিত্ত আচরণের অংশ হয়ে উঠেছে। কোন অধিকারে শ্রমিকদের গালি দেয়া হয়? রাষ্ট্র কি তাদের নৈতিক শিক্ষার কোন ব্যবস্থা চালু রেখেছে। বাংলাদেশে তো কত ধরনের পদকের ছড়াছড়ি। যেসব ড্রাইভারগণ চালক জীবনে গত ২০,১৫,১০ বছরে একটিও দুর্ঘটনা ঘটাননি তাঁদের রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত করতে পারি অথবা প্রতি জেলায় এরকম শ্রমিকদের তালিকা প্রচার মাধ্যমে প্রকাশ করে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিশেষ বোনাসের মাধ্যমে সম্মানিত করা যায়। এর ফলে তাঁরা নিজেদের সম্মানিত বোধ করতেন ও সচেতনতা তৈরি হতো।

সাধারণত পুঁজিপতিরা অফিস সিস্টেমে পরিবহন ব্যবসা চালায়, মজুরি কাঠামো ঠিক করে দেয়। কিন্তু আমাদের দেশে যে, মজুরি কাঠামো ঠিক করা আছে, তা গত ১৫/২০ বছরে একদিকে যেমন বাড়েনি, তেমনি অন্যদিকে চলছে কন্ট্রাক্ট সিস্টেম। মালিক তার মুনাফা নিশ্চিত করতে দৈনিক নির্দিষ্ট হারে টাকা জমা নেন। ফলে বাস ট্রাক শ্রমিকদের ঝুকি নিয়ে ওভারলোড, স্থানে স্থানে গাড়ি থামানো ও দ্রুত গতিতে গাড়ি চালাতে হয়। কিন্তু আমরা ভদ্রলোকরা তা দেখতে পাইনা, সামনে পাই শ্রমিককে, দে গালি। শ্রমিকের জন্ম পরিচয় ধরে গালি। মালিক ভদ্রলোক আড়ালেই থেকে যান।

আমরা বলছি না ড্রাইভারের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেনা, অসচেতনতায় ঘটতেই পারে। যেমন চলন্ত মোবাইলে কথা বলার কারণে। কিন্তু তাঁকে সাবধান করে দেওয়ার জন্য হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক পুলিশের ভুমিকা আছে। দুর্ঘটনার আগেই সাবধানতার কাজটি করতে হবে। বাড়িতে বউ-বাচ্চা রেখে একজন ড্রাইভারকে দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে বেড়াতে হয়, জরুরী ফোন তাই আসতেই পারে। কিল মারার গোঁসাই হলে চলবে না, ভাত দেওয়ার ভাতারও হতে হবে।

কেউ কেউ আবার শ্রমিক সংগঠনসমূহের দাপটের কথা বলছেন। পত্রিকাগুলোতে রিপোর্ট আসছে, শ্রমিক সংগঠনের বাধার কারণে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ড্রাইভারদের ফাঁসি দেয়া যাচ্ছে না। কিন্তু প্রকৃত ঘটনা হলো শ্রমিক সংগঠনগুলো অত্যন্ত দুর্বল। সংগঠন শক্তিশালী হলে শ্রমিকদের মজুরি বাড়তো, জীবনমানের অবস্থা উন্নত হতো, রাস্তা-ঘাট ঠিক হতো, নৌ ও রেলপথ প্রধান যোগাযোগ মাধ্যম হতো। আর যা হতো না, তাহলো আওয়ামীলীগ-বিএনপির দালাল নেতারা নেতৃত্ব দখল করতে পারতো না, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চেহারা এরকম হতো না, তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ পাচারের চক্রান্ত করার সাহস পেত না, বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম বাড়তো না। এবং আজকের আলোচ্য বিষয় দুর্ঘটনা, সেই দুর্ঘটনাও হতো না।

এতোকিছুর পরও ড্রাইভারদেরই ঘাতক বলা হয়। যারা নিজ জমি রক্ষায় রাস্তায় বাঁক তৈরি করেছে তারা নয়; যে ইঞ্জিনিয়ার-ঠিকাদার চুরি করে রাস্তা খারাপ করেছে তারা নয়; যাদের কারণে একজন ড্রাইভারকে একটানা ১০/১২ ঘন্টা চালাতে হয় তারাও নয়; যে পরিকল্পনাকারীদের কারণে সড়ক ব্যবস্থার এই হাল তারাও নয়; শুধু ড্রাইভারই ঘাতক। অর্থাৎ যারা ফাঁদ বসাবে তারা ঘাতক নয়; যারা ফাঁদের পা দেবে তারাই ঘাতক। মিডিয়া আমাদের মতামত তৈরি করে দিয়েছে-ড্রাইভারই ঘাতক। এবার যার নাম জমির হোসেন। হায়রে গরিবের পুত!

কিন্তু প্রতি বছর যারা স্পেকট্রামের মতো ভবন ধ্বসিয়ে নাম না জানা শত শত শ্রমিককে হত্যা করে, মেইন গেট লাগিয়ে শ্রমিক পোঁড়েন, সেই সব গার্মেন্টস মালিকেরা ঘাতক নন; ত্রুটিপূর্ণ লঞ্চ ডুবিয়ে এক ক্ষেপে ৪০০/৫০০ মানুষ মারেন, এইসব মালিকও ঘাতক নন। তাদের মৃত্যুদন্ডের দাবি কোথাও ওঠে না! কারণ রাষ্ট্রের পরিচালক তারাই, পত্রিকা-চ্যানেলের মালিকও। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “আমি শুনে হাসি, আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে-/তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে\”

পুলিশ বলেছে, জমির হোসেনের পালানোটাই প্রমাণ করে সে দোষী। কিন্তু আসলেই কি তাই? পুলিশ নিজেই যেখানে গণপিটুনিতে সাহায্য করে, সেখানে ড্রাইভার জমির হোসেন দাঁড়িয়ে মৃত্যু বরণ করলে বুঝি সকলে খুশি হতো! আর অ্যাকসিডেন্ট হলেই ড্রাইভার-হেলপারকে গণপিটুনি দেওয়ার এই সংস্কৃতি কি চালু নেই?

রাষ্ট্র যে একটি শ্রেণীর তা আবার প্রমাণিত হলো। আর আদালতে ঘাতক প্রমাণিত হওয়ার আগেই মিডিয়া যখন ঘাতক বলে তখন এটা কি এক ধরনের আইন হাতে তুলে নেওয়া নয়? আর আমরা যারা এতে সায় দিলাম তাদের নিজেদের চেহারা দেখবার সুযোগ মিললো আর একবার। আর জানলাম শ্রমিক ছাড়া শ্রমিকের কোন আপনজন নাই। কারণ জমির হোসেনের মুক্তির দাবিতে চুয়াডাঙ্গা জেলার শ্রমিকেরা ধর্মঘট ডেকেছে। তাঁদের অভিনন্দন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন