রাষ্ট্রভাষা থেকে রাষ্ট্রধর্ম: সকল ভাষার সমান অধিকারের প্রশ্ন


নাহিদ নলেজ

১.
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বাঙালির কাছে, এপার-ওপার তিনপারের বাঙালির কাছে গৌরবের ব্যাপার; এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই। এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা পেয়ে সালাম-বরকতেরা আন্তর্জাতিক শহীদের মর্যাদায় উন্নীত হয়েছেন, লড়াকু জাতি হিসেবে বিশ্বের সমস্ত গণতান্ত্রিক চেতনা সম্পন্ন মানুষের কাছে সম্মানিত হয়েছি।-এই কথাগুলো আমরা প্রতিবছরই শুনি। যা আমাদের আপ্লুত করে। যা নিয়ে পত্র-পত্রিকায় রিমকে রিম কাগজ ব্যবহৃত হয়। বুদ্ধিজীবিদের মুখস্ত কথায় কানও খানিকটা ঝালাপালা হয়।

পৃৃথিবীর প্রত্যেকটি রাষ্ট্র সময়ের নানান পর্বে, লড়াইয়ের শ্লোগান নির্মাণের কালে, কর্মসূচি নির্ধারণের বেলায় তার ইতিহাসের পাঠ পুনর্বার বুঝবার চেষ্টা করে। চেষ্টা করে জানতে লড়াইগুলো সত্যিকার অর্থে কেমন ছিল, তা সত্যি সত্যি সমস্ত জনগণের আকাঙ্খার প্রতিনিধিত্ব করতো, না বিশেষ গোষ্ঠী বা সমপ্রদায় বা শ্রেণীর? রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক নির্মাণের প্রশ্নে এই পর্যালোচনাগুলি খুবই জরুরী।

১৯৪৮ সালে জিন্নাহ্ সাহেবের উক্তি থেকে যে ভাষা আন্দোলনের সৃষ্টি হয় তা ১৯৫২ সালে ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখে রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে ৫৬ সালে পাকিস্তানের যে সংবিধান রচিত হয়, তাতে এসে তা সমাপ্ত হয় অর্থাৎ পাকিস্তান রাষ্ট্রের সংবিধানে উর্দূ ও বাংলা ভাষা দু'টি সংবিধানে রাষ্ট্রভাষা বলে স্বীকৃত হয়। যদিও পাকিস্তানে সেই সময় সিন্ধি, বেলুচ, পশতু, পাঞ্জাব, গুজরাটিসহ আরো কয়েকটি প্রধান ভাষাভাষী ও অঞ্চলের জনগণ ছিল।

আমরা জানি, গণতন্ত্রের মূলকথা হচ্ছে সকল মানুষের সমান অধিকার। ইতিহাসের অনেক রক্তাক্ত পথ পেরিয়ে মানবজাতি এই চেতনা নির্মাণ করেছে যে, জগতে সকল মানুষের সমান অধিকার। কিন্তু একটি কি দু'টি ভাষা যখন রাষ্ট্রভাষা বলে স্বীকৃত হয়, তখনই রাষ্ট্রের বাকী ভাষাভাষী মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারটি আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে যায়। রাষ্ট্রটি আর তখন সবার থাকে না, হয়ে যায় বিশেষ ভাষাভাষীর। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বদলে প্রতিষ্ঠিত হয় বৈষম্যমূলক স্বৈরাচারী রাষ্ট্র্র। তাই নির্দিষ্ট একটি ভাষার মর্যাদার দাবীর ভিত্তিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনটিও হয়ে ওঠে উগ্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। এবং এই উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রকাশটি আমরা দেখি স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধানে। সংবিধানটি পড়লে মনে হয় বাংলাদেশ যেন একটি ভাষাভিত্তিক সামপ্রদায়িক রাষ্ট্র।

আমরা পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রের অভিজ্ঞতা থেকে জানি, সেখানে থাকে অফিসিয়াল ভাষা কয়েকটি। চৌদ্দ কোটি জনসংখ্যার দেশ সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে ষোলটি ভাষায় রাষ্ট্রের সমস্ত দলিল-পত্রাদি প্রকাশিত হতো, প্রত্যেক ভাষাভাষী প্রতিনিধি তার নিজ নিজ মাতৃভাষায় আইনসভায় এসে বক্তৃতা দিতো, তা অনুবাদ করে অন্যান্য ভাষাভাষীদের সরবরাহ করা হতো। সুইজারল্যান্ড, ছোট্ট দেশ সুইজারল্যান্ডে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর পরই চালু করে তিনটি অফিসিয়াল ভাষা-জামর্ান, ফরাসি ও ইতালিয়ান। কিন্তু একুশে ফেব্রুয়ারির দেশে সাংবিধানিকভাবেই ভাষা প্রশ্নে স্বৈরাচারমূলক শব্দবন্ধ চালু আছে। এখানে আইনসভায় একজন আদিবাসী এম.এন. লারমা এসে বক্তৃতা দেন রাষ্ট্রভাষা বাংলায়।

প্রকৃত পক্ষে একুশে ফেব্রুয়ারি এই চেতনা পুনঃ নির্মাণ করেছে যে, পৃথিবীর সব মানুষের অধিকার সমান। এবং সবাই নিজ নিজ মাতৃভাষায় রাষ্ট্রের আইনসভা সহ সকল স্তরে, জাতিসংঘে কথা বলার অধিকারী। সুমনের গানের ভাষায়, আমি চাই সাঁওতাল তার ভাষায় বলবে রাষ্ট্রপুঞ্জে...।

আসলে একুশে ফেব্রুয়ারির চেতনা হচ্ছে রাষ্ট্রভাষা শব্দবন্ধটিকেই আঘাত করা।

বলা হয় ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বের পুরোভাগে ছিলেন সেই সময়ের কমিউনিস্টরা-ভাষা মতিন, মোহাম্মদ তোহায়া কিন্তু প্রশ্ন হলো, কমিউনিস্টরা কি করে জনগণের শুধুমাত্র ৫৬ ভগের পক্ষে দাঁড়ালেন। তাঁদেরতো সবার পক্ষে দাঁড়ানোর কথা? লেলিন সহ অন্যান্য বিপ্লবীরা এ বিষয় বিস্তারিত বলে গেলেও? নাকি তারা আদৌ কমিউনিস্ট ছিলেন না?

২.
মধ্যযুগ পেরিয়ে মানব জাতির ইতিহাসে যখন আধুনিক যুগে পদার্পন করে তখন রাষ্ট্র প্রশ্নে একটি গুরত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত রচিত হয়, তা হলো- "ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার"। কারণ রাষ্ট্র হচ্ছে ইহলৌকিক শ্রেণীর সাথে সম্পর্কিত ঘটনা। তাই রাষ্ট্রের সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক নাই। কিন্তু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সংবিধান লঙ্ঘন করে ধর্মভিত্তিক পরিচয়ভুক্ত একটি সংগঠনের সাথে বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে যুক্ত করা হয় স্বাধীনতার পর পরই। এবং তারই ধারাবাহিকতায় এক পর্যায়ে সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রধর্ম চাপিয়ে দেওয়া হয়। সংবিধানে রাষ্ট্রভাষার সাথে যুক্ত হলো রাষ্ট্রধর্ম। ভাষাভিত্তিক সামপ্রদায়িকতার সাথে ঐক্য হলো ধর্মীয় সামপ্রদায়িকতা। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কথিত সকল প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবি ও কমিউনিস্ট-ওয়ার্কার্স-সমাজতন্ত্রী নামধারী পার্টিগুলো বুদ্ধিজীবি ও রাষ্ট্রধর্মের বেলায় উচ্চরব তুললেও রাষ্ট্রভাষা নিয়ে নিরব। এখন গণতান্ত্রিক চেতনা সম্পন্ন জনগণের জানা দরকার এর কারণ কী? এটা কি বুদ্ধির দৈন্য, না চেতনার সংকট?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন