প্রতিষ্ঠানবিরোধীতা প্রসঙ্গে চিন্তার খসড়া


সবকিছু ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক বচন, ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতির পেছনে কোন না কোন শ্রেণীর স্বার্থ আবিষ্কার করতে না শেখা পর্যন্ত লোকে চিরকাল প্রতারণা ও আত্নপ্রতারণার নির্বোধ বলি হয়েছিল এবং চিরকাল থাকবে। পুরনো ব্যবস্থার রক্ষকদের কাছে সংস্কার ও উন্নয়নের প্রবক্তারা সর্বদাই বোকা বনবে যদি না তারা একথা বোঝে যে, যতো অসভ্য ও জরাজীর্ণ মনে হোক না কেন প্রত্যেকটি পুরনো প্রতিষ্ঠানই টিকে আছে কোন না কোন শাসক শ্রেণীর শক্তির জোড়ে। এবং এইসব শ্রেণীর প্রতিরোধ চূর্ণ করার শুধু একটি উপায়ই আছে: যে শক্তি পুরনোর উচ্ছেদ ও নতুনকে সৃষ্টি করতে পারে- এবং নিজের সামাজিক অবস্থানহেতু যা তাকে করতে হবে- তেমন শক্তিকে আমাদের চারপাশের সমাজের মধ্যে থেকেই আবিষ্কার করে তাকে শিক্ষিত ও সংগ্রামের জন্যে সংগঠিত করে তোলা।
(লেনিন, মার্কসবাদের তিনটি উৎস ও তিনটি অঙ্গ)
এক
এবং ওরা শিল্প-সাহিত্য নিয়ে ব্যবসা করে, পণ্য করে, ন্যাংটা করে, রক্তাক্ত করে, ট্রাকে তুলে আলু-পটলের মতো রপ্তানি করে; গুটিকতক অর্টিস্টিক শিল্পিকে আলু-পটলের ছাল খাইয়ে ভিখিরির মতো বাঁচিয়ে রেখে নিজেদের স্বার্থে মুনাফা উপার্জন করেই যায়; ইহাই প্রচলিত-পুরনো প্রতিষ্ঠান, এই কাজ এরা অতীতেও করেছে- ভবিষ্যতেও...? >>> না

এদের প্রথম ল্ক্ষ্য মুনাফা, দ্বিতীয় লক্ষ্য মুনাফা, এমনকি তৃতীয় লক্ষ্যও মুনাফা। এরা শিল্প-সাহিত্যের বিচার করে মুনাফার অঙ্কে। মূলত এরা শিল্প ব্যাপারটাই বোঝে না; ভালো শিল্প নির্বাচন এদের কাছে কমোডের কালার চয়েসের মতো ব্যাপার।
তাই অনিবার্যভাবেই শিল্পি এদের কাছে হাস্যকর বস্তুতে পরিণত হয়, শেষপর্যন্ত

দুই
প্রাতিষ্ঠানিক কনসাইনমেন্টনোটে লেখকের দস্তখত প্রদান অর্থই হল প্রতিষ্ঠান আরোপিত সকল শর্তাবলী মেনে নিয়ে প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়া; যেখানে লেখকের স্বাধীনতা ব্যাপারটা অবাস্তব-নিছককল্পনামাত্র।

তিন

শ্রেণিবিভক্ত সমাজব্যবস্থায় শোষকশ্রেণির এক শোষণযন্ত্রের নাম প্রতিষ্ঠান। তারা নিজেদের প্রয়োজনে হরেক রকম প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। পুঁজিবাদ যেহেতু নিজের মতো করে নোংরাভাবে গোটা দুনিয়াকে সাজিয়ে নেয়, সেহেতু এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রতিষ্ঠানে পর্যন্ত এই সাজিয়ে নেয়ার নোংরা প্রক্রিয়া বজায় থাকে। এমনকি তারা খুব সচেতনভাবে, টার্গেট করে সাহিত্য-সংস্কৃতিতেও নিজেদের প্রয়োজনমাফিক প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করে বুর্জোয়া শাসনব্যবস্থা জারি রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে। আর এইসব প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যই যেহেতু শোষকশ্রেণির প্রতি সম্মতি উৎপাদন, তাই সচেতন লেখকমাত্রই এদেরকে চিহ্নিত করে নিরন্তর লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নিজের সৃষ্টিশীলতা বজায় রাখেন। এই লেখকদের ক্ষেত্রে একটা সময় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান কোন পাল্টা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে না; আশায় বুক বাঁধে এই ভেবে যে, একদিন এই লেখক আমার দুয়ারেই মাথা ঠুকবে। তারা বরংচ এই লেখকদেরকে মুখে সমর্থন ক’রে, কখনো কিছু কিছু আধা বিপ্লবী লেখাও প্রকাশ ক’রে নিজেদের সত্যিকার চরিত্রকে আড়াল করতে চায়। কখনো তারা তাদের প্রচলিত পুরনো চিন্তাকেই পাঠকের কাছে স্বাদ বদলের জন্য প্রতিচিন্তা / বিকল্পচিন্তা এরকম হরেক আবরণে মোড়কায়িত করে হাজির করে। প্রতিষ্ঠানের এই পরিকল্পিত ফাঁদে পা দিয়ে আধা সচেতন লেখকদের অনেকেই নিজেদের লেখকসত্ত্বাকে হত্যা করে, শেষমেষ। কিন্তু যাঁরা এইসব প্রতিষ্ঠানের ফাঁদে পা না দিয়ে বরংচ নিজেদের বিপ্লবী চরিত্রকেই আরও স্পষ্ট করে তোলেন, তাদের সাথেই দ্বন্দ্ব তৈরি হয় প্রতিষ্ঠানের। এই ধরনের সিরিয়াস লেখকদের সম্পর্কে কখনো নীরব থেকে, কখনো ব্যক্তিগত আক্রমনের মধ্য দিয়ে, কখনো গালিগালাজ ক’রে, কখনো বা পাগল-আঁতেল এইসব প্রচার করে হেয় প্রতিপন্ন করার মধ্য দিয়ে দমিয়ে রাখতে চায় প্রতিষ্ঠান; কেননা এই ধরনের সিরিয়াস লেখকেরা প্রতিষ্ঠানের আতঙ্কের কারণ।

এক্ষেত্রে আমাদের করণীয় কী?
প্রতিষ্ঠানবিরোধী হিসেবে এখন আমাদের কর্তব্য হল শোষণযন্ত্র যে প্রতিষ্ঠান, সে-ই প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে পাল্টা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, প্রাথমিকভাবে তা যত ছোটই হোক; এগুলোই একসময় শক্তিশালী আকার ধারণ করবে। প্রতিষ্ঠানবিরোধীতার কথা বলে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান কেন? কারণ আমরা যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলব, সেই প্রতিষ্ঠানই আমাদের প্রতিষ্ঠানহীনতার দিকে নিয়ে যাবে; ঠিক যেভাবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র আমাদেরকে নিয়ে যাবে রাষ্ট্রহীনতার দিকে।

-------------------------------------------------------------বিন্দুগোষ্ঠী

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন