ভাষার আন্দোলন


আবির হাসান

ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়- একটি রাষ্ট্রের বিকাশের প্রশ্নে, সংহত হওয়ার প্রশ্নে ভাষা সমস্যার সমাধান খুবই জরুরি। তাই পাকিস্তান রাষ্ট্রের গোড়াতে ভাষাপ্রশ্ন সামনে চলে আসে, চলে আসে কর্র্তৃত্ত্ব, অধিকার ও হারানোর দিক। কোন ভাষাভাাষিরা কর্তৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করবে আর কারা তার শিকার হবে এটি সকল রাজনৈতিক শক্তির বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

পূর্ব বাংলার ‘কমিউনিস্টরা’ সে সময়কালে পার্টিগতভাবে (ব্যক্তিগতভাবে দুই/একজন অন্যান্য ভাষার স্বীকৃতির প্রস্তাব তুলেছিলেন) ভাষা আন্দোলনের সময় উর্দূভাষার, প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের, দাবির বিপরীতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাভাষার দাবি তুলেছিলেন এবং সক্রিয়ভাবে আন্দোলনও করেছিলেন, আর এ কাজকে একটি বিরাট ‘বৈপ্লবিক’ কাজ বলে ফলাও করে বেড়াচ্ছেন। সে সময় পাকিস্তানে বহু ভাষা-ভাষির লোক ছিলেন, এর মধ্যে প্রধানত বাংলা, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচি ও পশতু ভাষা-ভাষীর লোক সংখ্যাই ছিল প্রায় ৯৭ শতাংশ। আর বাংলাই ছিল সমগ্রদেশের সংখ্যাগুরু জনসংখ্যার ভাষা। উর্দূ মুলত কারো ভাষা ছিল না-এ ভাষা শুধুমাত্র বাঙালিদের উপরই সে সময়ের প্রতিক্রিয়াশীল সরকার চাপিয়ে দেয় নি- তা চাপিয়েছিল পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচি ও পশতু ভাষাভাষিসহ সমগ্র দেশের অন্যান্য ভাষাভাষিদের উপরেও। তৎকালীন প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের ওটাই ছিল পাকিস্তানের সমস্ত শ্রমিকশ্রেণীসহ সমস্ত জনসাধারণকে বিভক্তির দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার প্রথম চাল। সে ক্ষেত্রে উর্দূর বিপরীতে শুধুমাত্র বাংলা বা উর্দূর সঙ্গে বাংলার দাবির প্রশ্নটা কি ‘কমিউনিস্টদের’ উত্থাপন যুক্তিসংগত ছিল? অন্যান্য ভাষা-ভাষীদের উপর উর্দূর সঙ্গে বাংলা চাপিয়ে দেওয়ার যৌক্তিকতা ‘কমিউনিস্টরা’ কোথা থেকে আমদানি করলেন? এভাবে একটি রাষ্ট্রের মধ্যে শ্রমিকশ্রেণী-তথা নিপীড়িত জনগণের সংহতি বিনষ্ট করা হয়নি? কমিউনিস্টদের ওই জাত্যাভিমানী আন্দোলন কি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে ভাগ কর ও শাসন-শোষণের ক্ষেত্রকে প্রস্তুতে সহায়তা করেনি? কমিউনিস্টদের পার্টিগতভাবে কি উচিত ছিল না- বাংলা ও উর্দূর সঙ্গে পাঞ্জাবি, পশতু, সিন্ধি ও বেলুচি ভাষার দাবি তোলা? আমরা আবারো লেনিনে ফিরে যাই। দেখি তিনি তাঁর ‘জাতীয় সমস্যার সমালোচনামুলক মন্তব্য’ প্রবন্ধে বলেছেন, “সর্ববিধ বিশেষ সুবিধা যদি লোপ পায়, একটি ভাষাকে জোর করে চাপানো যদি বন্ধ হয়, তাহলে স্লাভ জাতিরা সকলেই সহজে ও সত্বর পরস্পরকে বুঝতে শুরু করবে, এবং সাধারণ লোকসভায় বিভিন্ন ভাষায় বক্তৃতা হচ্ছে এই ‘ভয়ঙ্কর’ ব্যাপারে মোটেই ভয় পাবে না। এবং নির্দিষ্ট দেশটির অর্থনৈতিক আদান-প্রদানের স্বার্থেই আপনা থেকেই নির্ধারিত হয়ে যাবে কোন বিশেষ ভাষাটি বাণিজ্যিক সংশ্রবের দিক থেকে বেশির ভাগের পক্ষে সুবিধাজনক। এ নির্ধারণ হবে অনেক বেশি সুদৃঢ় এই কারণে যে বিভিন্ন জাতির লোকেরা সে ভাষা গ্রহণ করছে স্বেচ্ছায়; এবং গণতন্ত্র যতই সুসঙ্গত হবে, তার ফলে যতই দ্রুত বিকাশ পাবে পুঁজিবাদ, ততই দ্রুত ও ব্যাপক হবে সে নির্ধারণ।

----সমস্ত উদারনীতিক-বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদই এই রকম-এবং সে শুধু বড়ো রুশীয় নয়-পোলীয়, ইহুদি, ইউক্রেনীয়, জর্জীয় প্রভৃতি সবই। কি অস্ট্রিয়ায় কি রাশিয়ায়, সমস্ত জাতির বুর্জোয়ারাই, ‘জাতীয় সংস্কৃতির’ ধ্বনি তুলে আসলে অনুসরণ করে শ্রমিকদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, গণতন্ত্রের দুর্বলীকরণ এবং জনসাধারণের অধিকার ও জনসাধারণের স্বাধীনতা বেঁচে দেবার জন্যে সামন্ত জমিদারদের সঙ্গে দরাদরির নীতি। ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ নয়, গণতন্ত্র এবং বিশ্বশ্রমিক আন্দোলনের আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি-এই হল শ্রমিক গণতন্ত্রের ধ্বনি। নানা প্রকারের ‘সদর্থক’ জাতীয় কর্মসূচি হাজির করে বুর্জোয়ারা যতই লোক ঠকাক, শ্রেণী-সচেতন শ্রমিক জবাব দেবেঃ জাতীয় সমস্যার সমাধান শুধু একটিই (পুঁজিবাদের দুনিয়ায়-মুনাফা, কামড়াকামড়ি ও শোষণের দুনিয়ায় এ সমস্যার আদৌ যতটা সমাধান সম্ভব) এবং সে সমাধান হল-সুসংহত গণতন্ত্র।

প্রমাণঃ প্রাচীন সংস্কৃতিসম্পন্ন একটি দেশ, পশ্চিম ইউরোপের সুইজারল্যান্ড (ক্ষুদ্র সুইজারাল্যান্ডে, একটি নয়, তিন-তিনটি সর্বরাষ্ট্রীয় ভাষা বর্তমানঃ জার্মান, ফরাসী ও ইতালীয়, জনসংখ্যার শতকরা ৭০ জন জার্মান, শতকরা ২২ জন ফরাসী এবং শতকরা ৭ জন ইতালীয়) এবং তরুণ সংস্কৃতিসম্পন্ন একটি দেশ, পূর্ব ইউরোপের ফিনল্যান্ড। ( পাশের ছোট্ট দেশ সিঙ্গাপুরেও তিনটি অফিসিয়াল ভাষা-লেখক)

শ্রমিক গণতন্ত্রের জাতীয় কর্মসূচি হল এইঃ কোনো একটি জাতি বা কোনো একটি ভাষা সর্ম্পকে আদৌ কোনো বিশেষ সুবিধা চলবে না; জাতিসমূহের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ তাদের রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্রের যে প্রশ্ন, তার সমাধান করতে হবে পরিপূর্ণ মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে; সর্বরাষ্ট্রীয় একটি আইন পাস করতে হবে, যাতে একটি মাত্র জাতির বিশেষ সুবিধাধীনে প্রচলিত যে ব্যবস্থায় জাতিসমূহের সমানাধিকার অথবা জাতীয় সংখ্যালঘুর অধিকার লংঘিত হয়, তেমন যে কোনো ব্যবস্থাই (জেমস্তভো, শহর, গ্রাম সমাজ ইত্যাদি পরিষদ সংক্রান্ত) বেআইনী ও নাকচ বলে ঘোষিত হবে এবং সংবিধান বহির্ভূত বলে সেরূপ ব্যবস্থার নাকচ দাবি এবং কেউ সে ব্যবস্থা চালুু করতে গেলে তাদের ফৌজদারী সোপর্দ করার অধিকার থাকবে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের।

ভাষা ইত্যাদি প্রশ্নে বিভিন্ন বুর্জোয়া পার্টিগুলির জাতিগত খেয়োখেয়ির বিপরীতে শ্রমিক গণতন্ত্র দাবি তোলেঃ সর্বপ্রকার বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের বিপরীতে চাই ট্রেড ইউনিয়ন, সমবায় সমিতি, খরিদ্দার সমবায়, শিক্ষা প্রভৃতি শ্রমিককের সমস্ত সংগঠনে সমস্ত জাতিসত্তার শ্রমিকদের শর্তহীন ঐক্য ও পরিপূর্ণ মিলন। কেবল এই রূপ ঐক্য ও মিলনেই গণতন্ত্রকে রক্ষা করা সম্ভব, শ্রমিকস্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব পুঁজির বিরুদ্ধে-এই পুঁজি ইতোমধ্যেই হয়েছে ও ক্রমেই বেশি করে হয়ে উঠছে আন্তর্জাাতিক, রক্ষা করা সম্ভব নতুন জীবন ধারায় মানবজাতির বিকাশের স্বার্থকে, কোনো সুবিধা এবং কোন শোষণেরই স্থান সেখানে থাকবে না।”

অথচ আমাদের কমিউনিস্টরা শুধুমাত্র বাংলার দাবিই উত্থাপন করলেন এবং এখন পর্যন্ত ওই অবস্থান নিয়ে বগল বাজাচ্ছেন। এগুলো তাহলে কোন কমিউনিস্ট পার্টি?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন