সংসদ: শ্রেণি ও পেশা ভিত্তিক নারী-পুরুষের সমান প্রতনিধিত্ব প্রয়োজন


নাহিদ নলেজ

মুক্তিযুদ্ধ শেষে বাঙলাদেশ নামের রাষ্ট্রটির যে সংবিধান আমরা পাই, তাতে ক্ষুদ্র জাতিসমূহের অধিকার না দেওয়ার পেছনে যে কারণ এবং সংবিধানে প্রগতিশীল যে দিকগুলো ছিল, উভয়েরই উৎস এক, তা হলো মুক্তিযুদ্ধ। অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে এদেশের জনগণ যে সাহস ও আত্মবিশ্বাস অর্জন করেছিল, তার ঠেলায় শাসকশ্রেণি প্রগতিশীল দিকগুলো সংবিধানে সংযোজন করতে বাধ্য হয়েছিল। অন্যদিকে একই কারণে তা বাঙালি জাতিয়তাবাদের উগ্রতার পালে বাতাস লাগায় ক্ষুদ্র জাতিসমূহকে অস্বীকারের প্রেরণা পেয়েছিল, আর দ্বিতীয়দিকটিই হচ্ছে শাসকশ্রেণির প্রকৃত চরিত্র।

সে যাই হোক, নানা কারণে মুক্তিযুদ্ধের ৪০ বছর পর রাষ্ট্র সম্পর্কে জনগণের আশা তলানিতে এসে ঠেকেছে যেমন, তেমনি নিজেদের শক্তি-সামর্থ সম্পর্কে আস্থা কমেছে। ফলে মুক্তিযুদ্ধকালে যে অধিকার স্বাভাবিক বলে মনে হয়েছিল, আজ এতোদিন পর সেইসব অধিকার উপস্থাপন করতেও সবাই দ্বিধাগ্রস্ত, সবকিছু মেনে নেওয়ার এক ধরনের মনোভাব যেন গড়ে উঠেছে, আর এটি যখন নাগরিকদের চেতনায় তৈরি হয়, সর্বনাশের শুরু হয় তখনই।

প্রথমত, সংসদের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিষয়টি ধরা যাক। গত ৪০ বছরে সাংসদদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা যে হারে বেড়েছে, তাতে এই গরীব দেশে হাতি পোষার উপমা জোগাড় করতে হয়। আরো মজার ব্যাপার হলো এই হাতি সাংসদরা জন্মও নেন হাতি পরিবারেই। তারা না জানেন ক্ষুধার কষ্ট, না জানেন বেকারত্বের জ্বালা, এককথায় যে জ্বালা-যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে ও আজ অবধি চলছে, তা তারা জানেন না। এক কথায়, প্রকৃত বাংলাদেশকে এরা জানেন না।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে কংগ্রেসের (প্রতিনিধি সভা) আসন সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪৩৫, গত একশ বছরেও একজন প্রতিনিধির সংখ্যাও বৃদ্ধি করা হয়নি। সেদেশের সিনেটে আছে আরো ১০০জন। যদি জনসংখ্যার অনুপাতে হিসাব করা হয়, তাহলে এরকম- তাদের জনসংখ্যা আমাদের দ্বিগুণ। সেই অনুপাতে বাংলাদেশের সংসদ সংখ্যা দাঁড়ায়=(৪৩৫+১০০)/২ =২৬৭.৫জন।

আর যদি অর্থনীতির অনুপাত ধরা হয়, তাহলে কতজন সাংসদ বাংলাদেশের সংসদের ভাগে পড়ে, সম্মানিত পাঠক সে হিসাবের ভার আপনার কাছেই রাখলাম।

এবার আসি ভারতের প্রসঙ্গে, যে ভারতের উদাহরণ আমরা কথায় কথায় আনি, সেখানকার জনসংখ্যা ১২১ কোটি। তাদের উভয় সভা মিলে আসন সংখ্যা হয়=৫৫২+২৫০=৮০২ জন। তাদের জনসংখ্যার অনুপতে আমাদের সাংসদদের সংখ্যা হয়=৮০২/৮=১০০ (প্রায়)। অন্যদিকে অর্থনীতির অনুপাত কত হয়, তার হিসাবও আপনারাই করুন।

তাতেও যদি সন্তুষ্ট না হন পৃথিবীর অন্যান্য দেশের সংসদ গুলোকে জনসংখ্যা ও অর্থনীতি অনুপাতে হিসাবে আনুন, উত্তর পেয়ে যাবেন। তারপর সিন্ধান্ত নিন, সাংসদ নামের হাতি আমাদের আরো কতগুলো দরকার!

দ্বিতীয়ত,নারীদের জন্য আগে একশতটি আসন বৃদ্ধিও প্রস্তাব তোলা হয়েছে। ভাবখানা এমন তিনশ আসনের মধ্য থেকে তো দেওয়া যাবেনা, তাই আসন সংখ্যা বৃদ্ধিই হলো নারী অধিকার রার দাওয়াই। অর্থনীতির বারোটা বাজলে তাতে কী। গত বিএনপি-জামাত আমলে তারা বাড়াতে চেয়েছিল ৪৫টি আর প্রগতিশীল মহাজোট তো তার চেয়ে কমাতে পারেনা। অতএর বাড়াও একশতটি। আর এই পরিমানে বাড়ালে নারী আসনের সংখ্যা হবে এক চুতুর্থাংশ। এবং ভবিষ্যতে যদি সমান আসনের দাবী ওঠে তাহলে আরো দুইশতটি বাড়িয়ে ছয়শত আসনের সংসদ করা যাবে, আর খরচ? গৌরীসেন জনগণ আছে না? জোট, মাহাজোট আর সুশীল সমাজের চালচলন দেখে তাই ঠাওড়াচ্ছি। হাঁটা দেখে নাকি মানুষ চেনা যায়।

আর মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেওয়া রাষ্ট্রের সংবিধানে কতো কথাই তো থাকে কাজীর গরু কেতাবেই থাকুক। সংবিধানে থাকলেই নারী-পুরুষের সমান অধিকার দিতে হবে? সংবিধানের যে ধারাগুলো কোনো অবস্থাতেই সংখ্যা নির্ধারন গরিষ্ঠতার জোরে হলেও লংঘন করা যাবেনা। তারই কোনো মা-বাবা নাই। আর নিজেদের স্বার্থ ত্যাগ। তিনশত আসনের দেড়শত আসন নারীদের জন্য? কখোনই না। না, না, না, হাজারবার না। এই হলো শাসক শ্র্রেনীর মনের কথা।
তৃতীয়ত, নারী-পুরুষের সমান সংখ্যক প্রতিনিধিত্বের সংসদ পেলেই কি সত্যিকরের শ্রমজীবী জনগণের প্রতিনিধিদের পেয়ে যাবো? অবশ্যই না। জেনারেল এরশাদের ত্রিশ সেট অলংকারের উপমা এই রাষ্ট্রের সামনে আছে। এই ত্রিশ সেট অলংকার তো আসমান থেকে পড়ে নাই।
পুরুষ কর্তৃত্বের সংসদে কি আসন একজন ও পুরুষ শ্রমিককে দেখতে পাই? তেমনি যে নারী চিলমারীর চরে বাড়িতে বসে চুলো ঠেলেন, সন্তানদের আহার জোগাতে উপোষ দেন যাঁরা বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তাঁরা কি লুই আই কানের সুরম্য ভাস্কর্যের ভেতরে দাঁড়িয়ে বলতে পারবেন ? ‘মানন্যয় স্বীকার, আমি আজ কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারীর চরের সেই দুঃখী নারীর কথা বলতে এসেছি।’ আামরা জানি- পারবেন না। অথচ এই বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় সেই চরের তারামন বিবিকে আমরা পেয়েছি, কাঁকন বিবিসহ অজস্র নারী-পুরুষকে পেয়েছি তারাই ছিল সংখ্যাগরিষ্ট। তাই জানি সমান সংখ্যক সাংসদ আসন থাকলেও পাবো না, আজকের মতই।
কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী রুসদেশের প্রতিক্রিয়াশীল জারের আমলেও দুমাতে কৃষক-শ্রমিকের প্রতিনিধি নির্বাচিত হতো। ইতিহাস পড়–ন, তারা বলছে রাশিয়ার সকল কৃষি জমি রাষ্ট্রীয় করণ করতে হবে।’ অথচ নিজেদের প্রগতিশীল সংবিধানে সমাজতন্ত্র লিখে রেখেও শ্রমিক-কৃষকের কোনো প্রতিনিধি সংসদে নাই ।

তাই নারী-পুরুষের সমান সংখ্যক আসনের পাশাপাশি শ্রেণি-পেশা ভিত্তিক জনসংখ্যার অনুপাতে সংসদ সদস্য নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে ষোল আনাই ফাঁকি। যে জনগণ বুকের পাটা দেখিয়ে এই রাষ্ট্রকে স্বাধীন করেছে, সেই জনগণকেই ভূমিকা নিতে হবে। বিড়ালের গাছে ওঠার গল্প মনে রাখতে হবে, আর জানতে হবে কখন শাসক শ্রেণি গাছে ওঠে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন