হায় কমিউনিস্ট পার্টি হায় বিপ্লব

আবির হাসান

ভ. ই. লেনিনের তাবৎ রচনা কিসের প্রমাণ ? “কী করিতে হইবে?” “এক কদম আগে দু’ কদম পিছে” “সাম্রাজ্যবাদ পুঁজিবাদের সর্বোচ্চ পর্যায়” “রাশিয়ার পুঁজিবাদের বিকাশ” গ্রন্থগুলো কি তীব্র মতাদর্শীক সংগ্রামের ফল নয়? একেকটি কর্মসূচি গ্রহণের সময় নিষিদ্ধ অবস্থাতেও রুশ পার্টিগুলো আন্তঃমতাদর্শীক সংগ্রামের তীব্রতা থেকে কি কখনো পিছিয়ে এসেছে? কিন্তু আমাদের দেশে আমরা কী দেখছি?

এরকম একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের মধ্যে একটি অন্যতম প্রধান প্রশ্ন একটি কমিউনিস্ট পার্টি কেমন। মতাদর্শীক অস্পষ্টতা, অনৈক্য, বিশৃঙ্খল অবস্থা নিয়ে জনগণের সামনে হাজির হবার কোনো সুযোগ নেই। বিপ্লব কী, বিপ্লবের স্তরগুলো কী কী, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে জনগণ কারা, কমিউনিস্ট কারা, কমিউনিস্ট পার্টি কী, ক্ষমতা দখলের পথ ও পদ্ধতিসমূহ কী কী ইত্যাদি বিষয় স্বতঃসিদ্ধ গাণিতিক নিয়মের মতো প্রতিষ্ঠিত। মার্কস-এঙ্গেলস্- লেনিনরা এইসব বিষয়কে বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তীব্র মতাদর্শীক সংগ্রামের মধ্য দিয়েই প্রতিষ্ঠা করেছেন। এইসব মৌলিক নিয়মের অস্বীকার করা মানেই মার্কসবাদকেই অস্বীকার করা। কিন্তু আমাদের দেশে, এমনকি ভারতবর্ষে কখনোই মার্কসবাদকে বিজ্ঞান মেনে সেই অনুসারে পার্টি গঠিত হয় নি, যারা দোকান খোলার মতো করে পার্টি খুলে বসেছেন, তারা কখনো ব্যাখ্যা করেন নি, কেন তারা বাকী অন্যসব পার্টিতে যোগ না দিয়ে নিজেরা আরেকটি গঠন করতে বসেছেন। আর তাছাড়া যারা পার্টিতে যোগ দিয়েছেন, তারা কেনইবা যোগ দিয়েছেন এবং যারা পার্টি ভেঙে নতুন পার্টি করেছেন, তারাইবা কেন পার্টি ভাঙলেন, তারও ব্যাখা জনগণের কাছে অজানা থাকে। একটি কমিউনিস্ট পার্টি এমনটা না। তারপর কমিউনিস্ট পার্টি থাকলেই যে বিপ্লব হবে, তার কোন নিশ্চয়তা নেই, বিপ্লবী পরিস্থিতি ছাড়া বিপ্লব হয় না। লেনিন বলেছিলেন, “জার্মানিতে বিপ্লব না হয়ে রাশিয়ায় বিপ্লব হবার কারণ হচ্ছে, জার্মানিতে শ্রমিকশ্রেণী অনেক শক্তিশালী ছিল কিন্তু বুর্জোয়াশ্রেণী ছিল তার চাইতেও সংগঠিত। রাশিয়ায় শ্রমিকশ্রেণী জার্মানির চাইতে দুর্বল হলেও এখানকার বুর্জোয়াশ্রেণী অনেক বেশি দুর্বল ও অসংগঠিত ছিল।”

তিনি বিপ্লবী পরিস্থিতি বলতে যা বুঝিয়েছেন তা হল, “সমস্ত বিপ্লবে, বিশেষ করে বিশশতকের তিনটি রুশ বিপ্লবেই যা সমর্থিত হয়েছে, বিপ্লবের সেই মূল নিয়মটা হলো এই ঃ শোষিত ও নিপীড়িতরা পুরনো কায়দায় দিন কাটানো অসম্ভব বলে মানছে ও পরিবর্তন দাবি করছে, এইটুকুই বিপ্লবের পক্ষে যথেষ্ট নয়; শোষকেরা পুরনো কায়দায় দিন কাটাতে ও শাসন চালাতে পারছে নাÑ এইটে বিপ্লবের পক্ষে অপরিহার্য। ‘নিচুতলা’ যখন পুরনোটা চায় না এবং ‘ওপরতলা’ যখন পুরনো কায়দায় পারে না, কেবল তখনই বিপ্লব জয়লাভ করতে পারে। এই সত্যটাকে অন্যকথায় প্রকাশ করা যায় ঃ দেশজোড়া (শোষিত ও শোষক উভয়কে নিয়ে) সংকট ছাড়া বিপ্লব অসম্ভব। অর্থাৎ, বিপ্লবের জন্য দরকার, প্রথমত ঃ এইটে ঘটানো যে অধিকাংশ শ্রমিক (অন্তত সচেতন, চিন্তাশীল, রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় শ্রমিকদের অধিকাংশ) বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি বুঝছে ও তার জন্য মৃত্যুবরণে প্রস্তুত; দ্বিতীয়ত ঃ শাসকশ্রেণীরা শাসন-সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, যাতে রাজনীতিতে টেনে আনছে সবচেয়ে পশ্চাৎপদ জনগণকে (যে-কোন সত্যিকার বিপ্লবের লক্ষণ হলো ঃ এতদিন পর্যন্ত নিষ্পৃহ মেহনতী ও নিপীড়িত জনগণের মধ্য থেকে রাজনৈতিক সংগ্রামে সক্ষম লোকেদের দশগুণ দ্রুত এমনকি শতগুণ সংখ্যাবৃদ্ধি), যাতে দুর্বল হয়ে পড়ে সরকার এবং বিপ্লবীদের পক্ষ থেকে তার দ্রুত উচ্ছেদ সম্ভব হয়।” কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টিই নাই যেখানে, সেখানে তাই পরিস্থিতি থাকলে কি আর না থাকলেইবা কি। দিন আসে দিন যায় শুধু চেয়ে চেয়ে থাকা।

কমরেড এম. আর. চৌধুরী ১৯৮৯ সালে যখন ‘ভারতবর্ষ-পাকিস্তান পর্বে ছিল না বাংলাদেশেও কমিউনিস্ট পার্টি নাই’ শিরোনামে গ্রন্থ লিখলেন, তখন বামপন্থী মহলে এ বিষয়ে বিস্তর কথা ওঠানোর সুযোগ ছিল এক ধরনের তাত্ত্বিক মিমাংসা জরুরি ছিল। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে আমরা বাংলাদেশে প্রচুর প্রচুর কথা তুলতে পারতাম। এতে এই ভূখন্ডের রাজনীতি ও মুক্তির সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ জমিন তৈরী হতো। আমাদের সুবিখ্যাত লড়াকু (!) তাত্ত্বিকরা বিষয়টি এড়িয়ে গেছেন, একধরনের নিরবতার ষড়যন্ত্র আমরা দেখতে পেয়েছি। শুনেছি জনাব চৌধুরী ঢাকা শহরের বড় বড় বামপন্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই পৌঁছে দিয়েছেন। শ্রদ্ধেয় অনেককে ডাকযোগে পৌঁছে দিয়েছেন কিন্তু কেউ প্রাপ্তি সংবাদটা পর্যন্ত জানানোর প্রয়োজন বোধ করেননি। কেউ কেউ তাঁর এই গ্রন্থটি না পড়েই বিস্তর মন্তব্য করেছেন। তার গ্রন্থটি সম্পর্কে কথা উঠলেই সকলে বলতে থাকেন ইতিহাসের ত্যাগী মানুষদের, কমিউনিস্টদের তিনি নাকি অস্বীকার করেছেন। প্রকৃতপক্ষে সত্য কথাটা হচ্ছে তিনি কোথাও বলেন নি কমিউনিস্ট ছিল না। যা বলেছেন তা হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টি ছিলো না। কিন্তু আমরা মনে করি এই বিষয়টির মিমাংসা খুবই জরুরি, এটা ছাড়া এক কদমও এগুনো যাবে না, বাস্তবে যায়ও না। ফালতু ঐক্য আমরা চাই না, নীতিগত দিক মিমাংসা করে শক্তভাবেই এগুবো। ঐক্যের প্রশ্নে নীতিগত তর্ক এড়িয়ে যাওয়াই এ ভূখন্ডের ইতিহাস। তাই ঐক্যের কথা এত বলার পরও ঐক্য আসে নি। ভাঙন, ভাঙন আর ভাঙন।

অনেকেই বলেন, কমিউনিস্ট পার্টি নাই বলার কারণে বুর্জোয়াদেরই নাকি স্বার্থরক্ষা হয়, বদরুদ্দীন উমরদের ভাষায় সিআইএ’র সেবা করা হয়। মার্কস ও লেনিনের বহু রচনা থেকে জানা যাবে- কমিউনিস্টরা সত্য স্বীকারে কখনো দ্বিধাগ্রস্ত না। তাঁরা নিজেদের ত্রুটি-বিচ্যুতির কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করতে কখনোই পিছুপা হননি। রাখঢাকের চর্চা, সত্য স্বীকারের ভয় সুবিধাবাদীদের, শ্রমিকশ্রেণীর না। তাঁদের জীবন তাই প্রমাণ করে। এমনকি লেনিনের প্রায় তাবৎ তর্ক কথিত কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধেই। আর এই সব যারা বলেন, তারা ইতিহাসকে অস্বীকার করেন সুবিধাবাদের স্বার্থে। কমিউনিস্টদের দুর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না, অকপট হওয়া যাবে না, সত্য প্রকাশ করা যাবে না, শ্রমিকদের বুর্জোয়াদের স্বার্থে ব্যবহারকারীদের মুখোশ খুলে দেওয়া যাবে না, তাদের বিরুদ্ধে লাঠি ধরা যাবে না-তাহলে নাকি বুর্জোয়াদের সেবা করা হয়! আওয়ামীলীগের মালোচনা করা যাবে না, তাহলে মৌলবাদীদের সেবা করা হয়! ঐক্য বলতে বলা হয়- সকল ধরনের মতামতের প্রশ্রয়, ভারসাম্যমূলক আচরণ-ক্ষমতার চর্চা।
প্রত্যেকেই যখন নিজেদের সাচ্চা কমিউনিস্ট পার্টি দাবি ও অন্যদের খারিজ করছেন, তখন দেখা দরকার একটি কমিউনিস্ট পার্টি কেমন আর ভারতভূখন্ডের ইতিহাসে আমরা যা দেখেছি, এখনো দেখছি তার সাথে শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির যুগ-যুগান্তের শিক্ষার, আচরণগত মিল খুঁজে পাই কিনা, দেখতে পাই কিনা। একটি সাচ্চা কমিউনিস্ট পার্টি গড়েই উঠতে পারে না-‘মুখোশধারী কমিউনিস্টদের’ জনগণের সামনে উন্মোচন করা ছাড়া। এই কর্তব্যের লক্ষ্যেই এই আলোচনা।

আর এই লেখাটি লিখতে গিয়ে আমাদের প্রচুর উদ্ধৃতি ব্যবহার করতে হয়েছে, কারণ প্রত্যেকে নিজের মতের মতো করে মার্কসবাদ বানিয়ে নিয়েছেন। আর যে কথা আমরা বলতে চাই, তা যদি মার্কসবাদ-লেনিনবাদের প্রতিষ্ঠাতারা বলে থাকেন, তাহলে আর নিজের কথার প্রয়োজন কী!

কমিউনিস্ট পার্টি কী ঃ কমিউনিজম উৎপাদনের উপায়ের উপরে সামাজিক মালিকানা ভিত্তিক এক সামাজিক গঠনরূপ, যা উৎপাদনী শক্তিগুলোর বিকাশের পূর্ণ সুযোগ দেয়; তা হলো মানবজাতির সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রগতির সর্ব্বোচ্চ পর্যায় এবং পুঁজিতন্ত্রকে তা প্রতিস্থাপিত করে। কমিউনিজমের আর একটি অর্থ হলো প্রলেতারিয়েতের মুক্তির পদ্ধতি সংক্রান্ত মতবাদ। আর এই অর্থে কমিউনিস্ট পার্টি বলতে আমরা বুঝবো প্রলেতারিয়েতের তথা শ্রমজীবী শ্রেণীর মুক্তির পদ্ধতি সংক্রান্ত মতবাদের ভিত্তিতে এবং মানব জাতির সামাজিক-অর্থনৈতিক প্রগতির সর্Ÿোচ্চ পর্যায় তথা শ্রেণীহীন কমিউনিস্ট সামাজিক গঠনরূপ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠিত একটি রাজনৈতিক পার্টি অর্থাৎ শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণী প্রলেতারিয়েতের রাজনৈতিক পার্টি। কমিউনিস্ট পার্টি বলতে আমরা বুঝবো প্রলেতারীয় শ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টি তথা তার কেন্দ্রীয় সংগঠন। কমিউনিস্ট পার্টি বলতে আমরা বুঝবো একটি দেশের প্রলেতারীয় শ্রেণীর আগুয়ান সংগঠিত বাহিনী, তার শ্রেণী সংগঠনের সর্Ÿোচ্চরূপ, বুঝবো প্রলেতারিয়েতের শ্রেণীগত অবস্থানের মূর্ত প্রতীক। কমিউনিস্ট পার্টি বলতে আমরা বুঝবো বিপ্লবী মার্কসবাদের ট্রেনিং স্কুল।

পার্টি প্রলেতারীয় শ্রেণীর একমাত্র সংগঠন নয়। প্রলেতারিয়েতের আরো অনেক সংগঠন থাকে। যেমন- ট্রেড ইউনিয়ন, সমবায় সমিতি, কারখানা-কমিটি, আইন সভার মধ্যে গ্রুপ, সংবাদপত্র, সংস্কৃতি ও শিক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন সংগঠন, যুব সংঘ, কৃষাণ-কৃষাণী সংঘ ইত্যাদি। তবে সমস্ত সংগঠনেরই কাজের লক্ষ্য হবে এক, কারণ সেগুলো একটি শ্রেণীর মুক্তি তথা কল্যাণের লক্ষ্যেই অর্থাৎ প্রলেতারীয় শ্রেণীর জন্যই কাজ করে। আবার এ দায়িত্ব পালন করতে হলে সেই কেন্দ্রীয় সংগঠন তথা পার্টির পক্ষে একটি সাধারণ নীতি স্থির করার মতো পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা থাকা আবশ্যক, সেই সঙ্গে পার্টির এরূপ মর্যাদাও থাকা চাই যাতে বিভিন্ন সংগঠনগুলোকে তার নির্দিষ্ট নীতি মেনে চলতে রাজী করাতে ও সে লক্ষ্যে পরিচালনা করা সম্ভব হতে পারে কিন্তু এর অর্থ অবশ্যই এই নয় যে, ট্রেড ইউনিয়ন, সমবায় সমিতি, কৃষাণ-কৃষাণী সংঘ প্রভৃতি সংগঠনগুলোকে কাগজে কলমে পার্টি নেতৃত্বের অধীন করে রাখতে হবে। এই সকল সংগঠনের মধ্যে যেসব কমিউনিস্ট সভ্য তথা সংগঠক কাজ করে এবং এই সকল সংগঠনে যে সকল কমিউনিস্ট কর্মীর নিঃসন্দেহে প্রভাব প্রতিপত্তি আছে, তাদের যথাসাধ্য চেষ্টা করতে হবে যাতে এসব সংগঠন কাজের মধ্যদিয়ে প্রলেতারীয় শ্রেণীর পার্টির প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং স্বেচ্ছায় পার্টির রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্বীকার করে নেয়। একটি কমিউনিস্ট পার্টির অবশ্যই থাকতে হবে শ্রমজীবী জনগণের স্বার্থের পূর্ণ প্রতিনিধিত্বশীল বিপ্লবী নীতি ও কর্মসূচি। পার্টি হচ্ছে শ্রমজীবী শ্রেণীর সংগঠিত অগ্রদূত এবং এর শ্রেণী সংগঠনের সর্Ÿোচ্চরূপ। পার্টির দুটো অংশ থাকবেঃ (১) পার্টির নেতৃস্থানীয় নিয়মিত কর্মীদের নিয়ে একটি ঘনিষ্ঠ চক্র- এখানে প্রধানত সে ধরনের কর্মীরা থাকবেন, যাঁরা পেশাদার বিপ্লবী, অর্থাৎ এমন পার্টি কর্মী যাঁরা পার্টির কাজ ছাড়া আর কিছু করেন না এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদ ও মাও সে তুঙ চিন্তাধারা সম্বন্ধে জ্ঞান, দেশের সামাজিক অর্থনৈতিক গঠনরূপ ও সামাজিক শ্রেণীসমূহ প্রসঙ্গে জ্ঞান, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, সংগঠনের অভ্যাস এবং প্রয়োজনীয় কৌশল গ্রহণে তাগদ থাকতে হবে; (২) স্থানীয় পার্টি সংগঠনগুলোর সুবিস্তৃত জাল বুনানি এবং লক্ষ লক্ষ শ্রমজীবী জনগণের সহানুভূতি ও সমর্থন লাভ করেন এরকম বহুসংখ্যক মার্কসবাদী লেনিনবাদী তত্ত্বে সমৃদ্ধ পার্টি সদস্য।

পার্টি হবে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকতার সমন্বিত রূপ এবং পার্টি সংগঠনে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণকে দেখতে হবে কেন্দ্রীকতা এবং প্রলেতারীয় গণতন্ত্রের সংমিশ্রণ হিসেবে, প্রকৃত একটি সমন্বয় তথা সংশ্লেষণ হিসেবে। সমগ্র পার্টি সংগঠনের সর্বসাধারণের অবিরাম কর্মধারার, সকলের সমস্বার্থের বিরামহীন সংগ্রামের ভিত্তিতেই শুধু এই সংমিশ্রণ করা সম্ভব। কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠনে কেন্দ্রীকরণ বলতে আনুষ্ঠানিক এবং যান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণ ঝুঝায় না। অর্থাৎ এটা হচ্ছে এমন একটি শক্তিশালী নেতৃত্ব গড়ে তোলা, যে নেতৃত্ব যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এবং একই সময়ে অবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে সক্ষম। শুধু কাগজে-কলমে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণের ব্যবস্থা করলে চলবে না বাস্তব ক্ষেত্রে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হবে। আর এটাকে কার্যকর করতে হলে পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সর্বস্তরের সবাইকে অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে প্রলেতারিয়েতের দৃষ্টিভঙ্গি এবং তাদের প্রত্যেকের নৈতিকতার ভিত্তি হবে কমিউনিস্ট নৈতিকতা।

কমিউনিস্ট পার্টি হলো সুশৃঙ্খল পার্টি, সে কারণে সর্বস্তরে পার্টির শৃঙ্খলা পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করতে হবে এবং তা এমনভাবে কার্যকর হবে যেন পার্টির সাধারণ সদস্যরা তথা নিম্নস্তরের কমিটিগুলো শুধুমাত্র শৃঙ্খলা মেনে চলবে তা নয় বরং বন্দোবস্তটা এমনভাবে হতে হবে যেন সর্বোচ্চ স্তর পর্যায়ের নেতারাও তা পালনে বাধ্য হয় এবং প্রয়োজনে সাধারণ সদস্যরাও যেন তদারকি করতে পারে নেতারা শৃঙ্খলা মানছে কিনা তার উপর। পার্টিতে থাকতে হবে যথার্থ সমালোচনার ও আত্মসমালোচনার স্বাধীনতা। অবিচলভাবে আন্তঃপার্টি গণতন্ত্র চালু রাখা এবং তারই ভিত্তিতে সমালোচনা ও আত্মসমালোচনার উৎসাহ দিয়ে পার্টি সংস্থাগুলোর উপর পার্টি সদস্যগণের নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে হবে।
এখন প্রশ্ন হলো কখনো কি আমাদের দেশের কথিত কমিউনিস্ট, সমাজতন্ত্রী নামধারী পাটিগুলোতে এটা ছিল? এখানে কি উবসড়পৎধঃরপ ঈবহঃৎধষরুস এর বদলে ঈবহঃৎধষরুবফ উবসড়পৎধপু হয়নি? সেটা পার্টি গড়ার প্রশ্নেই হোক, আর ভাঙার বেলাতেই হোক কিংবা মতাদর্শীক সংগ্রামের ক্ষেত্রে। সবক্ষেত্রেই উত্তর হলোÑ হতাশাব্যঞ্জক না। Ñনা এর মাঝে বসবো যবে / না -এর মাঝে শোব / হাত দিয়ে তো ছোঁব না মুখ / দুঃখ দিয়ে ছোঁব।

একটি কমিউনিস্ট পার্র্টি কেন ঃ মার্কস ও এঙ্গেলস কর্তৃক প্রস্তাবিত বৈজ্ঞানিক কমিউনিজমের যে ভাবমন্ত্র কমিউনিস্ট লীগের নিয়মাবলিতে গৃহীত হয় তাতে বলা হয়েছে, লীগের উদ্দেশ্য হলো বুর্জোয়াশ্রেণীর উচ্ছেদ, প্রলেতায়িতের আধিপত্য, শ্রেণীবৈরিতা ভিত্তিক পুরনো সমাজের বিনাশ এবং শ্রেণীহীন ও ব্যক্তিগত মালিকানাহীন নতুন সমাজের প্রতিষ্ঠা। আর “কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার” এর ভিতরে যে চিন্তা আমরা পাই, তার মূলকথা হলোঃ ইতিহাসের প্রতি যুগে অর্থনৈতিক উৎপাদন এবং যে সমাজ সংগঠন তা থেকে আবশ্যিকভাবে গড়ে ওঠে, তা-ই থাকে সে যুগের রাজনৈতিক ও মানসিক ইতিহাসের মূলে, সুতরাং (জমির আদিম যৌথ মালিকানা অবসানের পর থেকে) সমস্ত ইতিহাস হয়ে এসেছে শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস, সামাজিক বিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে শোষিত ও শোষক, অধীনস্ত ও অধীপতি শ্রেণীর সংগ্রামের ইতিহাস; কিন্তু এই লড়াই আজ এমন পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে যে শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণী (প্রলেতারিয়েত) নিজেকে শোষক ও নিপীড়ক শ্রেণীর (বুর্জোয়া) কবল থেকে উদ্ধার করতে গেলে সেই সঙ্গে গোটা সমাজকে শোষণ, নিপীড়ন ও শ্রেণীসংগ্রাম থেকে চিরদিনের মতো মুক্তি না দিয়ে পারে না। এভাবে প্রলেতারিয়েতের ভূমিকা যখন নির্দিষ্ট হয়ে গেল তখনই তার জন্য নির্দিষ্ট হয়ে উঠলো তার নিজস্ব সব হাতিয়ার তথা সংগঠনেরও। “ইশতেহার” এ ঘোষণা করা হলো, “আজকের দিনে বুর্জোয়াদের মুখোমুখি যেসব শ্রেণী দাঁড়িয়ে আছে তার মধ্যে শুধু প্রলেতারিয়েত হলো প্রকৃত বিপ্লবী শ্রেণী।” “অতীত ইতিহাসে প্রতিটি আন্দোলন ছিল সংখ্যাল্পের দ্বারা অথবা সংখ্যাল্পের স্বার্থে আন্দোলন। প্রলেতারীয় আন্দোলন হলো বিরাট সংখ্যাধিক্যের স্বার্থে বিপুল সংখ্যাধিক্যের আত্মসচেতন স্বাধীন আন্দোলন। ” “প্রত্যেক দেশের প্রলেতারিয়তকে অবশ্যই সর্বাগ্রে ফয়সালা করতে হবে স্বদেশী বুর্জোয়াদের সঙ্গে।” “ কমিউনিস্ট বিপ্লব হলো চিরাচরিত সম্পত্তি সর্ম্পকের সঙ্গে একেবারে আমূল বিচ্ছেদ..............। ” “...........শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবে প্রথম ধাপ হলো প্রলেতারিয়েতকে শাসক শ্রেণীর পদে উন্নীত করা, গণতন্ত্রের সংগ্রামকে জয়যুক্ত করা।”

এরপর প্রথম আন্তর্জাতিকের কর্মসূচিতে যা বলা হয়েছেঃ “শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তি শ্রমিকশ্রেণীকেই জয় করে নিতে হবে; শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তির জন্য যে সংগ্রাম, তার অর্থ তার শ্রেণীগত সুবিধা ও একচেটিয়া অধিকারের জন্য সংগ্রাম নয়; সমান অধিকার ও কর্তব্যের জন্য এবং সমস্ত শ্রেণী আধিপত্যের উচ্ছেদের জন্য সংগ্রাম;” “উৎপাদনের উপায়গুলির-তার মানে, জীবনের উৎসগুলির জবরদখলকারীরা শ্রমিকদের ওপরে যে অর্থনৈতিক আধিপত্য কায়েম করে সেটাই সকল প্রকার দাসত্ব; সকল সামাজিক ক্লেশ, সকল ধীগত অবক্ষয় ও রাজনৈতিক বশ্যতার ভিত্তি;” “অতএব শ্রমিকশ্রেণীর অর্থনৈতিক মুক্তি সাধনই মহান চূড়ান্ত লক্ষ্য, প্রত্যেকটি রাজনৈতিক আন্দোলনকে সে লক্ষ্যের দিকে চালিত করা দরকার।”

উল্লেখিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হলে তথা ব্যক্তিগত মালিকানার আধিপত্য উৎখাত করতে হলে, বুর্জোয়াশ্রেণীর উচ্ছেদ সাধন করতে হলে, প্রলেতায়িতের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে গেলে, সমান অধিকার ও কর্তব্যের জন্য ও সমস্ত শ্রেণী আধিপত্যের উচ্ছেদের জন্য সংগ্রাম জয়যুক্ত করতে হলে, নিজ হাতে ক্ষমতা দখল ও শ্রেণী বৈরিতাভিত্তিক পুরনো সমাজের বিনাশ ও শ্রেণীহীন ও ব্যক্তিগত মালিকানাহীন নতুন সমাজের প্রতিষ্ঠা করতে হলে শ্রমিকশ্রেণীকে অবশ্যই তার নিজস্ব রাজনৈতিক পার্টি অর্থাৎ একটি কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করতে হবে।

এরই লক্ষ্যে এবং বাস্তব আন্দোলন সংগ্রাম ও সংগঠনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় যথাযথ, আরো জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছিল ১৮৭১ সালে সেপ্টেম্বরে লন্ডনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলির প্রতিনিধিদের সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবে, তাতে বলা হয়েছেঃ “মালিক শ্রেণীগুলির মিলিত শক্তির বিরূদ্ধে শ্রমিকশ্রেণী একমাত্র তখনই শ্রেণী হিসেবে সক্রিয় হতে পারে যখন মালিক শ্রেণীগুলির পুরনো সমস্ত পার্টির বিরোধী পৃথক একটি রাজনৈতিক পার্টিতে শ্রমিকশ্রেণী সামিল হয়।” “সমাজ বিপ্লব ও তার চূড়ান্ত লক্ষ্য সকল শ্রেণীর বিলোপ সাধন-বিজয় মন্ডিত করার জন্য অবশ্যই চাই একটি রাজনৈতিক পার্টিতে শ্রমিকশ্রেণীর সামিল হওয়া।”

আবার মার্কস ও এঙ্গেলস যৌথ বিবৃতিতে অন্যান্যের মধ্যে ঘোষিত হয়েছে এ কথাগুলোঃ “নিজেদের চূড়ান্ত বিজয় লাভের জন্য নিজেদেরই যথাসম্ভব চেষ্টা করতে হবে, তাদের নিজস্ব শ্রেণীস্বার্থ যে কী সে বিষয়ে তাদের চিন্তাকে স্বচ্ছ করে তুলে, স্বাধীন পার্টি হিসেবে যথাশীঘ্রই সম্ভব নিজেদের স্থান গ্রহণ করে এবং গণতন্ত্রী পেটি বুর্জোয়াদের কপট বুলিতে মুহূর্তের জন্যও বিভ্রান্ত না হয়ে প্রলেতারীয় পার্টির স্বাধীন সংগঠনের কাজ থেকে বিরত না হয়ে তাদের রণধ্বনি তুলতে হবে ঃ নিরন্তর বিপ্লব এবং বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের সমস্বরে স্তবগানের জন্য আনত হবার পরিবর্তে শ্রমিকশ্রেণীকে এবং সর্বোপরি লীগকে সরকারি গণতন্ত্রীদের পাশাপাশি শ্রমিক পার্টির একটি স্বাধীন, গোপন ও প্রকাশ্য সংগঠন গড়ার জন্য অবশ্যই আত্মনিয়োগ করতে হবে।”

কিন্তু আমাদের দেশে অতীতে কথিত কমিউনিস্টরা কখনো গণতন্ত্রী পাটির মধ্যে, কখনো ন্যাপের মধ্যে, কখনো আওয়ামীলীগের মধ্যে লীন হয়ে গিয়ে কাজ করেছেন। পেটি বুর্জোয়াদের কপট বুলিতে বারবার বিভ্রান্ত হয়ে চলেছেন। বুর্জোয়াদের কর্মসূচিকে নিজেদের কর্মসূচি বলে চালিয়েছেন।

প্রয়োজন ছিল অর্থনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে রাজনৈতিক সংগ্রামের অচ্ছেদ্য মিলন ঘটানো- অর্থনৈতিক সংগ্রামকে রাজনৈতিক সংগ্রামে উন্নীত করা, মজুরি বৃদ্ধির দাবিকে মজুরি-দাসত্বের অবসানের দাবিতে উন্নীত করা, অর্থাৎ বুর্জোয়াদের ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠান, আইনসমূহকে শ্রমিক শ্রেণীর রাষ্টক্ষমতা দ্বারা অপসারণ করার জন্য - রাজনৈতিক আন্দোলনে শ্রমিকশ্রেণীসহ সমগ্র শ্রমজীবী শ্রেণীকে সমবেত করা। কিন্তু এগুলোর সব উত্তর হচ্ছে, দীর্ঘশ্বাসসমেত বিশাল-না। রুটির জন্য কমিউনিস্ট পাটি আর আজাদির জন্য কংগ্রেস-লীগ। তার মানে এইসব তথাকথিত কমিউনিস্ট পার্টিগুলো ট্রেড ইউনিয়নের উপরে উঠতে পারেনি। এখানে শ্রমিকদের সংগঠিত করা হয়েছে শুধুমাত্র রুটির জন্য, রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করার জন্য নয়। অতীত ও বর্তমানেও কথিত নেতারাও নিজেদের রেখেছেন ট্রেড ইউনিয়নে নেতা হিসেবে, আর বুর্জোদের কাছে সমর্পণ করেছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব। শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি না থাকলে এমনটাই স্বাভাবিক। মার্কস ও এঙ্গেলস এর ভাষায়, “এরা যা করে, তা হচ্ছেঃ বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের জন্য সমগ্র সমাজকে আমূল পরিবর্তনের বাসনা তো দুরের কথা, গণতন্ত্রী পেটি বুর্জোয়ারা সমাজ পরিস্থিতিতে সেইটুকু পরিবর্তনের জন্য সংগ্রাম করে যাতে বর্তমান সমাজ ব্যবস্থাটাই তাদের পক্ষে যথা সম্ভব সহনীয় ও আরামপ্রদ হতে পারে।”

নামকরণ ঃ আমাদের দেশে পার্টির নামের দিকটি হালকাভাবে নেয়ার সংস্কৃতি চালু আছে। নাম রাখার বেলায় শুধুমাত্র একটি ভাবনাই কাজ করে, যেন জনগণ অপরাপর বামপন্থীদের থেকে আলাদা করতে পারে। (অথচ আমাদের দেশে বাপ-দাদারা ছেলে-নাতিদের এমন নাম রাখেন, যা তাদের স্বপ্ন ও আকাক্সক্ষার প্রতিফলন) নামের প্রশ্নটি এদের কাছে যদি রসিকতারই ব্যাপার না হবে, তাহলে যখন কমিউনিস্ট লীগ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও সাম্যবাদী দল একীভূত হয়, তখন তারা কমিউনিস্ট ও সাম্যবাদী শব্দদু’টি বাদ দিয়ে ওয়ার্কার্স নাম গ্রহণ করলো কেন?

নামে কি যায় আসেÑ এই টাইপের চিন্তা থেকে তারা পার্টির নাম রাখে। অথচ মার্কসবাদের-লেনিনবাদের প্রতিষ্ঠাতারা এই নামের প্রশ্নে স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। মার্কসবাদের যে মূল শিক্ষা আন্তর্জাতিকতাবাদ, তা অস্বীকার করে যখন হিটলার ও মুসোলিনীর পার্টির নামের সাথে হুবহু মিল রেখে রাখা হয় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল এবং আজকের বাসদ নেতারাও জাসদ করাকালীন ও জাসদ থেকে বাসদ গড়ে তোলার সময়েও জাসদ নামটির মধ্যে ত্রুটি খুঁজে পেলেন না এবং নিজেদের পার্টির নাম রাখলেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল, তখন কি আর বুঝতে বাকী থাকে তারা নামের প্রশ্নটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনেই করেন না। আর যারা শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিকতার ব্যাপারটি আয়ত্ব করতে অক্ষম, তারা কি কমিউনিস্ট? কবি সুধীন্দ্রনাথের ভাষায়,“অনন্ত ক্ষতির সংজ্ঞা জপে তব পরাক্রান্ত নাম-/ নাম- শুধু নাম-শুধু নাম।।”

নামকরণের দিক থেকেও শ্রমিকশ্রেণীর পার্টিকে যে কমিউনিস্ট পার্টি নাম গ্রহণ করতে হবে সে বিষয়েও তৃতীয় আন্তর্জাতিকের সুস্পষ্ট ঘোষণার উল্লেখ আমরা পাই তার দ্বিতীয় কংগ্রেসের সিদ্ধান্তে, তাতে বলা হয়েছে যে, “কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকে যোগদানেচ্ছু প্রতিটি পার্টিকে নাম নিতে হবে ঃ অমুক দেশের কমিউনিস্ট পার্টি (তৃতীয় আন্তর্জাতিকের শাখা)। নামের প্রশ্নটা নিতান্ত একটা বাহ্যানুষ্ঠানের ব্যাপার নয়, অতি গুরূত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্ন। সমগ্র বুর্জোয়া জগৎ ও সমগ্র পীত সোশ্যাল-ডেমোক্রাটিক পার্টির সঙ্গে চূড়ান্ত সংগ্রাম ঘোষণা করেছে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক। কমিউনিস্ট পার্টি এবং শ্রমিকশ্রেণীর ঝান্ডার প্রতি বেইমান সাবেকী ‘সোশ্যাল-ডেমোক্রাটিক (সামাজিক গণতান্ত্রিক)’ বা ‘ সোশ্যালিস্ট (সমাজতান্ত্রিক)’ পার্টির’ মধ্যে তফাৎ কী সেটা প্রতিটি সাধারণ মেহনতীর কাছে পুরোপুরি পরিষ্কার থাকা আবশ্যক।” তাছাড়া এপ্রিল থিসিসের ‘ কী হওয়া উচিত আমাদের পার্টির নাম যা হবে বৈজ্ঞানিক বিচারে যথাযথ এবং প্রলেতারিয়েতের চিন্তা রাজনীতিগতভাবে স্পষ্ট করতে সহায়ক’ শিরোনামে ১৯নং থিসিসে বলেছেন, “এখন আমি আসছি শেষের দিকটায় আমাদের পার্টির নাম। আমাদের নিজেদের অভিহিত করতে হবে কমিউনিস্ট পার্টি বলে- ঠিক যেমন মার্কস এবং এঙ্গেঁলস অভিহিত করতেন নিজেদের।”

ফ্রেডারিক এঙ্গেলস কমিউনিস্ট ইশতেহারের লন্ডন, ১লা মে, ১৮৯০ সালের সংস্করণে লিখেছেন, “১৮৪৭ সালে সমাজতন্ত্র বলতে বোঝাত একটা বুর্জোয়া আন্দোলন, কমিউনিস্ট বোঝাত শ্রমিক আন্দোলন। ইউরোপীয় ভূখন্ডে অন্তত তখন সমাজতন্ত্র ছিল বেশ ভদ্রস্থ, আর কমিউনিজম ছিল ঠিক তার বিপরীত। ততদিন আগেই যেহেতু আমাদের অতি দৃঢ় মত ছিল যে, ‘শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তি হওয়া চাই শ্রমিকশ্রেণীরই নিজস্ব কাজ’, তাই দুই নামের মধ্যে কোনটি বেছে নেব সে সম্বন্ধে আমাদের কোনও দ্বিধা ছিল না। পরেও কখনো নাম পরিবর্তন করার কথা আমাদেও মনে আসেনি।”

অথচ এখনো অনেক পার্টিই নিজেদের সমাজতন্ত্রী, ওয়ার্কার্স, সর্বহারা নামে অভিহিত করছে। যারা মার্কস ও লেনিন পরবর্তী যুগে শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি করছেন বলে দাবি করেন, আর অন্যদিকে নিজেদের পার্টির নাম রাখছেন, সমাজতান্ত্রিক, ওয়ার্কার্স, সর্বহারা-সেইসব পার্টিগুলোকে আমরা কি কমিউনিস্ট পাটি বলতে পারি? নিজেরাইতো নিজেদের কমিউনিস্ট বলে পরিচিত করছেন না। বাস করছেন একুশশতকে, চিন্তার স্তর ইউটোপীয়া যুগের!

একটি কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্য/কর্মসূচি ঃ সমাজ বিকাশকে, বিশ্বকে সঠিকভাবে জানার এবং তাকে পরিবর্তন করার দায়িত্ব ইতিহাস শ্রমজীবী শ্রেণী ও তার পার্টির অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টির ঘাড়ে অর্পণ করে। কমিউনিস্ট পার্টির একটি ঐতিহাসিক রূপ আছে ঃ সংগ্রামের মধ্যে তার জন্ম, অবিচ্ছিন্ন লড়াইয়ের ভেতর দিয়ে ঘটে তার বৃদ্ধি ও প্রসার। পার্টির কর্মসূচি হবে নিরন্তর বিপ্লবের কর্মসূচি, যার উদ্দেশ্য হলো গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করে শ্রেণীহীন সাম্যবাদী সমাজে উত্তরণের দ্বার উন্মুক্ত করা। কমিউনিজম সম্পূর্ণরূপে বিজয়ী হলেই কেবল পার্টির ইতিহাস নির্দিষ্ট কর্তব্যের সমাধান হবে। তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের প্রথম কংগ্রেসে এ প্রসঙ্গের ঘোষণায় বলা হয়, “যে সমস্ত দেশে সোভিয়েত শাসন এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি, সে সমস্ত দেশের কমিউনিস্ট পার্টিগুলির প্রধান কর্তব্য হলো এইঃ ১। বুর্জোয়া গণতন্ত্র ও পার্লামেন্টারী ব্যবস্থার জায়গায় যে নতুন, প্রলেতারীয় গণতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা আবশ্যক, তার রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা, ঐতিহাসিক তাৎপর্য শ্রমিকশ্রেণীর ব্যাপক জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করা। ২। শিল্পের সমস্ত শাখার শ্রমিকদের মধ্যে, সেনাবাহিনীর সৈনিকদের মধ্যে, এবং যৌথবাহিনীর নাবিকদের মধ্যে আর সেই সঙ্গে ক্ষেত-মজুর ও গরীব চাষীদের মধ্যে সোভিয়েতগুলির সংগঠনের বিস্তার ঘটানো। ৩। সোভিয়েতগুলিতে কমিউনিস্টদের দৃঢ় সংখ্যাগরিষ্ঠতা গড়ে তোলা।”

একটি সঠিক বিপ্লবী পার্টির কর্তব্য ও দায়িত্ব প্রসঙ্গে বলতে যেয়ে লেনিন বলেছেন যে, “এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, কার্যক্ষেত্রে যা বিপ্লবী শ্রেণীর, প্রলেতারিয়েতের অগ্রবাহিনী, সামনের রক্ষীদল হতে চায়, তদুপরি যা শুধু ব্যাপক প্রলেতারীয় জনগণকেই নয়, মেহনতী ও শোষিত অ-প্রলেতারীয় জনগণকেও পরিচালনার কাজটা শিখতে চায়, সে কমিউনিস্ট পার্টির দায়িত্ব হলো যেমন শহরে, কারখানায়, মহল্লায়, তেমনি গ্রামে সবচেয়ে প্রাঞ্জল, সবচেয়ে বোধগম্য, সবচেয়ে স্পষ্ট ও জীবন্ত করে প্রচার, সংগঠন ও আন্দোলন চালাতে পারা।”

‘আমাদের কর্মসূচি’ প্রসঙ্গে লেনিন বলেছেন, “আমরা পুরোপুরি মার্কসের তত্ত্বের অনুগামীঃ এই তত্ত্বই প্রথম সমাজতন্ত্রকে ইউটোপিয়া থেকে বিজ্ঞানে পরিণত করেছে, সে বিজ্ঞানের একটি দৃঢ় ভিত্তি যুগিয়েছে, এবং সে বিজ্ঞানকে আরো বিকশিত করে সমস্ত খুঁটিনাটিতে তাকে নিষ্পন্ন করে কীভাবে এগুতে হবে তার পথ নির্দেশ করেছে। সাম্প্রতিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির মর্মোদ্ঘাটন করেছে তা, ব্যাখ্যা করেছে কীভাবে শ্রমিক খাঁটুনি শ্রম শক্তির বিক্রয় মারফত চাপা থাকে মুুষ্টিমেয় পুঁজিপতি, ভূমি, কলকারখানা, খনি এবং এই রূপ আরো মালিকদের কাছে লক্ষ লক্ষ বিত্তহীন মানুষের দাসত্ব। তা দেখিয়েছে কীভাবে আধুনিক পুঁজিবাদের বিকাশে বৃহদায়তন উৎপাদন কর্তৃক ক্ষুদ্র উৎপাদনকে পিষ্ট করার প্রবণতা দেখা দেয়, কীভাবে সে বিকাশ এমন পরিস্থিতি গড়ে তোলে যা সমাজের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা সম্ভব ও আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়। দৃঢ়মূল সব প্রথা, রাজনৈতিক কারসাজি, বিচক্ষণ আইনকানুন আর সুকৌশল সব মতবাদের আবরণতলে তা দেখতে শিখিয়েছে শ্রেণীসংগ্রামকে, বিত্তহীন জনগণের সঙ্গে, সমস্ত বিত্তহীনদের নেতৃস্থানীয় প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে সবধরনের বিত্তবান শ্রেণীর সংগ্রাম। তা পরিষ্কার করে তুলেছে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক পার্টির সত্যকার কর্তব্যঃ সমাজ পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রচনা নয়, পুঁজিপতি ও তাদের তাবেদারদের কাছে শ্রমিকদের অবস্থা উন্নয়নের বচনামৃত নয়, ষড়যন্ত্রে নামা নয়, প্রলেতারিয়েতের শ্রেণীসংগ্রাম সংগঠন এবং সেই সংগ্রামে নেতৃত্বদান, যা চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো প্রলেতারিয়েত কর্তৃক রাজনৈতিক ক্ষমতা জয় ও সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠন। .......মজবুত সমাজতান্ত্রিক পার্টি হতেই পারে না যদি না থাকে বিপ্লবীতত্ত্ব, যাতে সম্মিলিত হবে সমস্ত সমাজতন্ত্রী, যা থেকে নিজেদের সমস্ত প্রত্যয় আহরণ করবে তারা, যাকে তারা প্রয়োগ করবে নিজেদের সংগ্রাম পদ্ধতি ও কর্মপ্রকরণে।”

তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে “প্রলেতারীয় বিপ্লবে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা” নিয়ে গৃহীত সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে যে, কমিউনিস্ট পার্টিই বস্তুতঃ শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তির প্রধান ও মূল হাতিয়ার এবং শ্রমিকশ্রেণী ক্ষমতাসীন হলে পার্টির ভূমিকা হ্রাস পাওয়ার বদলে তা বৃদ্ধি পাবে। রুশ কমিউনিস্ট পার্টির দশম কংগ্রেসে “আমাদের পার্টিতে সিন্ডিক্যালিস্ট ও নৈরাজ্যবাদী বিচ্যুতি প্রসঙ্গে সিদ্ধান্তের প্রাথমিক খসড়া”য় লেলিন লিখেছেন “মার্কসবাদ এই শিক্ষা দেয় এবং শিক্ষাটা শুধু সমগ্র কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক কর্তৃক প্রলেতারিয়েতের রাজনৈতিক পার্টির ভূমিকা সম্পর্কে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসের সিদ্ধান্তেই (১৯২০) আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থিত হয়েছে যে- কেবল শ্রমিকশ্রেণীর রাজনৈতিক পার্টিটাই, অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টিই প্রলেতারিয়েত ও সমস্ত মেহনতী জনগণের এমন অগ্রবাহিনীকে ঐক্যবদ্ধ, শিক্ষিত ও সংগঠিত করে তুলতে সক্ষম, একমাত্র যে অগ্রবাহিনীটাই এ জনগণের অনিবার্য পেটি বুর্জোয়া দোলায়মানতা, প্রলেতারিয়েতের অভ্যন্তরে বৃত্তিগত সংকীর্ণতা বা বৃত্তিগত কুসংস্কারের সমস্ত অনিবার্য ঐতিহ্য ও পুনরাবৃত্তি রূখতে সমর্থ এবং পরিচালিত করতে পারে সমগ্র প্রলেতারিয়েতের সমস্ত ঐক্যবদ্ধ কার্যকলাপ, অর্থাৎ তাদের পরিচালনা করতে পারে রাজনৈতিকভাবে এবং তাদের মারফত সমস্ত মেহনতী জনগণকে। এছাড়া প্রলেতারীয় একনায়কত্ব অসম্ভব।” কমিউনিস্ট পার্টির মূল কর্তব্য হলো শিল্প ও শহুরে শ্রমিকদের শ্রেণী হিসেবে গঠিত করা এবং বিপ্লবী শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা, সঙ্গে কৃষি প্রলেতারিয়েত, গ্রামীণ মজুরি খাটা শ্রমিক (বছর, নির্দিষ্ট মেয়াদ বা দিন হিসেবে) পুঁজিবাদী কৃষি উদ্যোগে মজুরি খেটে যারা জীবিকা অর্জন করে এ শ্রেণীটির স্বাধীন ও স্বতন্ত্র সংগঠন (রাজনৈতিক, সামারিক, ট্রেড ইউনিয়ন, সমবায়ী, সংস্কৃতি ও শিক্ষামূলক ইত্যাদি সর্বপ্রকার) গড়া, তাদের মধ্যে প্রচার ও আন্দোলন বাড়িয়ে তোলা, প্রলেতারীয় পার্টিতে তাদের সামিল করা, প্রলেতারিয়েত ও তার পার্টির নেতৃত্বের পক্ষে তাদের টেনে আনা। একটি কমিউনিস্ট পার্টির আরো কর্তব্য হলো সমগ্র দেশের সর্বক্ষেত্রের শ্রমজীবী জনগণের মধ্যে কমিউনিস্ট কোষকেন্দ্র গঠন করা, অ-প্রলেতারীয় ও আধা-প্রলেতারীয় জনগণ এবং ছোট কৃষকদের প্রলেতারিয়েতের স্বপক্ষে টেনে আনা, গ্রামে শ্রেণীসংগ্রাম টেনে আনা, শ্রমিক ও কৃষকদের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক ঐক্য গড়ে তোলা। অর্থাৎ শুধু শহরে নয়, গ্রামেও প্রলেতারীয় বিপ্লবের সাফল্য পুরোপুরি নিশ্চিত করতে হবে কমিউনিস্ট পার্টিকে। এককথায় পার্টির কর্তব্য হলো প্রলেতারিয়েত ও মেহনতী জনগণের অধিকাংশকে কমিউনিজমের পক্ষে টেনে আনা, শ্রমিকশ্রেণীর ঐক্য কায়েম করা ও কার্যক্ষেত্রে সংযুক্ত কৌশল প্রয়োগ করার কর্তব্য হাজির করা। একটি বিপ্লবী পার্টি তথা কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্য হলো জনগণকে বৈপ্লবিক পরিস্থিতির অস্তিত্ব সম্পর্কে নিঃসন্দেহ করা, তাদের বৈপ্লবিক চেতনা ও দৃঢ় সংকল্প জাগিয়ে তোলা ও সেই লক্ষ্যে এগুনোর জন্য বৈপ্লবিক পরিস্থিতি অনুযায়ী সংগঠন প্রতিষ্ঠা ও তার রণনীতি ও রণকৌশল নির্ধারণ। পার্টির কর্তব্য হলোঃ প্রলেতারিয়েতকে শ্রেণী হিসেবে গঠিত করে বিপ্লবী কর্মসূচির ভিত্তিতে সংগঠিত করা, ক্ষমতা দখলের জন্য বিপ্লবী সংগ্রামের মনোবৃত্তিতে শ্রমিকদের শিক্ষিত করা, পিছনে মজুত বাহিনী প্রস্তুত করা ও প্রয়োজন মতো সম্মুখে সমাবেশ করা, প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, বিশ্বের অন্যান্য দেশের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন ও আন্তর্জাতিক সংগঠন গড়া, মার্কস্বাদ-লেনিনবাদের বিকৃতিকারীদের সংশোধনবাদীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। আর সে কর্তব্য পালন করতে যেয়ে লেনিনের যে কথাগুলো সর্বদায় আমাদের স্মরণে রাখতে হবে, তা হলোঃ “আমরা এই জন্য গর্বিত যে শ্রমিকদের আত্মমুক্তির মহান সমস্যাগুলির মিমাংসা আমরা করি বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা মেনে, বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, তাদের জ্ঞান, তাদের অভিপ্রায় হিসেবে নিয়ে, এবং এইভাবে সারা বিশ্বে কমিউনিজমের জন্য শ্রমিকদের শ্রেণী সংগ্রামের ঐক্য কার্যক্ষেত্রে হাসিল করে” (অষ্ট্রীয় কমিউনিস্টদের নিকট পত্র : ১৫.০৮.১৯২০) এবং “সত্যকার বিপ্লবী পার্টির সৃষ্টি হতে পারে কেবল বিপ্লবী শ্রেণীর সমস্ত শ্রেষ্ঠ উপাদানকে আত্মস্থ করে ও প্রতিক্রিয়াশীল নেতারা যেখানেই দেখা দেবে সেখানেই তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগিয়ে (বৃটিশ লেবার পার্টিতে যোগদানের প্রশ্নে বক্তৃতা : ০৬.০৮.১৯২০।)”

এখানেও প্রশ্ন আমাদের দেশে কি কখনো শিল্প ও শহুরে শ্রমিকদের শ্রেণী হিসেবে সংগঠিত করেছে কোন পাটি? উত্তর হলো না। বুর্জোয়া পাটির মতো ভেড়ার পালের মতো মাঠ ভর্তি করার জন্য শ্রমিকদের আনা হয়েছে। শ্রেণী হিসেবে সংগঠিত করা হয়নি। তাই শ্রমিকশ্রেণী নিজেদের কোন পার্টি খুঁজে পায়না। আহাজারী করে- সবার পার্টি আছে কেবল তাদেরই পার্টি নেই ।

কাদের দ্বারা কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয় ঃ একটি কমিউনিস্ট পার্টি বিভিন্ন ব্যক্তির জোট নয় বরং তা হলো একটি কেন্দ্রীভূত সংগঠন যে কারণে এটাও স্বীকৃত যে কোন পার্টিসংগঠনের অন্তর্ভূক্ত না হয়ে একটি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যও হওয়া যায় না। আর তাই প্রাথমিক সংগঠনের সৃষ্টি না করে শ্রমিকশ্রেণীর অগ্রগামী বাহিনী, শ্রমিক শ্রেণীর সংগঠিত বাহিনী তথা প্রলেতারিয়েতের শ্রেণী সংগঠনের সর্বোত্তম রূপ অর্থাৎ একটি কেন্দ্রীভূত পার্টি সংগঠন গঠিত হওয়ার কোনো অবকাশ নেই। সে কারণেই একটি কমিউনিস্ট পার্টি কোনো অবস্থাতেই আলগা আলগা মনোভাবের লোকদের তথা অকমিউনিস্টদের সমন্বয়ে গঠিত হতে পারে না, এমন কি শ্রমজীবী জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন কমিউনিস্ট বলে দাবিদারদের ঘোষণার মাধ্যমেও একটি কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হতে পারে না।

প্রথম আন্তর্জাতিকের কর্মসূচিতে বলা হয়েছেঃ “শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তি শ্রমিকশ্রেণীকেই জয় করে নিতে হবে; শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তির জন্য যে সংগ্রাম, তার অর্থ শ্রেণীগত সুবিধা ও একচেটিয়া অধিকারের জন্য সংগ্রাম নয়, সমান অধিকার ও কর্তব্যের জন্য এবং সমস্ত শ্রেণী আধিপত্যের উচ্ছেদের জন্য সংগ্রাম।”

১৮৭১ সালে সেপ্টেম্বরে লন্ডনে অনুষ্ঠিত প্রথম আন্তর্জাতিকের সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সম্মেলনে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়েছেঃ মালিকশ্রেণীগুলির মিলিত শক্তির বিরুদ্ধে শ্রমিকশ্রেণী একমাত্র তখনই শ্রেণী হিসেবে সক্রিয় হতে পারে যখন মালিক শ্রেণীগুলির পুরনো সমস্ত পার্টির বিরোধী পৃথক একটি রাজনৈতিক পার্টিতে শ্রমিক শ্রেণী সামিল হয়।”
গেরসন ট্রিয়েরকে লেখা ১৮ ডিসেম্বর, ১৮৮৯ খ্রীঃ তারিখের চিঠিতে এঙ্গেলস লিখেছেন, “প্রলেতারিয়েতের পক্ষে চূড়ান্ত মুহূর্তে জয়যুক্ত হওয়ার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হতে হলে তাকে অবশ্যই- এবং মার্কস ও আমি ১৮৪৭ সাল থেকেই এই কথা বলেছিÑ এক পৃথক পার্টি গঠন করতে হবে, যেটা অন্য সমস্ত পার্টি থেকে পৃথক ও সেগুলির বিপরীত এক পার্টি, আত্মসচেতন শ্রেণী পার্টি।” মার্কস ও এঙ্গেঁলস ১৮৭৯ সালের ১৭-১৮ সেপ্টেম্বর তারিখের “সার্কুলার পত্রে” সুস্পষ্টভাবেই উল্লেখ করেছেন যে, “এ যাবৎ যেসব শ্রেণী শাসকশ্রেণী হয়ে এসেছে, তাদের থেকে লোক এসে জঙ্গী প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে যোগ দেবে এবং তাদের শিক্ষাদানের কাজ করবে, এটা এমন এক অনিবার্য ঘটনা যার মূল বিকাশ ধারার মধ্যেই নিহিত। ..... আন্তর্জাতিক যখন ঘটিত হয়েছিল তখন পরিষ্কার করেই আমরা এই রণধ্বনি সূত্রবদ্ধ করেছিলামঃ শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তিসাধন হওয়া চাই শ্রমিকশ্রেণীর নিজের কাজ। অতএব, যাঁরা খোলখুলিই বলেন, নিজেদের মুক্ত করার মতো শিক্ষাদীক্ষা শ্রমিকদের নেই, উপর থেকে, মানবদরদী বড় বুর্জোয়া ও পেটিবুর্জোয়াদের সাহায্যে তাদের মুক্ত করতে হবে তাদের সঙ্গে আমরা সহযোগিতা করতে পারি না।’’ (আমাদের দেশের অধিকাংশ পাটি তা মনে করে । মানব দরদী- পেটিবুর্জোয়াদের ভর্তি তাই পার্টি গুলো)

প্রলেতারীয় আন্দোলনের ইতিহাস থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে, প্রথম আন্তর্জাতিক শত্রু বাকুনিনপন্থীদের বিরুদ্ধে সংগ্রামকালে ১৮৭১ সালে “মেকী সংস্কারক, হাতুড়ে বুর্জোয়া লোকজন আর ভাড়াটে রাজনীতিকদের” হাত থেকে মার্কিন শাখাগুলোকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে তাদের সদস্যমন্ডলীর অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ মজুরি শ্রমিক হওয়া চাই। তাছাড়াও, সে সময়কালে আন্তর্জাতিকের কতিপয় মার্কিন শাখায় উপরন্তু সুবিধাবাদের প্রভাব পড়েছিল, এই প্রভাব আরো বেশি লক্ষ্য করা যায় নিউইয়র্কের ১২ নং শাখায়, যেখানে সদস্যমন্ডলী মূখ্যত ছিল বুর্জোয়া শ্রেণীভূক্ত। মার্কসের প্রস্তাব অনুসারে কংগ্রেসে অনুমোদিত হওয়ার আগেই উক্ত শাখাকে আন্তর্জাতিক থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৭২ সালের জুলাই মাসে আন্তর্জাতিকের সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিধির ৯নং বিধিকে সম্প্রসারণ করে যা অন্তর্ভূক্ত করা হলো, “ কোন নতুন শাখার সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের কম মজুরী শ্রমিকেরা হবে না।” (ঋৎবফবৎরপশ ঊহমবষং: অ ইরড়মৎধঢ়যু, চৎড়মৎবংং চঁনষরংযবৎং, গড়ংপড়:ি চ-২৬৬ )

এখন ভাবুন, মার্কস বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ তথা ভারত বর্ষের সমস্ত পার্টিই বহিষ্কারের শিকার হতো নিশ্চয়ই।
লেনিন “এক কদম আগে দু’কদম পিছে” গ্রন্থে দেখিয়েছেন যে, “সাধারণভাবে সংগঠনের স্তর এবং বিশেষ করে সংগঠনের গোপনীয়তার স্তরের ওপর নির্ভর করে (পার্টিকে) মোটামুটি নিম্নোক্ত কয়েকটিভাগে ভাগ করা যায় ঃ (১) বিপ্লবীদের সংগঠন; (২) শ্রমিকদের সংগঠন, যথাসম্ভব ব্যাপক ও যথাসম্ভব বিচিত্র ধরনে গড়ে তোলা (আমি শুধু শ্রমিক শ্রেণীর কথা বলেছি বটে, কিন্তু এটা স্বতঃস্দ্ধি হিসেবে ধরে নেয়া হয়েছে যে, কতকগুলি পরিস্থিতিতে অন্যান্য শ্রেণী থেকে আসা কিছু কিছু লোককেও এর অন্তর্ভূক্ত করা যাবে)। পার্টি গঠিত হবে এই দু’টি বিভাগ মিলে। তাছাড়াও থাকবে, (৩) পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আছে এমন ধরনের শ্রমিক সংগঠন; (৪) শ্রমিকদের এমন সব সংগঠন যা পার্টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় বটে, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে পার্টির নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা মেনে চলে; (৫) শ্রমিকশ্রেণীর এমন সব অসংগঠিত অংশ, যারাও আংশিকভাবে, অন্তত শ্রেণীসংগ্রামের বৃহৎ বৃহৎ বিস্ফোরণে সোশ্যাল-ডেমোক্রাটিক পার্টির পরিচালনাধীনে এসে যাবে।” এই গ্রন্থে তিনি আরো দেখিয়েছেন যে, “যিনি পার্টির কর্মসূচি গ্রহণ করেন এবং অর্থ দিয়ে ও পার্টির কোনো না কোনো সংগঠনের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে অংশ নিয়ে উভয় ভাবেই পার্টিকে সমর্থন করেন, তিনিই পার্টির সদস্য হবেন।”

১৯২১ সালে তৃতীয় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের তৃতীয় কংগ্রেসে গৃহীত “কমিউনিস্ট পার্টির সংগঠন সম্পর্কিত প্রস্তাব” এ বলা হয়েছে, “ কমিউনিস্ট মতবাদে দৃঢ় বিশ্বাস, প্রথমে প্রার্থী সদস্য, পরে সভ্য হিসেবে নাম রেজিষ্ট্রীকরণ ছাড়াও কমিউনিস্ট পার্টিতে সদস্যদের আরো কতকগুলি স্বাভাবিক কর্তব্য আছে- যেমন, নির্ধারিত পার্টি চাঁদা, পার্টি পত্রিকার চাঁদা নিয়মিত ভাবে দেয়া ইত্যাদি। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পার্টির দৈনন্দিন কাজে প্রত্যেকটি সভ্যের অংশগ্রহণ।” ওই প্রস্তাবে আরো বলা হয়েছে, “তত্ত্বের প্রয়োগের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ সংগ্রাম পরিচালনা করা অথবা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি করাÑ এই হচ্ছে আমাদের সামগ্রিক পার্টি কাজ।”

প্রলেতারিয়েতের পার্টি প্রসঙ্গে বলতে যেয়ে লেনিন বলেছেন, “পার্টি হলো একটি শ্রেণীর রাজনৈতিকভাবে সচেতন, অগ্রসরঅংশ তার অগ্রনায়ক। এই অগ্রনায়কের শক্তি তার সদস্য সংখ্যার তুলনায় দশগুণ, শতগুণ, বা ততোধিক গুণ বেশি।” (ঈড়ষষবপঃবফ ড়িৎশং: াড়ষ-১৯, চ-৪০৬, ১৯৬৮)

আবার বৃটিশ কমিউনিস্ট পার্টির “বৃটিশ লেবার পার্টিতে যোগদানের প্রশ্নে বক্তৃতা”য় লেনিন ৬ আগস্ট ১৯২০ সালে বলেছিলেন যে, “‘ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের রাজনৈতিক সংগঠন’ বা সে আন্দোলনের ‘রাজনৈতিক অভিব্যক্তি’ এ সংজ্ঞা সত্যিই ভ্রান্ত। বলাইবাহুল্য লেবার পার্টি প্রধানত শ্রমিকদের নিয়েই গড়া। কিন্তু পার্টিটা সত্যই শ্রমিকদের রাজনৈতিক পার্টি কিনা, এটা নির্ভর করে শুধু শ্রমিকদের দিয়ে পার্টিটা গড়া কিনা তার ওপরেই নয়, সে সঙ্গে কে তাকে চালাচ্ছে, তার ক্রিয়াকলাপ ও তার রাজনৈতিক রণকৌশলের সারমর্ম কী তার ওপরেও। পার্টিটা সত্যিকারের প্রলেতারীয় পার্টি কিনা সেটা শুধু এই শেষ কথাটাতেই নির্ধারিত হয়।”

লেনিন জার শাসিত রাশিয়ার পার্টি গড়ার প্রাথমিক অবস্থায় পার্টি সংগঠনে প্রলেতারিয়েতের সংখ্যা ষাটভাগের কথা উল্লেখ করলেও, পরে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা তথা আন্দোলন-সংগ্রামের বাস্তব বিবেচনা করে ১৯০৫ সালে ২০ এপ্রিল বলেছিলেন, “আমি অবশ্য জোরালোভাবে এর পক্ষপাতি যে পার্টি কমিটিতে বুদ্ধিজীবী যদি থাকে দু’জন তো শ্রমিক থাকবে আটজন।” (ঈড়ষষবপঃবফ ড়িৎশং: ঠড়ষ-৮, চ-৪০৮, ১৯৬৫)

আবার রাশিয়ার রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে তথা সম্মেলন, ট্রেড ইউনিয়ন ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা অর্জনের পরে (অর্থাৎ, ১৯০৫ সালের ১৭ অক্টোবর তারিখে এ বিষয়াবলি সম্বলিত ইশতেহার প্রকাশের পরে) ১৯০৫ সালের নভেম্বরে “পার্টির পুনর্গঠন প্রসঙ্গে বলেন, ‘তৃতীয় কংগ্রেসে আমি এই ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলাম যে, পার্টি কমিটিতে বুদ্ধিজীবী যদি থাকে দু’জন থাকে তো শ্রমিক থাকবে আটজন, আজকের অবস্থায় এই ইচ্ছা একবারেই বাতিলের পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। এখন আমাদের ইচ্ছা হবে অবশ্যই এই যে নতুন পার্টি সংগঠনে সোশ্যাল-ডেমোক্রাট বুদ্ধিজীবী যদি থাকে একজন তো সোশ্যাল -ডেমোক্রাট শ্রমিক থাকবে কয়েক শো।” (ঈড়ষষবপঃবফ ড়িৎশং: ঠড়ষ-১০, চ-৩৬, ১৯৬৫)

আমাদের দেশে এরকম বৈশিষ্ট্যের একটি পার্টিও কি আছে? অতীতে কি ছিল? উত্তর হবে, না। পার্টিতেই যদি শ্রমিকশ্রেণীর সংখ্যাগরিষ্ঠতা, কর্তৃত্ত্ব, পরিচালনা না থাকে, সে পার্টি ক্ষমতায় গেলে শ্রমিকশ্রেণীর একনায়কত্ব/কর্তৃত্ত্ব কিভাবে সম্ভব? কাঁঠালের আমসত্তের মতো পেটি বুর্জোয়াদের শ্রমিকপার্টি আর কি!

অনেক সংগঠন আছে, যারা ট্রেড ইউনিয়নের কাজকেই প্রধানত তুলে ধরে। কিন্তু আওয়ামীলীগ-বিএনপি’র ট্রেড ইউনিয়ন তো সবচেয়ে বড়, এখানে তাহলে বলতে হয়, আওয়ামীলীগ-বিএনপি বিপ্লবী সংগঠন? তা তো কেউ বলে না কারণ, আওয়ামীলীগ-বিএনপিতে কর্তৃত্বে শ্রমিকশ্রেণী নাই। সেখানে শ্রমিক সংগঠনে শ্রমিকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ও বুর্জোয়াদের মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত। আর পার্টিতে বুর্জোয়ারা সংখ্যাগরিষ্ঠ ও বুর্জোয়া মতাদর্শ দ্বারা পরিচালিত। অর্থাৎ শ্রমিকদের জন্য শ্রমিক সংগঠন আর বুর্জোয়াদের জন্য পার্টি - এই নীতিতে বুর্জোয়া সংগঠন পরিচালিত হয়। কিন্তু কথিত কমিউনিস্ট পার্টিগুলো কি এর বাইরে? ভদ্রলোকদের জন্য কমিউনিস্ট পার্টি আর শ্রমিকদের জন্য ট্রেড ইউনিয়ন, তাই নয়? বোতল ভিন্ন মাল এক।

এমনকি মাও সে তুঙকে পর্যন্ত কেন, কোন বাস্তবতার কারণে বলতে হয়েছিলÑ কেন্দ্রীয় কমিটিতে কামান দাগো! নিশ্চয়ই কেন্দ্রীয় কমিটির বিপ্লববিরোধী তৎপরতার কারণে? কিন্তু কেন, কেন্দ্রীয় কমিটির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের ইতিহাসবিরোধী ভূমিকা? এই প্রশ্নেরও জবাব পাওয়া যাবে পার্টি কাদের দ্বারা গঠিতÑ এই জায়গাটি খুঁজলেই। চিনা কমিউনিস্ট পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এসেছিল মধ্যবিত্ত ও কৃষকশ্রেণী থেকে। আর সিপিবি’র জনৈক তাত্ত্বিক যখন (প্রকৃত পক্ষে সকল পার্টির নেতারাই মনে করেন) বলেন, জসিম মন্ডলের মত অনেক নেতাই তাদের আছেন, যারা শ্রমিক শ্রেণী থেকে এসেছেন। আর মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-মাও এঁরা তো কেউ শ্রমিক শ্রেণী থেকে আসেননি, স্টালিন অবশ্যই এসেছিলেন। অর্থাৎ সিপিবিতে শ্রমিকদের নেতৃত্ব নাই এটা যেমন ঠিকনা, তেমনি মার্কস-লেনিনকে দেখিয়ে বলা যায়, পার্টিতে যে সব সময় শ্রমিকদের নেতৃত্ব থাকতেই হবে, এটাও ঠিক না। যোগ্যতায় যে আসবে, সেই নেতা হবে- এটাই হচ্ছে মুল কথা।

এটি পড়ে মনে হবে, কথাতো ঠিকই। আসলে ঠিক নাই। এরা শ্রেণী বিষয়টিই বুঝেননি। মার্কস-লেনিনরা কখনোই ব্যক্তির একনায়কত্বের কথা, নেতৃত্বের কথা বলেন নাই। বলেছেন, শ্রেণীর একনায়কত্বের কথা, শ্রেণীর নেতৃত্বের কথা। পার্টিতে যেহেতু গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে, সেহেতু ব্যক্তি কে নেতা হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ কোন শ্রেণী নেতার ভুমিকায় আছে, সংখ্যাগরিষ্ঠ সেটা। আসলে কথিত কমিউনিস্টরা যখন বলেন, তখন ব্যক্তির বাইরে তারা আর কিছু দেখতে পায় না। ভাবনাটা শেষ পর্যন্ত এখানে এসে ঠেকে-একজন লেনিন বা মাও নাজিল হলেই কেল্লাফতে। শ্রেণীর কর্তৃত্ত্বের বিষয়টি এদের পক্ষে বোঝা সম্ভব না।
পার্টিতে সদস্যভূক্তির নিয়ম ঃ যে কোন পরিস্থিতিতে একজন পার্টি সদস্য পুরোপুরি এবং শর্তহীনভাবে তার ব্যক্তিস্বার্থকে পার্টিস্বার্থের অধীন করতে পারে কি না তার ওপরেই কমিউনিজম, বিপ্লব ও পার্টির প্রতি একজন সদস্যের আনুগত্যের পরীক্ষা নির্ভর করে। সকল সময়ে এবং যেকোন প্রশ্নে একজন পার্টি সদস্যকে সামগ্রিকভাবে পার্টি স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে হবে, সেগুলোকে প্রথমস্থান দিতে হবে এবং ব্যক্তিগত ব্যাপার ও স্বার্থ দ্বিতীয়স্থানে আসবে। এরকম পার্টি সদস্য পেতে হলে অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে পার্টি সদস্য সংগ্রহ করতে হবে।

পার্টি সদস্যপদের জন্য প্রত্যেকে অবশ্যই ব্যক্তিগতভাবে নির্ধারিত আবেদনপত্রে আবেদন করবে, আবেদন পত্রে সই করবে এবং অন্তত দুইজন সুপারিশকারী পার্টি সদস্যদের কাছ থেকে দায়িত্বশীল সুপারিশ সংগ্রহ করবে। কোন সংগঠন বা গ্রুপকে তথা তার অন্তর্ভূক্ত সদস্যগণকে সরাসরি ঘোষণা দিয়ে পার্টির অন্তর্ভূক্ত করা যাবে না। প্রত্যেককে ব্যক্তিগতভাবে পার্টিতে অন্তর্ভূক্তির নীতিমালা মেনে চলতে হবে।

প্রত্যেক আবেদনকারীকে শিক্ষানবিসী সদস্যরূপে গ্রহণ করা হবে। শিক্ষানবিসীর সময়কাল ছয়মাস থেকে তিন বছর পর্যন্ত হবে। শিক্ষানবিসী সময়ের উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষানবিসী সদস্যকে প্রাথমিক মার্কসবাদী লেনিনবাদীতত্ত্ব, কমিউনিস্ট নৈতিকতা ও পার্টি শিক্ষাদান এবং তার রাজনৈতিক গুণাবলি পর্যবেক্ষণে পার্টি সংগঠনকে সুযোগ দান। যার অর্থ হবে পার্টির সাংগঠনিক কাজের অংশ হিসেবে একজন নতুন সদস্যের শিক্ষা ও পর্যবেক্ষণের ব্যাপারে অবশ্যই মনোযোগ দিতে হবে। পার্টি গণতন্ত্র, কর্মসূচি ও নীতি উপলব্ধি, সংগঠন, শ্রম এবং জনগণ ও বাস্তব থেকে সত্য সন্ধানের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সঠিক দৃষ্টিভঙ্গিসহ মৌলিক কমিউনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সাহায্য করার জন্য শিক্ষানবিসী সদস্যর শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যয়ণ, প্রচার, আন্দোলন-সংগ্রাম শিক্ষানবিসী সময়ের অন্তর্ভূক্ত।

বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশা থেকে আগত পার্টিতে ভর্তিচ্ছু ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হবে, শ্রেণী ও পেশা ভিত্তিক শিক্ষানবিসীকাল ও দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পাদনের মাত্রাও আলাদা হবে। এক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই লেনিনের ২৪ মার্চ ১৯২২ লিখিত “পার্টিতে নতুন সদস্যভূক্তির শর্ত” মেনে চলতে হবে। তাঁর প্রস্তাব ছিল, “অন্তত দশ বছর যিনি কোনো বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছে একমাত্র সেরূপ শ্রমিকদের জন্য শিক্ষানবিসীরকাল হবে ছয় মাস, অন্যান্য শ্রমিকদের ক্ষেত্রে শিক্ষানবিসীর কাল হবে আঠারো মাস, কৃষক ও লালফৌজের ক্ষেত্রে শিক্ষানবিসীর কাল হবে দুই বছর এবং অন্যান্যগণের ক্ষেত্রে শিক্ষানবিসীর কাল হবে তিন বছর।” (ঈড়ষষবপঃবফ ড়িৎশং: ঠড়ষ-৩৩, চ-২৫৪, ১৯৬৮)

এই নিয়মগুলো বাংলাদেশের তথা ভারতবর্ষের কোন একটি পার্টিতে কি মানা হয়েছে? এখানেও উত্তর হবে-না। কারণ মানাই যদি হবে, তাহলে পেটি বুর্জোয়াদের সংখ্যা গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পার্টিগুলো পরিচালিত হবে কেন? সদস্য/ নেতাদের তাত্ত্বিক মানের এই হাল কেন? দশ টাকা চাঁদা আর একদিন মিছিলে গেলেই পার্টি সদস্য হওয়া সম্ভব যেখানে সেখানে আর কি লাগে! ব্যক্তি নিজেকে সদস্য পরিচয় দেওয়ার আগে কথিত পার্টির সংগঠকরা অন্যদের কাছে সদস্য হিসেবে ঐ ব্যক্তিকে পরিচয় করিয়ে দেয়। অথচ সাধারণ ব্যাপার যেটি, ব্যক্তি প্রার্থী সদস্য ফরম পূরণ করার পর নির্ধারিত কর্তব্য সফলভাবে পূরণ করা কালীন সময়ে ঐ ব্যক্তি নিজেকে সদস্য পরিচয় দিলেও সংগঠন তখনও তাকে সদস্য বলে ঘোষণা করবে না, মেয়াদ ও কর্তব্য তখনও যেহেতু শেষ হয় নাই। কিন্তু আমাদের এখানে উল্টো। সদস্য হিসেবে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নিজেকে পরিচয় দেওয়ার আগেই সংগঠকেরা পরিচয় দেয়। ব্যক্তি এখানে বোঝাপড়ার সুযোগ পাওয়ার আগেই চিহ্নিত হয়ে যান। তাই একজন ব্যক্তির পক্ষে রাজনীতিকদের সাথে মেলামেশা করারও সুযোগ থাকে না চিহ্নিত হওয়ার ভয়ে। এই ষড়যন্ত্রমূলক সংস্কৃতিই হলো কথিত কমিউনিস্টদের পার্টি সংস্কৃতি। কোথায় মার্কসবাদ আর এরা কোথায়!
মৃতেরা ধরছে জীবিতকে ঃ খুব সম্ভব আমাদের মতোই অবস্থা মোকাবিলা করতে হয়েছে এঙ্গেলসকে। তিনি সেই কবে লিখে গেছেন, “প্রথমে নিজেরা নতুন বিজ্ঞানটিকে গভীরভাবে অনুধাবণ না করে তাদের প্রত্যেকেই সঙ্গে করে আনা নিজের মতের মতো করে একে ছেটে কেটে নিয়েছেন, এবং সঙ্গে সঙ্গেই একটি নিজস্ব ব্যক্তিগত বিজ্ঞান তৈরি করে ফেলেছেন এবং কাল বিলম্ব না করে এগিয়ে এসেছেন সেই বিজ্ঞান শিক্ষাদানের বড়াই করে। তাই এই ভদ্রলোকদের যতগুলি মাথা, ঠিক প্রায় ততগুলি মতবাদ।” (রচনা সংকলন, বাংলা ঃ দ্বিতীয় খন্ড দ্বিতীয় অংশ, পৃ-১৭১) আমাদের দেশের এই সমস্ত পার্টিই নিজেদের মার্কসবাদী পার্টি বলে দাবি করে। জেনেছি, মার্কস-এঙ্গেলস্- লেনিনরা তাঁদের কালে বিপুল সংগ্রামের মাধ্যমে মার্কসবাদকে বিজ্ঞান হিসেবে পার্টি প্রশ্নে কী কী শর্ত/দিক প্রতিষ্ঠা করেছেন। পার্টি করতে হলে এসব বিষয় মানতেই হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পার্টি প্রশ্নে বারবার এইসব দিক আলোচনায় আনতেই হচ্ছে, যে কথা শেষ হয়ে গেছে তা বারবার ফিরে ফিরে আসছে। আমরাই নাকি আবার ভ্যানগার্ড! শ্রমিকশ্রেণীসহ বুর্জোয়ারাও দেখছে, আমরা আসলে রিয়ার্গার্ড। অগ্রসর তত্ত্ব দিয়ে পরিচালিত না হলে বিপ্লবীরা আর ভ্যানগার্ড থাকেন কী করে? আমরা যারা বিপ্লবে সামিল হতে চাই, তাদের তাই বুঝে নেয়া চাই এদেশে সত্যিকার অর্থে কোন বিপ্লবী পার্টি আছে কি নেই। সেখানে আমাদের কর্তব্য, যদি থাকে, তাহলে উচিত সেখানে যোগ দেওয়া আর যদি না থাকে, তাহলে তা গড়ে তোলায় ভূমিকা নেয়া উচিত। মার্কসবাদ-লেনিনবাদ অনুসারে দেখা যাচ্ছে- নাই।

বৃটিশ আমল ঃ আজকের রাজনীতির এই দেউলেপনা হঠাৎ করে আজকের অবস্থায় আসেনি। মার্কসের ভাষায়, আমাদের ভোগাচ্ছে কেবল জীবিতেরাই নয়, মৃতেরাও। মৃত ধরছে জীবিতকে। বর্তমানের আলোচনায় তাই মৃতরাও ফিরে ফিরে আসে।

১৯০৮ সালের ভারতবর্ষের একটি বিশেষ ঘটনার প্রতি শ্রমিকশ্রেণীর মনোভাবের একটি দৃষ্টিভঙ্গি এরকমঃ বাল গঙ্গাধর তিলককে তাঁর নিজস্ব পত্রিকা “কেশরী” তে কয়েকটি রাজদ্রোহমূলক প্রবন্ধ ছাপার অভিযোগে সরকার অভিযুক্ত করে এবং ওই বছরের ২৪ জুন তাঁকে গ্রেফতার করে। এই ঘটনাটি সুপ্রকাশ রায় তাঁর “ভারতের বৈপ্লবিক সংগ্রামের ইতিহাস” বইয়ে এভাবে তুলে ধরেছেনঃ “তিলকের গ্রেফতারের খবর প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথমে শোলাপুর, নাগপুর, পুনা ও বোম্বাই শহরে এবং পড়ে ক্রমশঃ সমস্ত ভারতবর্ষে সক্রিয় প্রতিবাদের ঝড় বইতে থাকে। পুনা, বোম্বাই, মাদ্রাজ, কলিকাতা, লাহোর প্রভৃতি স্থানে উক্ত গ্রেফতারের প্রতিবাদে ধর্মঘট পালিত হয়। শ্রমিক শ্রেণী স্বতঃস্ফূর্তভাবে এ গ্রেফতার ও মামলার তীব্র প্রতিবাদ জানায় শুধু মুখে নয় শত শত জীবন বিসর্জন দিয়ে।” আরো বিস্তারিত জানার জন্য সুপ্রকাশ রায়ের বইটি পড়তে পারেন। এই হাজার হাজার শ্রমিকের অভূতপূর্ব লড়াই ও আত্মত্যাগ নিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর এই সচেতন রাজনৈতিক সংগ্রাম নিয়ে কমরেড লেনিন তার ঞযব ঘধঃরড়হধষ খরনবৎধঃরড়হ গড়াসবহঃ রহ ঃযব ঊধংঃ- এ লিখেছেন, “ভারতবর্ষের জনসাধারণ তাহাদের লেখক ও রাজনীতিক নেতৃবৃন্দকে রক্ষা করিবার জন্য সংগ্রামে অবতীর্ণ হইতে আরম্ভ করিয়াছে। ভারতের গণতান্ত্রিক নায়ক তিলকের বিরুদ্ধে বৃটিশ শৃগালের দল দন্ডাদেশ ঘোষণা করিয়াছে, দীর্ঘকালের নির্বাসন দন্ড। বৃটিশ ‘হাউস অব কমনস্’ -এ প্রশ্নোত্তরে প্রকাশিত হইয়াছে যে, ভারতীয় জুরিরা তাঁহার মুক্তির জন্যই সুপারিশ করিয়াছিলেন। কিন্তু সংখ্যাধিক বৃটিশ জুরিদের ভোটের জোরেই এই দন্ড দেওয়া হইয়াছে। একজন গণতান্ত্রিক নায়কের বিরুদ্ধে অর্থ পিশাচ মুলধনীদের পদলেহী কুকুরদের এই প্রতি হিংসা দন্ডাদেশের বিরুদ্ধে বোম্বাইয়ের রাজপথে প্রতিবাদ-অভিযান এবং ধর্মঘটের ঝড় বহিতেছে। ÑÑ ভারতবর্ষের শ্রমিকশ্রেণী ইতিমধ্যেই শ্রেণী সচেতন রাজনীতিক গণসংগ্রাম চালনার জন্য যথেষ্ট যোগ্যতা অর্জন করিয়াছে। সুতরাং ভারতবর্ষে রুশীয় পদ্ধতিতে পরিচালিত বৃটিশ শাসনের শয়তানি খেলা এবার শেষ হইতে চলিতেছে।”

লেনিন লন্ডনে বসে খবরের কাগজ পড়ে ভারতবর্ষের আন্দোলনের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলেন আর ভারতীয় নেতারা তার সামান্যতমও বোঝার চেষ্টা করলেন না, নাকি না বোঝার ভান করলেন। কারণ পরবর্তীতে ভারতীয় নেতারা ভারতবর্ষের শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি গড়লেন শ্রমিকশ্রেণী ছাড়াই। ১৯২০ সালে তাসখন্দে বসে যারা তথাকথিত কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেছিলেন। তারা হলেন (১) এম.এন.রায় (২) এভেলিনটেল্ট রায় (এম.এন. রায়ের স্ত্রী) (৩) এ. মুখার্জি (৪) রোজা ফিটিংগফ (৫) মুহাম্মদ আলি (৬)এম. প্রতিপদি বায়াংকার আচার্য এবং (৭) মুহম্মদ শফিক সিদ্দিকী। মুহম্মদ শফিক সিদ্দিকীকে সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। তিন মাস পর ‘ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’র অবস্থান হলো সদস্য সংখ্যার দশজন। তার মধ্যে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীর সংখ্যা দুইজন, সশস্ত্র বিপ্লববাদী একজন, মুজাহির দুইজন, মুজাহিরীন তিনজন, বিদেশিনী দুইজন। মার্কস-লেনিন নির্দেশিত সদস্যর আনুপাতিক হার তলায় চাপা পড়ে থাকলো।

তথাকথিত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য জ্ঞান চক্রবর্তী ‘ঢাকা জেলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের অতীত যুগ’ বইয়ে লিখেছেন, “...কারণ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে পার্টি এখানকার আপোষবাদী বুর্জোয়া নেতৃত্বের উপরে নির্ভর করিয়াছে, শ্রমিকশ্রেণীকে স্বাধীনভাবে ক্ষমতা দখল করিতে আহবান জানায় নাই এবং পার্টি সংগঠন ও তাহার নেতৃত্বে একটি কঠোর শৃঙ্খলা সম্পন্ন বিপ্লবী পার্টিতে পরিণত না হইয়া একটি সৌখিন পেটিবুর্জোয়া পার্টিতে পরিণত হইয়াছে।” তাছাড়া তিনি নেতাদের সর্ম্পকে বলেছেন,“---চূড়ান্ত হঠকারিতা ও বালসুলভ চাপল্যের পরিচালক” ইত্যাদি আখ্যায় আখ্যায়িত করেছেন এবং “তখন শ্রমিকদের ভিতরে কোন সমর্থন না থাকা” সে কথাও বলেছেন। এবার ভারতবর্ষ বিভক্ত হওয়া নিয়ে যে কমিউনিস্ট পার্টি ক্রন্দন করে, সেই কমিউনিস্ট পার্টির ১৯৪০-৪১ সালের মুখপত্রে-চবড়ঢ়ষব ধিৎ (জনযুদ্ধ) জানা যায়, কংগ্রেস ভারত বিভাগে সম্মতি দেওয়ার ঢের আগে, যখন রাশিয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেয় নাই, তখন তারা ভারতবর্ষ যে বিভক্ত হওয়া উচিত সে বিষয়ে অভিমত প্রকাশ করে। এবং ভারতবর্ষের কোন্ অংশ কোথায় যাবে, তাও এঁকে দেন। এটি একটি ঐতিহাসিক দলিল। অতুল ঘোষ আরও লিখেছেন,“তাদের প্রস্তাবিত ম্যাপে শুধু ভারত ভাগ নয়, বাঙ্গালা ও পাঞ্জাবকে বিভক্তির ফর্মূলাও দিয়েছিল ঐ কমিউনিস্টরাই।”

এ প্রসঙ্গে সমাজতন্ত্রী নেতা রামমোহন লোহিয়ার উক্তিটাও তুলে ধরছি, “দেশ ভাগের ব্যাপারে কম্যুনিস্ট সমর্থন পাকিস্তানের জন্ম দেয়নি। তা কেবল কাজ করেছে ্ইনকিউবেটরের অর্থাৎ কৃত্রিম ডিম ফুটানোর যন্ত্র হিসাবে।

তখন তার সেই কাজের কথা কেউ মনে রাখেনি। আমি কম্যুনিস্ট বিশ্বাসঘাতকতার এই দিকটির কথা ভাবলে আশ্চর্য হই যে, তা মানুষের মনে স্থায়ীভাবে একটা বিরক্তিরভাব রেখে যেতে পারেনা। অন্যত্র বিশ্বাসঘাতকরা কিন্তু এতটা সৌভাগ্যের দাবি করতে পারেনা।”(এঁরষঃু সবহ ড়ভ ওহফরধহ’ং চধৎঃরঃরড়হ, দেশ, কংগ্রেস শতবর্ষ সংখ্যা)

আজকের বামপন্থীদের মতো, দুই নেত্রীর ঐক্যের প্রস্তাবের মতো, কতটা আত্মমর্যাদাহীন হলে, অধঃপতিত হলে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের যৌথ গেরিলা বাহিনীর পোস্টারে শেখ মুজিবের ছবি নিজেদের নেতাদের মাথার উপরে বসিয়ে পোস্টার করা যায়। সেরকম ঘটনা অতীতেও ১৯৪২-৪৩ সালের এই গানে বোঝা যায়Ñ “তোরা আয়, আয়রে ছুটে আয়-/এ ভারতের হিন্দু-মুসলিম কে আছো কোথায়-/ স্বাধীন হাওয়া লাগলো পালে স্বরাজের নৌকায়-/ কংগ্রেস-লীগ এক হয়ে ভাই সেই তরণী বায়।” তার মানে নিজেরাই নিজেদের নাম নিচ্ছে না, নেতৃত্ব মেনে নিচ্ছে কংগ্রেস-লীগের। হায় কমিউনিস্ট পার্টি!

আবার পরবর্তীতে উভয় পার্টি কংগ্রেসে মূল্যায়ণ করা হলো, “ভারতবিভাগ বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও উভয় দেশের প্রতিক্রিয়াশীলদের ষড়যন্ত্রের ফল”-এখন প্রশ্ন হলো কমিউনিস্ট পার্টির নামে সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্রের রূপকার হয় যারা, তারা কারা? বদরুদ্দীন উমরের বক্তব্য থেকেও জানা যায়, ‘‘---দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, শ্রমিক আন্দোলন অথবা কৃষক আন্দোলন থেকে তার জন্ম হয় নি, হয়েছে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন থেকে।”

কমিউনিস্ট আন্দোলন একটি সচেতন বৈজ্ঞানিক প্রয়াস। কিন্তু আমরা দেখলাম উল্টো ঘটনা, ১৯৩৬ থেকে ১৯৪৮ খ্রিঃ পর্যন্ত তথাকথিত পার্টির সম্পাদক পার্টি হতে বহিষ্কারের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় কমিটির নিকট যোশী আবেদনে, জুন ১৯৫০-এ বলেন, “আমি একজন ছাত্র বুদ্ধিজীবী হইয়া ইতিহাসের আকষ্মিক ঘটনা চক্রে কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চতম নেতৃত্বের আসলে নিক্ষিপ্ত হইয়াছিলাম।” প্রশ্ন জাগে কমিউনিস্ট পার্টি কি ‘ডাস্টবিন’ যে ওখানে কাউকে নিক্ষিপ্ত হতে হয়? আবার বলা হয়, ১৯২০ সালে রাশিয়ার তাসখন্ডে বসে গঠন করেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি অন্যদিকে কানপুরের ১৯২৫ খ্রিঃ কে ধরা হয় প্রথম কংগ্রেস। এতসব অসংগতি কেন? মোট কথা হলো এরা কি কমিউনিস্ট? আগের অধ্যায়ে আলোচিত বৈশিষ্ট্যের সাথে এসব মেলে কি? (আগের অধ্যায়ে কমিউনিস্ট পার্টি কী, সদস্যভুক্তির নিয়ম, কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্য/কর্মসূচি, কেন- এগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে।) সবগুলোরই উত্তর হবে বিশাল একটি ‘না’।

পাকিস্তান আমল ঃ অতিসংক্ষেপে যা আমরা দেখি তা হলোঃ (ক) ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলনে গঠিত হলো পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি। গঠিত হলো ভারতের কলিকাতা শহরে (যদিও ৬ বছর পরে ১৯৫৪ সালে পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল সরকার কমিউনিস্ট কার্যকলাপ নিষিদ্ধ করেছিল) (খ) পাকিস্তানের পূর্ববঙ্গ প্রদেশের নামকরণ পূর্বপাকিস্তান করা হলো ভারতের এই সম্মেলনে বসেই। (যদিও সাংবিধানিকভাবে তখনও পূর্ববঙ্গ পূর্বপাকিস্তান হয়নি) অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি নামে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির শাখা গঠন করা হয়। তা আবার ‘পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির সাথে কাজ না করে কাজ করে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির অভ্যন্তরে। মজারবিষয় পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হলো ভারতের মাটিতে বসেই এবং কাজ করলো পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে বা কর্তৃত্বাধীনে নয়-কাজ করলো ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটির নেতৃত্বে ও কর্তৃত্বাধীনে। আর এদের এই পর্বের ‘কমিউনিস্ট’ কার্যকলাপের মধ্যে শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী অংশ তো দূরের কথা শ্রমিকশ্রেণীরই কারো কোনো স্থান ছিল না। এরা সকলেই ছিলেন মধ্যশ্রেণীর সেই ‘বাবু শ্রমিক’ বা ‘বাবু কৃষক’ অর্থাৎ বাবু কমিউনিস্ট। এদের কার্যকলাপও তার প্রমাণ দেয় ও সেটাই স্বাভাবিক। একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব কী জিনিস তাও তারা বুঝতেন না। এখনো যে বুঝেননা, তার প্রমাণ-পার্টির নামের আগে কোন কোন পার্টি পূর্ববাংলা/পূর্বপাকিস্তান বসিয়ে রেখেছেন। এরা কি সমগ্র পাকিস্তানের শ্রমিকশ্রেণীর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেন নি? এরা কি এটাই বুঝাতে চায় নি যে বাঙালি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, পাঠান, বেলুচি শ্রমিকশ্রেণী আলাদা আলাদাভাবে শোষিত হয় এবং শোষণের নীতি ও ধারাও আলাদা? আমরা কি কেউ কল্পনাও করতে পারি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিতরে দক্ষিণবঙ্গের বা উত্তরবঙ্গের কমিউনিস্ট পার্টি?

জ্ঞান চক্রবর্তীর ‘ঢাকা জেলার কমিউনিস্ট আন্দোলনের অতীত যুগ’ নুরুল ইসলামের ‘বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির ৪০ বছর,’ খোকা রায়ের ‘সংগ্রামের তিন দশক, বদরুদ্দীন উমরের “বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সমস্যা” অনিল মুখার্জির ‘স্বাধীন বাংলাদেশ সংগ্রামের পটভুমি’ বই থেকে জানা যায় কখনো কমিউনিস্টরা ‘আওয়ামীলীগে’ আশ্রয় নিয়েছেন আবার কখনো ‘ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’ গঠন করেছেন। দোহাই হিসেবে বলেছেন বেঁচে থাকার ‘তাগিদে’ সময়ের দাবীতে’। অথচ কমিউনিস্ট লীগের কাছে কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতিতে মার্কস ও এঙ্গেলস কর্তৃক বলা হয়েছে, “নিজেদের চূড়ান্ত বিজয় লাভের জন্য নিজেদেরই যথা সম্ভব চেষ্টা করতে হবে। তাদের নিজস্ব শ্রেণীস্বার্থ যে কী সে বিষয়ে আপনাদের চিন্তাকে স্বচ্ছ করে তুলে, স্বাধীন পার্টি হিসেবে যথাশীঘ্র সম্ভব নিজেদের স্থান গ্রহণ করে এবং গণতন্ত্রী পেটিবুর্জোয়াদের কপট বুলিতে মুহূর্তের জন্য বিভ্রান্ত না হয়ে প্রলেতারীয় পার্টির স্বাধীন সংগঠনের কাজ থেকে বিরত না হয়ে তাদের রণধ্বনি তুলতে হবে ঃ নিরন্তর বিপ্লব।”

যারা বুর্জোয় দলগুলোতে মিশে গিয়েছিলেন মার্কসবাদের বিপক্ষে গিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদে, তারা আজও বেঁচে আছেন তবে তেলাপোকা হয়ে, আগের মতোই।

ভাষার আন্দোলন ঃ ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়- একটি রাষ্ট্রের বিকাশের প্রশ্নে, সংহত হওয়ার প্রশ্নে ভাষা সমস্যার সমাধান খুবই জরুরি। তাই পাকিস্তান রাষ্ট্রের গোড়াতে ভাষাপ্রশ্ন সামনে চলে আসে, চলে আসে কর্র্তৃত্ত্ব, অধিকার ও হারানোর দিক। কোন ভাষাভাাষিরা কর্তৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করবে আর কারা তার শিকার হবে এটি সকল রাজনৈতিক শক্তির বিবেচনার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

পূর্ব বাংলার ‘কমিউনিস্টরা’ সে সময়কালে পার্টিগতভাবে (ব্যক্তিগতভাবে দুই/একজন অন্যান্য ভাষার স্বীকৃতির প্রস্তাব তুলেছিলেন) ভাষা আন্দোলনের সময় উর্দূভাষার, প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের, দাবির বিপরীতে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাভাষার দাবি তুলেছিলেন এবং সক্রিয়ভাবে আন্দোলনও করেছিলেন, আর এ কাজকে একটি বিরাট ‘বৈপ্লবিক’ কাজ বলে ফলাও করে বেড়াচ্ছেন। সে সময় পাকিস্তানে বহু ভাষা-ভাষির লোক ছিলেন, এর মধ্যে প্রধানত বাংলা, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচি ও পশতু ভাষা-ভাষীর লোক সংখ্যাই ছিল প্রায় ৯৭ শতাংশ। আর বাংলাই ছিল সমগ্রদেশের সংখ্যাগুরু জনসংখ্যার ভাষা। উর্দূ মুলত কারো ভাষা ছিল না-এ ভাষা শুধুমাত্র বাঙালিদের উপরই সে সময়ের প্রতিক্রিয়াশীল সরকার চাপিয়ে দেয় নি- তা চাপিয়েছিল পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচি ও পশতু ভাষাভাষিসহ সমগ্র দেশের অন্যান্য ভাষাভাষিদের উপরেও। তৎকালীন প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের ওটাই ছিল পাকিস্তানের সমস্ত শ্রমিকশ্রেণীসহ সমস্ত জনসাধারণকে বিভক্তির দিকে ঠেলে নিয়ে যাওয়ার প্রথম চাল। সে ক্ষেত্রে উর্দূর বিপরীতে শুধুমাত্র বাংলা বা উর্দূর সঙ্গে বাংলার দাবির প্রশ্নটা কি ‘কমিউনিস্টদের’ উত্থাপন যুক্তিসংগত ছিল? অন্যান্য ভাষা-ভাষীদের উপর উর্দূর সঙ্গে বাংলা চাপিয়ে দেওয়ার যৌক্তিকতা ‘কমিউনিস্টরা’ কোথা থেকে আমদানি করলেন? এভাবে একটি রাষ্ট্রের মধ্যে শ্রমিকশ্রেণী-তথা নিপীড়িত জনগণের সংহতি বিনষ্ট করা হয়নি? কমিউনিস্টদের ওই জাত্যাভিমানী আন্দোলন কি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে ভাগ কর ও শাসন-শোষণের ক্ষেত্রকে প্রস্তুতে সহায়তা করেনি? কমিউনিস্টদের পার্টিগতভাবে কি উচিত ছিল না- বাংলা ও উর্দূর সঙ্গে পাঞ্জাবি, পশতু, সিন্ধি ও বেলুচি ভাষার দাবি তোলা? আমরা আবারো লেনিনে ফিরে যাই। দেখি তিনি তাঁর ‘জাতীয় সমস্যার সমালোচনামুলক মন্তব্য’ প্রবন্ধে বলেছেন, “সর্ববিধ বিশেষ সুবিধা যদি লোপ পায়, একটি ভাষাকে জোর করে চাপানো যদি বন্ধ হয়, তাহলে স্লাভ জাতিরা সকলেই সহজে ও সত্বর পরস্পরকে বুঝতে শুরু করবে, এবং সাধারণ লোকসভায় বিভিন্ন ভাষায় বক্তৃতা হচ্ছে এই ‘ভয়ঙ্কর’ ব্যাপারে মোটেই ভয় পাবে না। এবং নির্দিষ্ট দেশটির অর্থনৈতিক আদান-প্রদানের স্বার্থেই আপনা থেকেই নির্ধারিত হয়ে যাবে কোন বিশেষ ভাষাটি বাণিজ্যিক সংশ্রবের দিক থেকে বেশির ভাগের পক্ষে সুবিধাজনক। এ নির্ধারণ হবে অনেক বেশি সুদৃঢ় এই কারণে যে বিভিন্ন জাতির লোকেরা সে ভাষা গ্রহণ করছে স্বেচ্ছায়; এবং গণতন্ত্র যতই সুসঙ্গত হবে, তার ফলে যতই দ্রুত বিকাশ পাবে পুঁজিবাদ, ততই দ্রুত ও ব্যাপক হবে সে নির্ধারণ।

---সমস্ত উদারনীতিক-বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদই এই রকম-এবং সে শুধু বড়ো রুশীয় নয়-পোলীয়, ইহুদি, ইউক্রেনীয়, জর্জীয় প্রভৃতি সবই। কি অস্ট্রিয়ায় কি রাশিয়ায়, সমস্ত জাতির বুর্জোয়ারাই, ‘জাতীয় সংস্কৃতির’ ধ্বনি তুলে আসলে অনুসরণ করে শ্রমিকদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, গণতন্ত্রের দুর্বলীকরণ এবং জনসাধারণের অধিকার ও জনসাধারণের স্বাধীনতা বেঁচে দেবার জন্যে সামন্ত জমিদারদের সঙ্গে দরাদরির নীতি। ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ নয়, গণতন্ত্র এবং বিশ্বশ্রমিক আন্দোলনের আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি-এই হল শ্রমিক গণতন্ত্রের ধ্বনি। নানা প্রকারের ‘সদর্থক’ জাতীয় কর্মসূচি হাজির করে বুর্জোয়ারা যতই লোক ঠকাক, শ্রেণী-সচেতন শ্রমিক জবাব দেবেঃ জাতীয় সমস্যার সমাধান শুধু একটিই (পুঁজিবাদের দুনিয়ায়-মুনাফা, কামড়াকামড়ি ও শোষণের দুনিয়ায় এ সমস্যার আদৌ যতটা সমাধান সম্ভব) এবং সে সমাধান হল-সুসংহত গণতন্ত্র।
প্রমাণঃ প্রাচীন সংস্কৃতিসম্পন্ন একটি দেশ, পশ্চিম ইউরোপের সুইজারল্যান্ড (ক্ষুদ্র সুইজারাল্যান্ডে, একটি নয়, তিন-তিনটি সর্বরাষ্ট্রীয় ভাষা বর্তমানঃ জার্মান, ফরাসী ও ইতালীয়, জনসংখ্যার শতকরা ৭০ জন জার্মান, শতকরা ২২ জন ফরাসী এবং শতকরা ৭ জন ইতালীয়) এবং তরুণ সংস্কৃতিসম্পন্ন একটি দেশ, পূর্ব ইউরোপের ফিনল্যান্ড। ( পাশের ছোট্ট দেশ সিঙ্গাপুরেও তিনটি অফিসিয়াল ভাষা)

শ্রমিক গণতন্ত্রের জাতীয় কর্মসূচি হল এইঃ কোনো একটি জাতি বা কোনো একটি ভাষা সর্ম্পকে আদৌ কোনো বিশেষ সুবিধা চলবে না; জাতিসমূহের রাজনৈতিক আত্মনিয়ন্ত্রণ অর্থাৎ তাদের রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্রের যে প্রশ্ন, তার সমাধান করতে হবে পরিপূর্ণ মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে; সর্বরাষ্ট্রীয় একটি আইন পাস করতে হবে, যাতে একটি মাত্র জাতির বিশেষ সুবিধাধীনে প্রচলিত যে ব্যবস্থায় জাতিসমূহের সমানাধিকার অথবা জাতীয় সংখ্যালঘুর অধিকার লংঘিত হয়, তেমন যে কোনো ব্যবস্থাই (জেমস্তভো, শহর, গ্রাম সমাজ ইত্যাদি পরিষদ সংক্রান্ত) বেআইনী ও নাকচ বলে ঘোষিত হবে এবং সংবিধান বহির্ভূত বলে সেরূপ ব্যবস্থার নাকচ দাবি এবং কেউ সে ব্যবস্থা চালুু করতে গেলে তাদের ফৌজদারী সোপর্দ করার অধিকার থাকবে রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের।

ভাষা ইত্যাদি প্রশ্নে বিভিন্ন বুর্জোয়া পার্টিগুলির জাতিগত খেয়োখেয়ির বিপরীতে শ্রমিক গণতন্ত্র দাবি তোলেঃ সর্বপ্রকার বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের বিপরীতে চাই ট্রেড ইউনিয়ন, সমবায় সমিতি, খরিদ্দার সমবায়, শিক্ষা প্রভৃতি শ্রমিককের সমস্ত সংগঠনে সমস্ত জাতিসত্তার শ্রমিকদের শর্তহীন ঐক্য ও পরিপূর্ণ মিলন। কেবল এই রূপ ঐক্য ও মিলনেই গণতন্ত্রকে রক্ষা করা সম্ভব, শ্রমিকস্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব পুঁজির বিরুদ্ধে-এই পুঁজি ইতোমধ্যেই হয়েছে ও ক্রমেই বেশি করে হয়ে উঠছে আন্তর্জাাতিক, রক্ষা করা সম্ভব নতুন জীবন ধারায় মানবজাতির বিকাশের স্বার্থকে, কোনো সুবিধা এবং কোন শোষণেরই স্থান সেখানে থাকবে না।”

অথচ আমাদের কমিউনিস্টরা শুধুমাত্র বাংলার দাবিই উত্থাপন করলেন এবং এখন পর্যন্ত ওই অবস্থান নিয়ে বগল বাজাচ্ছেন। এগুলো তাহলে কোন কমিউনিস্ট পার্টি? কোন দেবতাকে জানাই নমস্কার? / মাঠ হতে ধান নিয়েছিল যারা আর / মুকুটে যাদের অনেক ধানের রঙ / সন্ধ্যার গায়ে তাদের ছায়ার সারÑ কস্মৈ দেবায়, সঞ্জয় ভট্টাচার্য

উত্তাল ষাটের দশক ও ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধ ঃ ‘পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি’ প্রাথমিকভাবে আওয়ামী মুসলিম লীগে অনুপ্রবেশ করে এবং একটি অংশ পরে ‘গণতন্ত্রী দল’ গঠন করে- উভয় অংশই আবার একযোগে মৌলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগদান করে। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ষাটের দশকে ভেঙে গেলে ‘পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি’র নতুন সংগঠন হয় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মস্কোপন্থী) অপরঅংশ পিকিং (পন্থী) এবং এই পার্টির মধ্যে থেকেই আওয়ামীলীগের সঙ্গে একযোগে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের জন্য লড়াই করেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামীলীগের আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের দাবি আর কমিউনিস্টদের স্বায়ত্বশাসনের দাবি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে কি করে এক এবং অভিন্ন কর্মসূচিতে পরিণত হলো-‘কমিউনিস্ট’রা কোন তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে একটিমাত্র অঞ্চলের জন্য স্বায়ত্বশাসনের দাবি করলেন? পাঁচটি প্রদেশ ও দেশীয় রাজ্য- উপজাতীয় এলাকাগুলো কেন তারা বাদ দিলেন? অপর দিকে তথাকথিত পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি (এম. এল) ও ১৯৬৮ সালে আবার দুই ভাগে বিভক্ত হয় এবং ‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (মা-লে)’ নামে একটি নতুন ‘পার্টি’ আত্মপ্রকাশ করে। ‘পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি’ হক-তোয়াহার নেতৃত্বে পাকিস্তানব্যাপাী বিপ্লবের কথা বললেও শুধুমাত্র জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলা কায়েমের কথা বলে এবং ‘পূর্ববাংলা আধা-ঔপনিবেশিক আধা-সামন্তবাদী’ থিসিস (যার ভূমিকা লিখেছেন বদরুদ্দীন উমর) উপস্থাপন করে।

আর ওই তথাকথিত পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (মা-লে) দেবেন-বাশার-আলাউদ্দিন-মতিনের নেতৃত্বে কেবলমাত্র পূর্ববাংলা ভিত্তিক বিপ্লবের কর্মসূচি গ্রহণ করে ‘জনগণের’ গণতান্ত্রিক স্বাধীন সার্বভৌম পূর্ব বাংলা গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়। কাজী জাফর আহম্মেদ এবং রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে ‘কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটি’ নামে একটি সক্রিয় গ্রুপ ছিল, যারা-----পূর্ব বাংলায় জাতিগত নিপীড়ন রয়েছে বলে স্বাধীনতার শ্লোগানও তুলতেন। ১৯৬৯ সালে আর একটি ক্ষুদ্র ও বলিষ্ঠ গ্রুপের বক্তব্য বামপন্থী মহলে বিশেষ আলোড়ন তোলে। এই গ্রুপের নেতা ছিলেন সিরাজ সিকদার। ১৯৬৮ সালে ৮ সেপ্টেম্বর তারা ‘পূর্ব-বাংলার শ্রমিক আন্দোলন’ নামে একটি বিপ্লবী গ্রুপ গঠন করেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী পূর্ব-বাংলা পাকিস্তানের উপনিবেশ এবং উপনিবেশিক শক্তির সাথে পূর্ব বাংলার জনগণের দ্বন্দ্বটাই প্রধান। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বরিশালের ‘পেয়ারা বাগান’ নামক স্থানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্যদিয়ে শ্রমিক আন্দোলন ‘পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি’ গঠন করেন।

তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি সদস্য সচিব ও অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ ১৪ ডিসেম্বর ২০১১ খ্রিঃ তারিখের ‘সাপ্তাহিক বুধবারে’ ‘বাংলাদেশে ভারত- ১’ শিরোনাম প্রবন্ধে লিখেছেন, “১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহ দমণের মধ্য দিয়ে সমস্ত ভারত ব্রিটিশের আনুষ্ঠানিক উপনিবেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়।”
মার্কস এঙ্গেলস বিভিন্ন রাষ্ট্রকে উপনিবেশিক, পরাধীন, আধা-উপনিবেশিক, স্বাধীন, সাম্্রাজ্যবাদী বিভিন্ন ভাগে ভাগ করেছেন। তারপরও আমাদের কথিত কমিউনিস্টরা উপনিবেশ ও পরাধীন ইত্যাদি শব্দগুলো এলোপাথারি ব্যবহার করেছেন, এখনও করছেন বেহুঁশ হয়ে। সা¤্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের উপনিবেশ থাকতে পারে, কিন্তু পাকিস্তান নিজেই অনুন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। তার কিভাবে উপনিবেশ থাকে? আর উপনিবেশের জনগণের কর্তব্য হচ্ছে স্বাধীনতার জন্য কর্মসূচি দেওয়া । আমরা জানি, আমেরিকার ১৩টি কলোনি বা উপনিবেশ একত্রে ফিলাডেলফিয়ায় বসে ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতা ঘোষণা ক’রে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু আমাদের এখানে দেখতে পেয়েছি কথিত ‘ঔপনিবেশিক’ শাসন কবলিত অবস্থায় ব্রিটিশ আমলে নেতারা নির্বাচন করেছেন। এবং পরে পাকিস্তান আমলে ’৫৪ সালে নির্বাচনে জয়ী হয়ে মন্ত্রীসভা গঠন এবং ’৫৬ সালে কথিত ‘ঔপনিবেশিক শাসকদের’ সাথে একত্রেবসে পশ্চিমাঞ্চলের চারটি প্রদেশের পক্ষে ৪০ জন এবং পুর্ব বাংলার পক্ষে ৪০ জন সদস্যের সমন্বয়ে সংবিধান রচনা করছেন। তাহলে ভাষা আন্দোলন,’৫৪ এর যুক্ত নির্বাচন,’৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬ দফার আন্দোলন,’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান,ও ’৭০ এর নির্বাচন-এগুলোতে অংশগ্রহণের মানেটাতাহলে কী? এবং কথিত বিপ্লবীরা স্বাধীনতার কর্মসূচি না দিয়ে অন্য কিছু হাজির করলেন কেন? জনগণইবা পাকিস্তানের পক্ষে রায় দিলেন কেন ’৪৬ তে। তাহলে ওইসব নেতারা আফগানিস্তানের কারজাই ও আজকের ইরাকের শাসনতন্ত্র প্রণেতাদের মত একই কাতারে সামিল হয়ে যান না? দেখা যাচ্ছে, ‘ঔপনিবেশিক’ তত্ত্বায়ণের ফলে জাতীয় নেতারা জাতীয় বেঈমান-বিশ্বাসঘাতকে পরিণত হচ্ছেন। অর্থাৎ ইতিহাসের ভুল বিচারে ব্যক্তির মুল্যায়ণে ভুল হয়।

বাংলা একাডেমীর অভিধানে উপনিবেশ শব্দের অর্থ দেওয়া আছে, জীবিকা নির্বাহের জন্য বা স্থায়ীভাবে বাস করার জন্য দলবদ্ধভাবে বিদেশে যে বসতি স্থাপন করা হয়। আর পরাধীন শব্দের অর্থ দেওয়া আছে, অন্যের অধীন বা বশীভূত; পরবশ। তাছাড়া উপনিবেশিত রাষ্ট্রের মধ্যে যে ঘটনাটা ঘটে তাহলো সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র স্থানীয় জনগণকে ব্যাপক গণহত্যাসহ নানান ঘটনার মধ্যদিয়ে সংখ্যালঘুতে পরিণত করে। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, ইউরোপীয়রা আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় স্থানীয় অধিবাসীদের ব্যাপক গণহত্যার মাধ্যমে তাদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করেছে। উপনিবেশে স্থানীয় জনগণকে সা¤্রাজ্যবাদীরা শাসনকাজের অংশীদার করে না। আজ তাই আমেরিকান মানে যেমন জর্জ ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিংকন, ওবামাকে বুঝি, তেমনি অস্ট্রেলিয়ান মানে ক্রিকেটার রিকি পন্টিং, প্রধানমন্ত্রী গিলার্ড ও উইকিলিকস এর জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জকে বুঝি।
আদিবাসী বিষয়টা নিয়ে গোল বেঁধে যাওয়ার মূল কারণও এই উপনিবেশ ব্যাপারটাই। রেড ইন্ডিয়ানদের, মাউরিদের বেলায় যা হয়েছে, ভারত ভূখন্ডে কারা কাদের করেছে? বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের ভাষায়, “সাদা মানুষেরা পা রেখেছে উপনিবেশে, এবং বাদামি/কালো স্থানীয়রা কেমন যেন মিলিয়ে গেছে মহাশূণ্যে।” আমরা, ভারতীয়রা কি মিলিয়ে গিয়েছি?

১৮৮২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর তারিখে কার্ল কাউটস্কিকে লেখা চিঠিতে এঙ্গেলস বলেছেন, “আমার ধারণা, সঠিক উপনিবেশগুলি-অর্থাৎ যেসব দেশে দখল নিয়ে বসেছে ইউরোপীয় অধিবাসীরা-কানাডা, কেপ, অস্ট্রেলিয়া-এসবই স্বাধীন হয়ে যাবে ;অন্যদিকে, দেশীয় জনসংখ্যাধ্যুষিত যে দেশগুলিকে মাত্র পরাধীন করা হয়েছে-ভারত, আলজেরিয়া, ওলন্দাজ, পর্তুগাল ও স্পেন..।” অর্থাৎ তিনি সঠিক উপনিবেশ বলতে এই বৈশিষ্ট্যের দেশগুলোকেই বুঝিয়েছেন। ভারতবর্ষে বা বাংলাদেশে কারা, কাদের উচ্ছেদ করে নিজস্ব ভূখন্ড দাবি করেছে। আমরা জানি কেউ করে নি-ইংরেজরাও নয়। আর পাকিস্তানের নির্বাচনগুলি প্রমাণ বর্তমানের বাংলাদেশ পাকিস্তানের উপনিবেশ ছিল না।

১৭৫৭ সালে ইংরেজরা বাংলা দখল করলেও নবাব ছিল কে? কুখ্যাত মীরজাফরইতো? উপনিবেশই যদি হবে- তাহেল নিজেরা দখল করে অন্যকে নবাব বানাবে কেন? ১৮৫৮ সালের পুর্বে ভারতবর্ষে প্রথমে ছিল কোম্পানির শাসন পরবর্তীতে “১৮৫৮, ২ আগস্ট লর্ড স্ট্যানলির ভারত বিল পাশ, এতে করে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানীর অবসান [ঘটল]। ‘মহারাণী’ ভিক্টোরিয়ার সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত হল ভারত!” ১৮৫৮ সালের পরেও তো অনেক স্বাধীন রাজা ছিল। প্রাতিষ্ঠানিক উপনিবেশ যদি সম্পন্নই হবে, তাহলে এতগুলো স্বাধীন রাজ্য থাকে কি করে? তার ফলাফল আমরা দেখি, ভারত ভাগের সময়। বলা হয় স্বাধীন রাজ্যগুলো সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, ভারত না পাকিস্তানের অংশ হবে।

কার্ল মার্কস পুঁজির গ্রন্থের প্রথম খন্ডের ২য় অংশের অধ্যায় ৩৩ এ “উপনিবেশ স্থাপনের আধুনিক তত্ত্ব” এর আলোচনায় যেমন নানান উপনিবেশের নাম ব্যবহার করেছেন তেমনি উপনিবেশের ভেতরের গূঢ় উৎপাদন পদ্ধতিও আলোচনায় এনেছেন। এই গূঢ় ব্যাপারটি না বুঝলে অথবা পাঠ ব্যতিরেকে উপনিবেশ সংক্রান্ত যাবতীয় আলোচনা অপূর্ণ থেকে যেতে বাধ্য। তিনি এর তত্ব আলোচনার শুরুতে টিকা আকারে এই কথাগুলো স্বীকার করে নিয়েছেনÑ “এখনে আমরা সেইসব প্রকৃত উপনিবেশ, আদিম অব্যবহৃত জায়গাগুলির কথা বলছি, যেখানে মুক্ত দেশান্তরীরা উপনিবেশ স্থাপন করেছিল। যুক্তরাষ্ট্র এখনও পর্যন্ত অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বলতে গেলে, ইউরোপের একটি উপনিবেশমাত্র। তাছাড়া, সেইসব পুরনো বাগিচাগুলিও এই বর্গের অন্তর্ভুক্ত। যেখানে ক্রীতদাসপ্রথার বিলোপ আগেকার অবস্থার পবির্তন ঘটিয়েছে সম্পূর্ণরূপে। মার্কসের এই স্বীকারোক্তি বা টীকা অনুযায়ী ‘অর্থনৈতিক উপনিবেশ’ বলেও এক ধরনের উপনিবেশ আমরা দেখতে পাই। আসুন আমরা অর্থনৈতিক উপনিবেশের উৎপাদন সম্পর্ক কেমন তা একটু পর্যালোচনা করি। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার প্রায় শতবর্ষ পরেও সেখানে ইউরোপের উপনিবেশ জারী আছে কোন সম্পর্কের মধ্য দিয়ে তা বিবেচনা করি। এবং তার সাথে তুলনা করে দেখতে পাবো, অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ যে বললেন তাতে ‘প্রাতিষ্ঠানিক উপনিবেশ’ সম্পন্ন হয়, তা কতটা সঠিক অথবা ভুল। মার্কস তাঁর আধুনিক তত্বে বলছেন, “শুধু তাই নয়, পুঁজির গৌরব বৃদ্ধি করার জন্য খেটে খাওয়া মানুষের আত্ম দখলচ্যুতির তাড়না এতই স্বল্প যে, ওয়েকফিন্ডের নিজের মতেই, ক্রীতদাসপ্রথাই ঔপনিবেশিক সম্পদের একমাত্র স্বাভাবিক ভিত্তি।”

তিনি বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বলেছেন পুঁজিবাদী দুনিয়ায় আর উপনিবেশের দুনিয়ায় উৎপাদন-সম্পর্কের মৌলিক তফাৎ কিÑ “পুঁজিবাদী উৎপাদনের বিরাট সৌন্দর্য এইখানে যে- তা শুধু যে মজুরিশ্রমিককে মজুরি-শ্রমিক হিসেবেই পুনরুৎপাদন করে চলে তাই নয়, পরন্তু পুঁজির সঞ্চায়নের সমানুপাতে মজুরি-শ্রমিকের এক আপেক্ষিক উদ্বৃত্ত-জনসংখ্যাও সর্বদা সৃষ্টি করে। এইভাবে শ্রমের যোগান ও চাহিদার নিয়মটিকে ঠিকপথে রাখা হয়, মজুরির ওঠানামাকে সেই সীমানার মধ্যে আবদ্ধ রাখা হয় যা পুঁজিবাদী শোষণের পক্ষে সন্তোষজনক, এবং সর্বশেষে সেই অপরিহার্য অঙ্গঁ, অর্থাৎ পুঁজিপতির উপরে শ্রমিকের সামাজিক নির্ভরশীলতা বজায় রাখা হয়; এ হল অধীনতার এক ভ্রমাতীত সম্পর্ক যাকে আত্মতৃপ্ত অর্থশাস্ত্রবিদ তার নিজের দেশে, মাতৃভূমিতে ক্রেতা ও বিক্রেতার মধ্যে, পুঁজি-রূপী পণ্যের মালিক ও শ্রম-রূপী পণ্যের মালিক, এই দুই পণ্যেরই সমানভাবে স্বাধীন মালিকের মধ্যে সম্পাদিত এক স্বাধীন চুক্তিতে পর্যবসিত করতে পারে জাদুকরী কায়দায়। কিন্তু উপনিবেশগুলিতে এই চমৎকার কল্পনাটি একেবারেই ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। এখানে প্রায় জনসংখ্যা মৃাতৃভূমির তুলনায় অনেক তাড়াতাড়ি বেড়ে চলে। কারণ বহু শ্রমিক পূর্ণবয়স্ক হয়েই এই ভূভাগে এসে পৌঁছায়, অথচ তা সত্বেও শ্রম-বাজার সর্বদাই অপরিপূর্ণ থাকে। শ্রমের যোগান ও চাহিদার নিয়মটি নস্যাৎ হয়ে যায়। একদিকে পুরনো দুনিয়ায় শোষণ ‘মিতাচারের’ তৃষ্ণায় অনর্গল পুঁজি যুগিয়ে চলে; অন্যদিকে, মজুরি-শ্রমিক হিসেবে মজুরি-শ্রমিকের নিয়মিত পুনরুৎপাদন সেইসব বাধার সম্মুখীন হয় যেগুলি সর্বাপেক্ষা অনমনীয় এবং অংশত অপরাজেয়। পুঁজির সঞ্চয়নের অনুপাতে অতিরিক্ত সংখ্যায় যে মজুরি-শ্রমিকের উৎপাদন হয়, তার কী গতি হয়? আজকের মজুরি-শ্রমিক আগামীকাল একজন স্বাধীন কৃষক অথবা কারিগর হয়ে নিজের জন্যই কাজ করে। শ্রম-বাজার থেকে সে উধাও হয়ে যায় বটে, কিন্তু কর্মভবনে গিয়ে আশ্রয় নেয় না। মজুরি-শ্রমিকের এই অবিরত স্বাধীন উৎপাদকে রূপান্তর, যে উৎপাদকের পুঁজির জন্য কাজ করার পরিবর্তে নিজেদের জন্যই কাজ করে এবং পুঁজিপতি ভদ্রশ্রেণীকে সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে নিজেদেরই সমৃদ্ধশালী করে, এই ঘটনাটি পাল্টাভাবে শ্রম-বাজারের অবস্থার ওপর সম্পূর্ণ বিকৃত প্রতিক্রিয়া ঘটায়। মজুরি-শ্রমিকের শোষণের মাত্রাই যে কেবল অশোভনভাবে নিচু থেকে যায় তাই নয়। তদুপরি মজুরি-শ্রমিক অধীনতার সম্পর্কের সঙ্গে সঙ্গে মিতাচারী পুঁজিপতির উপর নির্ভর করে থাকার মনোভাবও হারিয়ে ফেলে।”

এখন আমরা আমাদের ভারতবর্ষের ইতিহাসের দিকে নজর দিই। আমরা এখানে কী দেখতে পাই? নিশ্চিতভাবে পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্কের বিরাট সৌন্দর্যই দেখতে পাই। তাই ভারতবর্ষ সম্পর্কে অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদের ‘প্রাতিষ্ঠানিক উপনিবেশ’ কথাটা এখানে খাটে না। বরং আমরা দেখি, মার্কসের ‘পুঁজিবাদী উৎপাদন-প্রণালির ভিত্তি হলো জনসাধারণকে জমি থেকে দখলচ্যুত করা’ ঘটনাটি। আর উপনিবেশ স্থাপনের একটি উপাদান হতে হলে জমি পতিত নয়, শুধু এমনটা হলেই চলবে না, তা সার্বজনীন সম্পত্তিও হওয়া চাই যাতে তাকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিবর্তিত করা যায়। আমরা ভারতবর্ষে দেখলাম, ইংরেজরা আসার পর জনগণ জমি থেকেই দখলচ্যুত হতে থাকলো আরো বেশি মাত্রায়ই। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী ব্যবস্থার ফলাফলে আমরা যা দেখি, ও তাছাড়া ১৮৮৫ সালে প্রজাসত্ব আইনে জমি কেনা-বেচার আইন পাশ না হলে জমি থেকে দখলচ্যুতির ঘটনাটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। (অথচ ইংরেজরা উপনিবেশগুলোতে উল্টো ঘটনা ঘটিয়েছে। সেখানে তার জমিকে প্রথমে সার্বজনীন সম্পত্তিতে পরিণত করেছে, গোষ্ঠির হাত থেকে নিয়ে, তারপর জমি একটা দাম বেঁধে দিয়ে বসতি স্থাপনকারীদের নিকট বিক্রি করেছে, যার লোভে ইউরোপ থেকে দেশান্তরীরা ছুটে গেছে তারপর অব্যাহত জমির একটা কৃত্রিম দাম ধার্য করা হয়, যাতে ইউরোপ থেকে শ্রমিক গিয়ে মজুরি দিয়ে ওই জমি কেনার সামর্থ অর্জন করার আশা করে এবং সরকার এই জমি বিক্রি মারফত টাকা দিয়ে ইউরোপ থেকে সর্বহারাদের (প্রলেতারিয়েত নয়- আবির হাসান) আমদানি বাবদ কাজে লাগায়। এইভাবে মজুরি-শ্রমের বাজার মালিকদের সাথে পরিপূর্ণ রাখা হয়। মার্কসের ভাষায় ‘প্রণালীবদ্ধ উপনিবেশ স্থাপনের এইটাই হল গুহ্য তত্ত্ব।’

শ্রদ্ধেয় লড়াকু অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদের উপনিবেশ সংক্রান্ত এই ধারণাটি তাই নতুন করে বিবেচনা করবেন বলে মনে করছি। আমাদের দেশের তরুণ বুদ্ধিজীবীরাও উপনিবেশের এই উৎপাদন সম্পর্ক না বোঝার ফলে ফ্রাঞ্জ ফানোর ‘জগতের লাঞ্চিত ভাগ্যাহত’ এর কৃষক ও শ্রমিকের সাথে ভারতবর্ষের কৃষক ও শ্রমিককে মিলিয়ে নিয়েছেন। তাঁর সিদ্ধান্তগুলোকে এই রাষ্ট্রের প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন। কেউ কেউ বর্তমান লেখককে বলেছেÑ ‘জগতের লাঞ্চিত ভাগ্যহত’ হলো আমাদের রাষ্ট্রের ইশতেহার। ফানো ওই গ্রন্থের ‘সহিংসতা প্রসঙ্গে’ প্রবন্ধে লিখেছেনÑ “এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে, ঔপনিবেশিক দেশে কৃষকরাই হচ্ছে একমাত্র বিপ্লবী শক্তি, কারণ, তাদের হারাবার কিছুই নেই বরং পাবার আছে পুরো বিশ্ব।” Ñএখন প্রশ্ন হচ্ছে আমাদের মতো অনুন্নত পুঁজিবাদী দেশে কৃষক বলতে আমরা কী বুঝি আর ফার্মের মালিক যে ফার্মার এখানে এই ফার্মারদের কী হারাবার নেই? এখানে কী কৃষক লেনিনের ভাষায়, অন্যতর ধরনের, অন্যতর স্তরের বুর্জোয়া নয়? কৃষক কী ক্ষেত মজুরের শ্রম শোষণ করে না? যদি সবগুলোর উত্তর হয়- হ্যাঁ বাচক, তাহলে এই কৃষক কী ফানোর কৃষকের সাথে মেলে? নিশ্চয় মেলে না- কিন্তু মেলাবেন তিনি মেলাবেন/ ঝোড়ো হাওয়া আর পোড়ো বাড়িটার ভাঙা দরোজাটা মেলাবেন- আমাদের বুদ্ধিজীবীরা মিলিয়েই যাচ্ছেন। এরা কোনো একটা বিষয়ে স্বচ্ছতা সৃষ্টির পরিবর্তে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেই যাচ্ছেন। উপনিবেশ সম্পর্কেও এই বিভ্রান্তিই সৃষ্টি হয়েছে, উৎপাদন সম্পর্কের জায়গা থেকে বোঝাপড়া সম্পন্ন না হওয়ার ফলেই এই আধা-খেচরা অবস্থা।

ফলে ইংরেজ আমলে, পাকিস্তান আমলে যেমন রণনীতিতে সমস্যা তৈরি হয়েছিল, ঠিক বর্তমানেও সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটে নাই। পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক না বোঝাপড়ার ফলে, নানান তাত্ত্বিক সম্পর্কজাল পেরিয়ে ‘ক্রসেড-জেহাদ ও শ্রেণী সংগ্রাম’ একাকার হয়ে যায়। পুঁজিবাদের সমর্থক তালেবানরা হয়ে যান সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তি। ইতিহাসের গতি না বোঝাপড়ার ফলে ফরহাদ মজহারদের কাছে জামায়াতুল মুজাহিদীনরা হয়ে যান মুক্তিযোদ্ধা, যেমন রুশ বিপ্লব পরবর্তীকালে কালীপূজক সূর্যসেন-প্রীতিলতারা কথিত কমিউনিস্ট-সমাজতন্ত্রী-সর্বহারাদের কাছে হয়ে যান বিপ্লবী। বিষয়টি অর্থাৎ তাত্ত্বিক সম্পর্কজালটি একটু খোলাসা করা যাক। ক্রসেড-জেহাদ ও শ্রেণীসংগ্রাম কেন বুদ্ধিজীবীদের চোখে এক হয়ে ধরা দিল, এটি আগে ব্যাখ্যা করা যাক। ক্রুসেড ও জেহাদ শব্দ দু’টি ধর্মের মানুষেরা নিজেদের বলে দাবি করে। মার্কসীয় বিশ্লেষণে আমরা জানি, একমাত্র শ্রমিকশ্রেণীই গণতান্ত্রিক লড়াইকে শেষ পর্যন্ত চালিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম, সম্পন্ন করতে সক্ষম। কিন্তু ইউরোপে শ্রমিকশ্রেণীর বদলে বুর্জোয়াদের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক বিপ্লব হওয়ায় আজ পর্যন্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জের রয়ে গেছে, প্রেসিডেন্ট বুশসহ হোয়াইট হাউসের অধিবাসীদের মধ্যে তাই, ধর্মের ভূত রয়ে গেছে। আর আমাদের দেশের মতো অনুন্নত পুঁজিবাদী দেশের বেলায়ও গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন না হওয়ায় ধর্ম এখনো চিন্তা জগতে বাস্তব শর্ত হিসেবে হাজির আছে, তাই বুদ্ধিজীবীরা ক্রুসেড-জেহাদ ও শ্রেণীসংগ্রাম একাকার করে ফেলেন।

অন্যদিকে ইতিহাসের গতির দিকটি বোঝাপড়ার ব্যাপারটি হলো এরকম যে, একটি সমাজ যখন পুঁজিবাদী উৎপাদন সম্পর্ক বিকাশের স্তরে থাকে না, তখন শোষিত শ্রেণীগুলি শোষকশ্রেণীর বিরুদ্ধে যে লড়াই চালায় তা ধর্মের আবরণেই চালায়। ইউরোপে প্রটেস্ট্যান্টদের লড়াই, কৃষক যুদ্ধগুলো সেই উদাহরণ আর ভারতে তিতুমীর, হাজি শরীয়তুল্লাহসহ ফকীর সন্নাসীদের বিদ্রোহগুলো। কিন্তু উৎপাদন সম্পর্ক বিকাশের পরে পৃথিবীব্যাপী যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকাশ, তথ্যের ব্যাপক প্রবাহ, নতুন বিপ্লবীশ্রেণীর আবির্ভাব, দুনিয়াকে বদলানের বিজ্ঞান মার্কসবাদ হাজির হওয়ার পর এই পৃথিবী নিশ্চয়ই আর আগের মতো নেই। রেলগাড়ি এসে ঠেলাগাড়িকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেবেই। তবুও কেউ যদি ঠেলাগাড়িকে আঁকড়ে থাকতে চায়, সময় তাদের প্রতিক্রিয়াশীল বলে চিহ্নিত করে। জামায়াতুল মুজাহিদীন নিছক কোনো সন্ত্রাসী বাহিনী নয় ঠিক আছে, কিন্তু ইতিহাসের গতিকে পেছনে নিয়ে যাবার জন্য তাদের সংগ্রাম, প্রতি যুগের মুক্তিযোদ্ধারা যেমন ইতিহাসকে মুক্তি দেয়ার জন্য বা সময়ের গতির সামনের বাধা অপসারন করার সংগ্রাম করেন। কিন্তু জেএমবিদের লড়াই উল্টো পথে। তাই জেএমবিদের আর মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাস মুখোমুখি দাঁড় করায়, কাতারবন্দী করে না।

ঠিক তেমনি দুনিয়া কাঁপানো রুশ বিপ্লবের পরে ইউরোপ জুড়ে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরেও, ডিরোজিও-বিদ্যাসাগরদের চিন্তার সংগ্রামের পরেও, শ্রমিকশ্রেণী লড়াইয়ের মঞ্চে আবির্ভাবের পরেও যখন সূর্যসেন-প্রীতিলতারা কালীর নামে লড়াই চালায়, তখন দুঃখজনক সিদ্ধান্ত টানা ছাড়া পথ থাকে না।

Ñএই হচ্ছে উৎপাদন সম্পর্ক, ইতিহাসের গতিকে না বোঝার ফল। কিন্তু তাবৎ বুদ্ধিজীবীরা ইতিহাসের এই গতিমুখ না বুঝে বাতচিৎ চালিয়েই যাচ্ছেন, শেষমেষ উপনিবেশ সম্পর্কীত ধারণা না বোঝার ফল। কীভাবে উপনিবেশ সম্পর্কিত ধারণাটির সাথে বুদ্ধিজীবীদের এই বিভ্রান্তি জড়িত, আরেকটু ব্যাখ্যা করেই ইতি টানবো।
আমদের বুদ্ধিজীবীরা যেহেতু ভারতবর্ষকে উপনিবেশ ধরেই নিয়েছেন, যেহেতু ফ্রাঞ্জ ফানোর মতে, কৃষকরাই উপনিবেশের মূল লড়াকু শক্তি, যেহেতু কৃষক চৈতন্যে ধর্ম প্রধান তাত্ত্বিক ভিত্তি, সেহেতু এই অঞ্চলের ধর্মকেন্দ্রিক লড়াইগুলোই এখানে শ্রেণীসংগ্রাম হিসেবে হাজির। Ñএই হচ্ছে জেহাদ ও শ্রেণীসংগ্রাম একাত্মায় লীন হওয়ার মাজেজা।
উপনিবেশ শব্দটির বিশ্লেষণ করতে যেয়ে আমরা দেখেছি, সমস্ত তাত্ত্বিক শিবিরের, এমনকি বিপরীত শিবিরের লোকজনকেও উপনিবেশ সংক্রান্ত বিভ্রান্তির মধ্যে পড়তে। যেমন এই বিভ্রান্তিতে আছেন জাতীয় সম্পদ রক্ষার লড়াকু সৈনিক অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ, আরেকদিকে আছেন বহুজাতিক কোম্পানির স্থানীয় এজেন্ট বা এজেন্টদের বন্ধু ফরহাদ মজহার-মাহমুদুর রহমানরা। আছেন সাংবাদিক মতিউর রহমানরা, আছেন মতিউর-দেবপ্রিয় বিরোধী বামপন্থীরাও। আছেন সর্বহারা আর সবপাওয়ারা। আছেন পূর্ব বাংলা, পূর্ব পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কথিত কমিউনিস্টরাও।

১৯ শতকে সমস্ত রোমান বিপ্লবীই নাকি অভিযোগ তুলতো, তারা যত বিপ্লব করেছে, তাতে লাভ হয়েছে কেবল অন্য জাতের- এটা শুনে এঙ্গেলস জবাব দিয়েছিলেন, তারা নাকি ‘বিপ্লব’ শব্দটা শুনলেই আহ্লাদিত হতো আর বাছবিচারহীনভাবে যোগ দিতো। আমাদের অবস্থাও সেরকম কিনা ভাবাটা জরুরি। হুজুগে বাঙ্গাল বলে শব্দ চালু আছে না।

তাই ঔপনিবেশিত রাষ্ট্রের জনগণের লড়াই একধরনের হয়। আর পরাধীন রাষ্ট্রের জনগণের আরএকধরনের। ‘ভদ্রলোকদের যত মাথা প্রায় তত মার্কসবাদ’-এই টাইপের মার্কসবাদ চর্চা হওয়ার ফলে, বিজ্ঞান হিসেবে না বোঝার ফলে, নিজেরা যা বোঝেন না তাই বোঝাতে যাওয়ার ফলে এই অবস্থা হয়েছে। এখনও হচ্ছে।
অর্থাৎ এরা কেউই বাঙালি জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণ গন্ডির সীমা অতিক্রম করতে পারেননি। আর এই আবর্তের মধ্যে থেকেই ‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট বিপ্লবীদের সমন্বয় কমিটি’ পূর্ব বাংলায় জাতিগত নিপীড়ন রয়েছে বলে স্বাধীনতার শ্লোগান তোলে এবং ‘পূর্ব বাংলার শ্রমিক আন্দোলন’ (পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টি) পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের উপনিবেশ বলে স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, শান্তিপূর্ণ, নিরপেক্ষ পূর্ব বাংলা কায়েমের কর্মসূচি গ্রহণ করে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলনকেই বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পর অনেকেই জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের আন্দোলন বলে চালিয়ে দিতে চান। অথচ পাকিস্তানভিত্তিক জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের বিশুদ্ধ কর্মসূচি কোন দলই ঘোষণা করেনি। আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন হলো কোন অঞ্চল বা প্রদেশের আংশিক স্বশাসনিক অধিকার আর জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণ হচ্ছে বিজাতীয় যৌথ থেকে তার রাষ্ট্রীয় বিচ্ছেদ অর্থাৎ স্বাধীন জাতীয় রাষ্ট্র গঠন। কমরেড লেনিন তাঁর ‘জাতি সমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’ প্রবন্ধে বলেছেন, “জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের অর্থ একান্তরূপে রাজনৈতিক দিক থেকে স্বাধীনতার অধিকার, নিপীড়ক জাতিটি থেকে স্বাধীন রাজনৈতিক বিচ্ছেদের অধিকার। প্রত্যক্ষভাবে বললে, রাজনৈতিক গণতন্ত্রের এই দাবিটির অর্থ বিচ্ছেদের জন্য প্রচারান্দোলনের এবং বিচ্ছেদকামী জাতিরটির গণভোট মারফত বিচ্ছেদ সিদ্ধান্তের পরিপূর্ণ স্বাধীনতা। তাই, বিচ্ছেদ, খন্ড-বিখন্ডতা, ছোট ছোট রাষ্ট্র সৃষ্টির দাবি আর এ দাবিটি এক নয়।”

অথচ আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলনকেই স্বাধীনতার আন্দোলন বলে চালিয়ে পাকিস্তানি প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের জঘন্যতম সামরিক হস্তপেক্ষকে যুক্তি সঙ্গত করার প্রচার চালানো হচ্ছে। অনিল মুখার্জি ‘স্বাধীন বাংলাদেশ সংগ্রামের পটভূমি’ বইয়ে লিখেছেন,“এই কারণেই পূর্ব বাঙলার কমিউনিস্টরা প্রথম হতেই পূর্ব বাঙলার বাঙালিদের জাতীয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে নিঃসঙ্কোচ স্বীকৃতি দিয়েছে, গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলনের পর সর্বাধিক গুরুত্ব আরোপ করেছে এবং স্বাধীন বাংলাদেশ আন্দোলনে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেছে। (পৃ-৯৩)

কমরেড লেনিন তাঁর ‘জাতীয় সমস্যার সমালোচনামূলক মন্তব্য’ প্রবন্ধে স্বায়ত্বশাসন প্রসঙ্গে যা বলেছেন তা থেকেই ওই সকল সনামধন্য-‘কমিউনিস্ট পার্টি’ ও ‘নেতৃত্বের স্বরূপ’ উদ্ঘাটিত হবে। তিনি বলেছেন,“---মার্কসবাদীরা ফেডারেশন ও বিকেন্দ্রীকরণের বিরুদ্ধে, তার সোজা কারণ এই যে, পুঁিজবাদের বিকাশের জন্য যথাসম্ভব বৃহত্তম ও অতি কেন্দ্রীকৃত রাষ্ট্রেরই প্রয়োজন। অন্যান্য অবস্থা যদি সমান সমান থাকে তাহলে শ্রেণী সচেতন প্রলেতারিয়েত সর্বদাই বৃহত্তর রাষ্ট্র চাইবে। সর্বদাই সে মধ্যযুগীয় বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে লড়বে এবং স্বাগত করবে বৃহৎঅঞ্চলসমূহের যথাসম্ভব ঘনিষ্ঠতম অর্থনৈতিক সম্মিলনকে যেখানে বুর্জোয়ার বিরুদ্ধে প্রলেতারিয়েতের সংগ্রাম অবারিত হতে থাকবে ব্যাপকভাবে।

পুঁজিবাদ কর্তৃক উৎপাদন শক্তির ব্যাপক ও দ্রুত বিকাশই দাবি করে বৃহৎ রাষ্ট্র হিসেবে সংহত সম্মিলিত ভূখন্ড, কেবল তার ওপরেই যত কিছু সেকেলে, মধ্যযুগীয়, অধিকারভেদী, স্থানীয় সংকীর্ণ, ক্ষুদ্র-জাতিক, ধর্মীয় ও অন্যান্য বেড়া নিশ্চিহ্ন করে বুর্জোয়া শ্রেণী এবং সেই সঙ্গে তার অপরিহার্য প্রতিপক্ষ প্রলেতারিয়েত শ্রেণী ঐক্যবদ্ধ হতে পারে।

---কিন্তু বিভিন্ন জাতি নিয়ে যতক্ষণে ও যে পরিমাণে একটা অখন্ড রাষ্ট্র গঠিত হচ্ছে, ততক্ষণ কোনো অবস্থাতেই মার্কসবাদীরা ফেডারেটিভ নীতি বা বিকেন্দ্রীয়করণ কোনোটারই প্রচার করবে না। কেন্দ্রীকৃত বৃহৎ রাষ্ট্র হল মধ্যযুগীয় খন্ড-বিখন্ডতা থেকে সারা দুনিয়ার ভবিষ্যৎ সমাজতান্ত্রিক ঐক্যের দিকে একটি বড়ো রকমের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ এবং এইরূপ রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে ছাড়া (পুঁজিবাদের সঙ্গে যার সর্ম্পক অবিচ্ছেদ্য) সমাজতন্ত্রে যাবার কোনো পথ নেই, থাকতে পারে না।

---জাতীয়তাবাদ তা সবচেয়ে ‘ন্যায্য’, সবচেয়ে ‘বিশুদ্ধ; সবচেয়ে ‘মার্জিত’ ও সুসভ্য হলেও, তার সঙ্গে মার্কসবাদের কোন আপোষ নেই। সব রকমের জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে মার্কসবাদ উপস্থিত করে আন্তর্জাতিকতা, উচ্চতর একটা ঐক্যের মধ্যে সর্ব জাতির মিল।

---সমস্ত সামন্ত অত্যাচার, সমস্ত জাতীয় নিপীড়ন এবং কোন একটি জাতি যা ভাষার বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দুর করা-একটা গণতান্ত্রিক শক্তি হিসেবে এটা প্রলেতারিয়েতের অবশ্য কর্তব্য, নিঃসন্দেহেই তা প্রলেতারীয় শ্রেণী-সংগ্রামের স্বার্থ, যা জাতিগত কামড়াকামড়ির ফলে ঝাপসা ও আহত হয়। কিন্তু এই কঠোরভাবে নির্দিষ্ট, বিশেষ ঐতিহাসিক সীমার বাইরে গিয়ে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের সহায়তা করার অর্থ প্রলেতারিয়েতের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা এবং বুর্জোয়ার পক্ষ গ্রহণ।

---সমস্ত রকমের জাতীয় অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম-তা অবশ্যই হ্যাঁ। যত রকম জাতীয় বিকাশ এবং সাধারণভাবে ‘জাতীয় সংস্কৃতি’র জন্য সংগ্রাম-অবশ্যই না।”
এরা আসলে সকলেই জাতীয়তাবাদী, বিশেষত বাঙালি জাতীয়তাবাদি। এখন প্রত্যেকটি পার্টিই প্রতিযোগিতা করছে কারা আগে স্বাধীন পূর্ববাংলা বা পূর্বপাকিস্তান বা বাংলাদেশের দাবি তুলেছে। অবশ্য পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টি, সর্বহারা পার্টি ও বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি তাদের সর্বশেষ দলিলে ভুল স্বীকার করেছে কিন্তু ৭১এর মুক্তিযুদ্ধ যে জনগণের প্রতিরোধ যুদ্ধ ছিল এটাও তারা অস্বীকার করে।

ইতিহাস বিশ্লেষণে এই যে মার্কসবাদ বিরোধী বুর্জোয়া মার্কা আওয়ামী পদ্ধতি এর বাইরে কেউ আসতে পারে নি। সিপিবি সহ জাসদ,বাসদ সহ প্রায় প্রকাশ্য রাজনৈতিক দলেরই ইতিহাস বিশ্লেষণের ধরন হচ্ছে বুর্জোয়া শ্রেণী কাঠামোর ধরন। তার নগদ উদাহরণ হলো সম্প্রতি সিপিবি ও বাসদের যৌথভাবে ’৭২ এর সংবিধান পুনঃপ্রবর্তনের দাবিতে মিছিল- মিটিং। ৬ দফার ম্যান্ডেটধারী গণপরিষদকেও ব্যঙ্গ করে এক ব্যক্তিকেন্দ্রীক যে সংবিধান, সেই সংবিধানের পক্ষে ওকালতি এই সত্যকে তুলে ধরে- এরা আওয়ামীলীগের বাম অংশ। আর গোপন দলগুলো এখন পর্যন্ত রাষ্ট্র ঘটনাটাই বুঝে উঠতে পারেননি ’৫০ এর দশকের কমিউনিস্টদের মতোই। রাষ্ট্র বাংলাদেশ আর পার্টির নামের আগে পূর্ব বাংলা।

শ্রেণীচ্যুত থেকে রাজনীতিচ্যুত ঃ সন্নাসবাদ, বৈরাগ্যসাধন ভারতবর্ষের ধর্মচেতনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গৌতমবুদ্ধ রাজত্ব, স্ত্রী-পুত্র ছেড়ে বোধিপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এ অঞ্চলে রাজনীতিতে বোধবুদ্ধিহীন ত্যাগও সম্মানের চোখে দেখার বিষয়। গৌতমবুদ্ধের লাইন তাই এ অঞ্চলে কথিত মার্কসবাদী রাজনীতিতে ভক্তির জায়গায় প্রতিষ্ঠিত। এখানে মার্কসবাদ বিজ্ঞান হিসাবে হাজির না হয়ে ধর্মের নতুন ফর্ম নিয়েছে। দেখা যাচ্ছে বিপ্লবী রাজনীতিতে দীক্ষা নিতে গেলে শ্রেণীচ্যুত হতে হয়। তাছাড়া কালীসাধক, সাম্প্রদায়িক অনুশীলন-যুগান্তর দলের সন্ত্রাসবাদী জীবনযাপন পদ্ধতিও কথিত মার্কসবাদীদের দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ মার্কসবাদও এদের কাছে ধর্মের চেহারা নিয়েছে। (অক্টোবর বিপ্লব পরবর্তীকালে সূর্যসেন, প্রীতিলতারা যদি বিপ্লবী হন, তাহলে বুঝতে হবে বাসদ-সিপিবি কোন বিপ্লব করতে চান ও নিজেরা কোন ধরনের বিপ্লবী হতে চান? মনে রাখতে হবে সূর্যসেনরা এমন বিপ্লব করতে চেয়েছিলেন, যে বিপ্লবে কাকাবাবু বলে পরিচিত মুজাফ্ফর আহমদও কমরেড হতে পারেননি। কারণ কাকাবাবু ছিলেন মুসলমান। অন্যদিকে কংগ্রেসের-আওয়ামী লীগের চোখে যারা বিপ্লবী, যারা মহাত্মা বিবেকানন্দ, রামকৃষ্ণ পরমহংস; তারা যদি কমিউনিস্টদের চোখেও সেই একইভাবে ধরা দেন, তাহলে বুঝতে হবেÑ দু’পক্ষ আসলে একপক্ষ। দু’জনের চোখে দেখেছি জগৎ, দোঁহারে দেখেছি দোঁহে, এইরকম আর কি। এমনকি বাসদ নেতাকর্মীরা ৪/৫ বছর আগেও জামাতবিরোধী শ্লোগান দিতে গিয়ে বলতোÑ গোলাম আজম সাঈদী / বাংলার ইহুদী। এবার ভাবুন, ইহুদি ঘরে জন্ম নেয়া মার্কস এই শ্লোগান শুনলে কী বলতেন!)
আমাদের দেশের গোপন-প্রকাশ্য প্রতিটি পার্টিই শ্রেণীচ্যুতের তত্ত্ব কর্মীবাহিনীর সামনে উপস্থিত করেছে। মার্কসবাদ না বুঝে হাজার হাজার ছাত্র মানব দরদী সেজে শ্রমিক-কৃষকের মাঝে গেছে, অনেকে আবার নিজেরাই ’শ্রেণীচ্যুত’ হয়ে শ্রমিকশ্রেণীর কোটা পূরণ করেছে পার্টিতে। শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থকে, দৃষ্টিভঙ্গিকে গ্রহণ করা আর শ্রেণীচ্যুত হওয়াকে এক করে দেখা হয়েছে। শ্রেণীচ্যুত হলো সমাজে এমন লোকজন,যারা নির্দিষ্ট কোন শ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত নয়, যারা নিজ শ্রেণীর সঙ্গে সম্পর্ক হারিয়েছে, যেমন- ভিক্ষুক, বেশ্যা, চোর-ডাকাত ইত্যাদি। কিন্তু এঁরা সেটা বুঝেনি।

কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহারে মার্কস ও এঙ্গেলস লিখেছেন, ” নি¤œমধ্যবিত্ত, ছোট হস্তশিল্প কারখানার মালিক, দোকানদার, কারিগর, চাষি-এরা সকলে বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে লড়ে মধ্যশ্রেণীর টুকরো হিসাবে নিজেদের অস্তিত্বটাকে ধ্বংসের মুখ থেকে বাঁচাবার জন্য। তাই তারা বিপ্লবী নয়, রক্ষণশীল। বলতে গেলে প্রতিক্রিয়াশীলও, কেননা ইতিহাসের চাকা পিছনে ঘোরাবার চেষ্টা করে তারা। দৈবক্রমে (নু পযধহপব) যদি এরা বিপ্লবী হয় তবে তা হয় কেবল তাদের প্রলেতারিয়েতরূপে আসন্ন রূপান্তরের কারণে; সুতরাং তারা তখন রক্ষা করে তাদের বর্তমান স্বার্থ নয়, ভবিষ্যৎ স্বার্থ; নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করে তারা গ্রহণ করে প্রলেতারিয়েতের দৃষ্টিভঙ্গি।”
এখানে মূল বিষয় হলো প্রলেতারীয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা।

মার্কসবাদ-লেনিনবাদের প্রতিষ্ঠাতারা যে বিষয়টিকে ঠাট্টা-মশকরা করেছেন, প্রতিরোধ করেছেন, সেই বিষয়টি আমাদের এখানে মহান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বিড়ি ফুঁকানো, লুঙ্গি পড়া, গান্ধি সাজা এককথায় শ্রমজীবী মানুষের মতো জীবন যাপন করা। সোজাবাংলায় এক ধরনের আরোপিত, অভিনয়মূলক জীবন-যাপন করা। মার্কস-এঙ্গেল্স-লেনিনসহ সমস্ত সফল বিপ্লবীদের মধ্যেই আমরা এই ব্যাপারটি দেখিনা। প্রকৃতপক্ষে মানুষ উৎপাদন-সম্পর্কের যে স্তরে বাস করে, সেই অনুয়ায়ী তার জীবন-যাপন পদ্ধতি নির্মিত হয়। তাই মার্কসবাদ-লেনিনবাদের প্রতিষ্ঠাতাদের বক্তব্য সরাসরি উদ্ধৃতি আকারে তুলে ধরা প্রয়োজন মনে করি।

মার্কস ও এঙ্গেল্স আ. বেবেল, ভ.লিবক্লেখট, ভ. ব্রাকে প্রমূখের প্রতি এক সার্কূলারপত্রে লিখেছেন, ” প্রায় ৪০ বছর ধরে আমরা এই জোর দিয়ে আসছি যে, শ্রেণী সংগ্রামই ইতিহাসের আশু চালিকাশক্তি এবং বিশেষ করে বুর্জোয়া ও প্রলেতারিয়েতের মধ্যকার শ্রেণীসংগ্রাম আধুনিক সমাজ বিপ্লবের বিশাল চালকদন্ডস্বরূপ। অতএব যাঁরা আন্দোলন থেকে এই শ্রেণীসংগ্রামকে বর্জন করতে চান তাঁদের সঙ্গে সহযোগিতা করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব। আন্তর্জাতিক যখন গঠিত হয়েছিল, তখন পরিষ্কার করেই আমরা এই রণধ্বনি সূত্রবদ্ধ করেছিলাম ঃ শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তিসাধন হওয়া চাই শ্রমিকশ্রেণীর নিজের কাজ। অতএব, যাঁরা খোলাখুলিই বলেন, নিজেদের মুক্ত করার মতো শিক্ষাদীক্ষা শ্রমিকদের নেই, উপর থেকে, মানবদরদী বড় বুর্জোয়া ও পেটিবুর্জোয়াদের সাহায্যে তাদের মুক্ত করতে হবে, তাদের সঙ্গে আমরা সহযোগিতা করতে পারিনা।”
এঙ্গেল্স তাঁর আত্মজীবনীতে (পৃঃ৫৮০), ”পার্টির মধ্যে, ’ছাত্র, সাহিত্যিক ও অন্যান্য তরুণ শ্রেণীচ্যুত বুর্জোয়ার এক জঙ্গলের’ অনুপ্রবেশের মধ্যে ছাত্র বিদ্রোহের” কারণ খুঁজে বের করেছেন। অর্থাৎ ’শ্রেণীচ্যুত বুর্জোয়া’ বলে গালি দিয়েছেন।

লেনিন তাঁর ”বামপন্থী ছেলেমানুষী ও পেটিবুর্জোয়াপনা” বইয়ে লিখেছেন, ” আমরা দেখছি যে আমাদের ’ বামপন্থীরা’ প্রলেতারীয় লৌহশৃঙ্খলা ও তার প্রস্তুতির কথাটা একদম বোঝেনা, শ্রেণীচ্যুত পেটিবুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীর মনোবৃত্তিতে তারা একেবারে আচ্ছন্ন।”

”গুরুগম্ভীর বুলি বিতরণ-এ হলো শ্রেণীচ্যুত পেটিবুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীর বৈশিষ্ট্য। সংগঠিত প্রলেতারীয় কমিউনিস্টরা নিশ্চয়ই এই ’অভ্যাসের’ জন্য শায়েস্তা করবে অন্তত পক্ষে উপহাস হেনে ও সমস্ত দায়িত্বশীল পদ থেকে বিতারণের ব্যবস্থা করে।” ”শ্রমিকেরা পেটিবুর্জোয়া নয়। বৃহত্তর ’রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদে’ তারা ভয় পায়না, সেটাকে তারা মূল্য দেয় তাদের প্রলেতারীয় হাতিয়ার হিসাবে, যেটাকে তাদের সোভিয়েত রাজ ব্যবহার করছে ক্ষুদে-মালিকী ভাঙন ও স্খলনের বিরূদ্ধে।

এটা বোঝেনা কেবল শ্রেণীচ্যুতেরা, এবং সেইহেতু পেটিবুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীরা, ’বামপন্থী কমিউনিস্টদের’ গ্রুপে ও তাদের ্রপত্রিকায় যার প্রতিভূ হয়ে দেখা দেন ওসিনস্কি,....।” ” আর সুতা কল শ্রমিক, তামাক কারখানার শ্রমিক, জুতা কারখানার শ্রমিকেরা শ্রেণীচ্যুত পেটিবুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের মতো ’রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদে’ ভয় পাচ্ছেনা, ’ট্রাস্ট সংগঠকদের কাছে শিখতে’ ভয় পাচ্ছেনা।” (ঈড়ষষবপঃবফ ডড়ৎশং: ১৯৬৫, ঠড়ষ:২৭,চধমব:৩২৯,৩৩০,৩৪৯,৩৫১)

লেনিন ঙহ ঃযব জড়ধফ প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, ’পার্টি পরিত্যাগ করার অর্থ হলো পার্টির ভেজাল থেকে মুক্ত হওয়া, এর অর্থ হলো কম টেকসই উপাদান থেকে, অবিশ্বাসী অনুরাগীদের থেকে, দরদীদের থেকে পার্টির অব্যাহতি পাওয়া, সর্বদাই যারা কিছু সময়ের জন্য প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে মিলিত হয় এবং যারা পেটিবুর্জোয়া বা শ্রেণীচ্যুতের মধ্যে থেকে পার্টিতে ভর্তি হয়েছিল অর্থাৎ সেই সমস্ত লোক যারা কিছু নির্দিষ্ট শ্রেণীর কক্ষপথ থেকে নি®কৃত হয়ে পার্টিতে ঢুকেছিল।” (অথচ মাওবাদীরা মার্কসবাদ- লেনিনবাদের একশিলীভূত পার্টির বিপরীতে পার্টিতে পেটিবুর্জোয়া উপাদান সচেতনভাবে রেখে দুই লাইনের সংগ্রাম তত্ত্ব হাজির করেছে। সেই সঙ্গে শ্রেণীচ্যুতের তত্ত্ব তো আছেই।- অকমিউনিস্ট উপাদান দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি বানানো আর কি। অন্যদিকে পার্টি যদি বস্তু হওয়ার কারণে প্রলেতারীয় ও বুর্জোয়া দ্বন্দ্ব থাকে, তাহলে সম্যবাদী সমাজেও শ্রেণী থাকতে হয়। আসলে লেনিন ইস্পাত দৃঢ় একশিলীভুত পার্টি বলতে যা বুঝিয়েছেন, তাহলো হলো লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণের দিক। ইশতেহারের ভাষায়, নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করে তারা গ্রহন করে প্রলেতারিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি। কমরেড মাও সে তুঙ যখন বলেন, ঐক্য → সমালোচনা → ঐক্য, তখন কথাটির মানে দাঁড়ায় ঐক্যবদ্ধ একটি পার্টির গড়ে তোলার প্রশ্ন। তাতে বাংলাদেশের মাওবাদীদের বুঝমতে, কখনোই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিসমূহকে, চিন্তাকে পার্টিতে প্রশ্রয় দান বুঝায় না)

আর এই শ্রেণীচ্যুত (উব-ঈষধংংবফ) তত্ত্ব ভারতবর্ষে চালু থাকার কারণে, শ্রমিকশ্রেণীকে শ্রেণী হিসেবে সংগঠিত করা ছাড়াই পার্টি গড়ে উঠেছে। ছাত্রদের দঙ্গল পার্টি রাজনীতিতে প্রাধান্যে থেকেছে। এই তত্ত্বটির সর্বনাশা প্রভাব শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি গড়ে ওঠার বেলায় প্রধান বাধা হিসেবে দাঁড়িয়েছে। পার্টি শ্রমিকশ্রেণীর না হয়ে বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, হয়ে দাঁড়িয়েছে বুর্জোয়া দলগুলোর বুদ্ধিজীবী উৎপাদনের কারখানায়।

সর্বশেষ তেল-গ্যাস জাতীয় কমিটির হরতালে বাস্তব কারণেই যেখানে শ্রমিকদের উপস্থিতিই অধিক হওয়ার কথা ছিল, সেখানে ছাত্ররাই শুধুমাত্র হাজির। শিল্প এলাকা নিরুত্তাপ, কিন্তু বিশ্ববিদ্যায় জ্বলছে। আমরা জানি যে ছাত্ররা গোষ্ঠী হিসেবে কোন উৎপাদন সম্পর্কের সাথে সরাসরি জড়িত না। জাতীয় সম্পদের লড়াই যেমন অর্থনীতিবাদী লড়াই হওয়ায় শ্রমিকশ্রেণীর সামনের সারিতে থাকার কথা, আবার একই সঙ্গে তা রাজনৈতিক লড়াই হওয়ার কারণেও শ্রমিকশ্রেণীকেই নেতা হিসেবে ভুমিকা নেবার কথা ঐতিহাসিকভাবেই।

কিন্তু উব-ঈষধংংবফ তত্ত্বের মোহ আমাদের সাধারণ বোধবুদ্ধিকে গ্রাস করে ফেলেছে। যারা যতবেশী উব-ঈষধংংবফ তত্ত্বকে আঁকড়ে ধরতে পেরেছে, তারা যেন ততবেশী বিপ্লবী। তাই শ্রমিক নাই, ছাত্র-বুদ্ধিজীবীরাই শ্রমিক!

যেমন বাসদ ‘দলত্যাগীদের কুৎসা ও অপপ্রচারের জবাব’ পুস্তিকার পৃ.৪৫ এ লিখেছে “আর এই অনুশীলন বা প্রায়োগিক তৎপরতাও সমাজের নানাবিধ বিকাশ অসমতা, পুঁজিবাদী পিছুটান মোকাবিলা করে উঠে আসতে পারে স্বল্পসংখ্যক মানুষের মাঝেও নানা টানাপোড়েন, শ্রেণীচ্যুত বুদ্ধিজীবী ও বিপ্লবী কর্মী হয়ে ওঠার আগ পর্যন্ত দোলায়মানতাসহ অসংখ্য জট-জটিলতা অতিক্রম করার চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যদিয়েই পরিচালিত হয়।” অর্থাৎ শ্রেণীচ্যুত বুদ্ধিজীবী হয়ে ওঠা এদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। আর এই শ্রেণীচ্যুত হতে গিয়ে বাসদ নেতারা ব্যক্তিগত সম্পত্তি একজায়গায় জড়ো করেছেন, যা পরে অনিবার্যভাবেই আশ্রম বা সমবায় সমিতির চেহারা নিয়েছে। এবং এই একত্রিত সম্পত্তি পার্টির নামেই বিভিন্ন ব্যবসায় খাটছে ও পার্টি হয়ে উঠেছে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান।

অথচ আমরা মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিনের গোটা জীবনে এই ঘটনাটি দেখতে পাই নাই যেÑ তারা ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাখেন নাই, তাঁরা বিপ্লবের স্বার্থে সর্বস্ব ত্যাগ করেছেন বলে কিন্তু কখনো এই আইনটি ঘোষণা করেননিÑ ব্যক্তিগত সম্পত্তি রাখা যাবে না। তাহলে তাঁরা কী এ বিষয়টা বুঝতেন না? অবশ্যই বুঝতেন। কিন্তু বাসদসহ প্রায় সকল গোপন দলগুলোই ব্যক্তিগত সম্পত্তি না রাখার বিষয়টিকেই শ্রেণীচ্যুত হওয়া বোঝান। অন্যদিকে শ্রমিকশ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণের বিষয়টি তারা বোঝেন না। ফলে তাদের কর্মসূচি প্রলেতারীয় জায়গা থেকে না হয়ে মালিকের জায়গা থেকে তৈরি হয়। জমির সাধারণীকরণ ও উত্তরাধিকার বিলোপের দাবি, তাই তাদের কর্মসূচিতে নাই। পুঁজির অন্তর্নিহিত ব্যাপারটি তারা বোঝে না।

পুঁজিবাদী রাষ্ট্রচরিত্র এমন এই রাষ্ট্রকে আঘাত করে এমন সংগঠনের সম্পত্তিও এই পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের কোন না কোন প্রতিষ্ঠানেই রাখতে হবে, যেমন ব্যাংক। সবার বিচ্ছিন্ন্ সম্পত্তি একজায়গায় রেখে অর্থাৎ আরেক পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানে জমা রাখা একদিকে যেমন পুঁজির সাথে সম্পর্ক তৈরি অন্যদিকে একটি সাচ্চা বিপ্লবী দলের নিজের হাত নিজে বাঁধার মতো। এককথায়, পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায়, রাষ্ট্রে এরকম অর্থনৈতিক চর্চা বিপ্লবী পার্টির পক্ষে একেবারে অসম্ভব। কিন্তু আশ্রম বা সমবায় প্রতিষ্ঠান কিংবা যৌথ মালিকানার ব্যবসা খুবই সম্ভব।

একারণেই বোধহয় মার্কস-লেনিনদের জীবনে আমরা দেখেছি, জনগণ তাঁদের পার্টিকে প্রচুর চাঁদা দিয়েছে, থাকার জায়গা দিয়েছে কিন্তু কেউ কোন স্থাবর সম্পত্তি দান করেন নি। আশ্রমে যেভাবে সম্পত্তি দান করা হয়, সেভাবে করা হয়নি। একটি বিপ্লবী পার্টির পক্ষে এরকম সম্পত্তি শেকল স্বরূপ; যা হারাবার ভয়ও তৈরি করে, আশ্রম সংস্কৃতি নির্মাণ করে।

তাই বিপ্লবের স্বার্থকে প্রধান স্বার্থ মনে করা আর প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি একজায়গায় জড়ো করা ভিন্ন ব্যাপার। প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সম্পত্তি একজায়গায় জড়ো করে যারা বিপ্লব করতে চান, অন্তত মুখে বলেন, তারা ঐতিহাসিক ব্যাপারটিই বোঝেন না, এবং তাই শেষপর্যন্ত একত্রিত সম্পত্তি পুঁজিতে পরিণত হতে সময় লাগে না। আর পুঁজি মানে উদ্বৃত্ত শ্রম শোষণ, মুনাফা, ব্যবসা এক কথায় শোষণমূলক সম্পর্ক। আর যে পার্টি ব্যক্তিগত সম্পত্তি একত্রিত করে এই শোষণমূলক সম্পর্ক বা পুঁজি গড়ে তোলে, তা তখন আওয়ামীলীগ-বিএনপির মতো নোংরা বুর্জোয়া সংগঠনের চেয়েও নিজেকে নিচে নামায়, অধঃপতিত করে। কারণ বুর্জোয়া পার্টিগুলোও পার্টিগতভাবে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান না।
ঐক্য বনাম ঐক্য-ঐক্য খেলা ঃ বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ‘দল’ বা গ্রুপ ঐক্য - ঐক্য বলে হাঁকডাক পারতে শুরু করে। ঐক্য হয়ও, শ্রমিকশ্রেণীকে বাদ দিয়েই শ্রমিকশ্রেণীর বলে কথিত দলও গঠিত হয়। কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই দেখা যায়- শ্রমিকশ্রেণীর পাটি হয়নি বলে, নেতাদের মধ্য থেকে পার্টি হয়নি বলে চিৎকার শুরু হয়, একটা পর্যায়ে দেখা যায় কথিত বৃহৎ পার্টির টুকরো রূপ। উদাহরণ দিতে গেলে লম্বা তালিকা হবে। যেটা হয়, সেটা হল গণতন্ত্রী পেটিবুর্জোয়া দল গুলোর মধ্যে এককথায় সেই দলগুলোর নেতাদের মধ্যে ঐক্য হয়। ঐক্যের যে মূলভিত্তি শ্রেণীশৃঙ্খলা অর্থাৎ শ্রমিকদের ঐক্য, তা হয়না। এককথায় ঐক্যের ঘোষণা হয় মাত্র, এর বেশি কিছু না, হওয়া সম্ভবও না। কারা, কাদের সঙ্গে, কেন ঐক্যÑ তার মূল্যায়ণই প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়।

যেখানে মার্কসবাদের জ্ঞানে সমৃদ্ধ ও দেশের বাস্তব অবস্থায় তা প্রয়োগে সক্ষম শ্রমিকশ্রেণীর কোন পার্টি অর্থাৎ কমিউনিস্ট পার্টিই গঠিত হয়নি, সেখানে ‘নেতৃত্বের’ বা ‘পার্টির’ ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলেও এদেশে তা শ্রমিকশ্রেণীর কোন উপকারে আসবে নাÑ কোন কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হবে না ; যেমন অতীতেও ঐ ভাবে কোন কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়নি তথাকথিত নেতাদের ঐক্যের মধ্যদিয়ে।

কমিউনিস্ট পার্টি গড়তে হলে, যে ঐক্যের আবশ্যক তা হলো সঙ্গতিনিষ্ঠ মার্কসবাদীদের অর্থাৎ কমিউনিস্টদের ঐক্য। সত্যিই যদি শ্রমিকশ্রেণীর পার্টি, একটি কমিউনিস্ট পার্টি গড়তে চাই, তাহলে কর্তব্য হবেÑ সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে, মার্কসবাদের বিকৃতিকারীদের বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম করা ; তত্ত্বগত প্রশ্নে দৃঢ় থাকা, কোনরূপ তত্ত্বগত সুবিধা না দেওয়া, আমলাতন্ত্রকে কোনভাবেই প্রশ্রয় না দেওয়া, মস্তিষ্কের স্থিরতা ও ধৈর্য্য না হারানো, অতীতের ভুলগুলো নিয়মিতভাবে শোধরানো, ট্রেডইউনিয়নে ও তার বাইরে শ্রমিক জনগণের সংখ্যাধিক অংশকে অটলভাবে জয় করা, ঘটনাবলির মোড় যেকোন পরিবর্তনেই জনগণকে সঠিকভাবে পরিচালনা করতে সক্ষম, দৃঢ় ও বুদ্ধিমান একটি কমিউনিস্ট পার্টিকে ধৈর্য্য সহকারে গড়ে তোলা। আলবৎ মনে রাখছি,ঐক্য আমাদের দরকার ; তবে সে ঐক্য হতে হবে একমাত্র সঙ্গতিনিষ্ঠ মার্কসবাদীদের ঐক্য,মার্কসবাদের বিকৃতিকারীদের সঙ্গে বা সংশোধনবাদীদের সঙ্গে বা গণতন্ত্রী পেটি বুর্জোয়াদের সঙ্গে ঐক্য নয়। ঐক্য প্রসঙ্গে শ্রমিকশ্রেণী মেনে চলবে একমাত্র মার্কস- এঙ্গেলস- লেনিন নির্দেশিত পথ। তাহলে আসুন পিছন ফিরে দেখি- তাঁরা কে কী বলেছেন। মার্কস- এঙ্গেলস ‘কমিউনিস্ট লীগের কাছে কেন্দ্রীয় কমিটির বিবৃতি’ তে বলেছেন, “--- যখন গণতন্ত্রী পেটিবুর্জোয়ারা সর্বত্র নিপীড়িত, তখন তারা সাধারণভাবে প্রলেতারিয়েতের সঙ্গে ঐক্যের এবং আপোষের কথা প্রচার করে, তারা প্রলেতারিয়েতের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয় এবং গণতন্ত্রী পার্টির ভিতরকার সবরকমের মতের স্থান হতে পারে এমন একটি বৃহৎ বিরোধী পার্টি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, অর্থাৎ শ্রমিকদের তারা এমন একটি পার্টি সংগঠনের মধ্যে জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা করে যেখানে সাধারণ সোশ্যাল- ডেমোক্র্যাসির বুলির প্রাধাণ্য আর তার আড়ালে লুকানো থাকে তাদের বিশেষ স্বার্থসমূহ, যেখানে পরম আদরের শান্তির খাতিরে প্রলেতারিয়েতের বিশেষ দাবিগুলো হাজির না করাই ভালো। এই ধরনের মিলন কেবল তাদেরই কাছে সুবিধাজনক আর প্রলেতারিয়েতের কাছে পুরোপুরিই অসুবিধাজনক হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে শ্রমিকশ্রেণী তার সমস্ত স্বাধীন ও কষ্টার্জিত অবস্থান হারাবে এবং পুনরায় সরকারি বুর্জোয়া- ডেমোক্র্যাসির লেজুরে পরিণত হবার পর্যায়ে নেমে যাবে। অতএব, এ মিলনকে অবশ্যই চূড়ান্তভাবে বাতিল করা প্রয়োজন। বুর্জোয়া গণতন্ত্রীদের সমস্বরে স্তবগানের জন্য আনত হবার পরিবর্তে শ্রমিকশ্রেণীকে, এবং সর্বোপরি লীগকে গণতন্ত্রীদের পাশাপাশি শ্রমিক পার্টির একটি স্বাধীন, গোপন ও প্রকাশ্য সংগঠন গড়ার জন্য অবশ্যই আত্মনিয়োগ করতে হবে ; তাদের প্রতিটি শাখাকে শ্রমিক সমিতিসমূহের কেন্দ্রস্থল এবং কোষবিন্দুতে পরিণত করতে হবে যেখানে প্রলেতারিয়েতের দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্বার্থ নিয়ে আলোচনা করা হবে বুর্জোয়া প্রভাব থেকে স্বাধীন ভাবে। (মার্কস- এঙ্গেলস ঃ রচনা সংকলন)”

ঐক্য প্রসঙ্গে ভ. ই. লেনিন বলেছেন, “উদারনীতিক শ্রমিক রাজনীতিকদের সঙ্গে, শ্রমিক আন্দোলনের বানচালকারীদের সঙ্গে, অধিকাংশের অভিপ্রায় লংঘণকারীদের সঙ্গে ফেডারেল অথবা অন্যকোনরকম ঐক্য হতে পারে না। সমস্ত সঙ্গতিনিষ্ঠ মার্কসবাদীদের ঐক্য, লিকুইডেটরদের (বিলুপ্তি পন্থীদের) অপেক্ষা না করে এবং তাদের ছাড়াই মার্কসীয় সমগ্রটা এবং অকর্তিত ধ্বনিগুলির সমস্ত সমর্থকদের ঐক্য হতে পারে ও হওয়া উচিত।

ঐক্য একটি বৃহৎ ব্যাপার ও বৃহৎ ধ্বনি। কিন্তু শ্রমিক কর্মযজ্ঞের জন্য দরকার মার্কসবাদীদের ঐক্য, মার্কসবাদের বিরোধী ও বিকৃতিকারীদের সঙ্গে মার্কসবাদীদের ঐক্য নয়। ঐক্যের কথা যারা বলে তাদের প্রত্যেককে আমাদের জিজ্ঞাসা করতে হবে ঃ কার সঙ্গে ঐক্য? লিকুইডেটরদের (বিলুপ্তি পন্থীদের) সঙ্গে? - তাহলে আমাদের হাত মেলাবার কিছু নেই।

লিকুইডেটরদের (বিলুপ্তি পন্থীদের) সঙ্গে কোনো দহরম-মহরম নয়, সমগ্রটাকে যারা লংঘন করেছে তাদের চক্রগুলোর সঙ্গে কোনো কূটনৈতিক আলাপ - আলোচনা নয় Ñ মার্কসবাদী ধ্বনির চারিপাশে, মার্কসীয় সমগ্রটার চারিপাশে শ্রমিক- মার্কসবাদীদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য সমস্ত শক্তি নিয়োগ করতে হবে। লিকুইডেটরদের (বিলুপ্তি পন্থীদের) অভিপ্রায়টা সচেতন শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে দেবার যেকোন প্রচেষ্টাকে সচেতন শ্রমিকেরা অপরাধ বলে গণ্য করবে, আর মনে রাখবে সত্যিকার মার্কসবাদীদের শক্তির খন্ড - বিখন্ডতাও সমান অপরাধ।

কেননা ঐক্যের ভিত্তি হলো শ্রেণীশৃঙ্খলা, অধিকাংশের অভিপ্রায় মানা, এই অধিকাংশের সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে মিলমিশ কাজ। এই ঐক্যের জন্য, এই শৃঙ্খলার জন্য, এই মিলমিশ কাজের জন্য আমরা সমস্ত শ্রমিকদের ডাক দিতে কখনো ক্লান্ত হবো না। (চ-২৩২, ঈড়ষষবপঃবফ ডড়ৎশং, ঠড়ষ. ২০, ১৯৬৫) ”
“.... শ্রমিকদের ঐক্য সত্যই আবশ্যক। এবং সবচেয়ে আবশ্যক এইটে বোঝা যে শ্রমিকেরা নিজেরা ছাড়া আর কেউ তাদের ঐক্য ‘দান করতে ’ পারে না, তাদের ঐক্যে সাহায্য করার ক্ষমতা আর কারো নেই। ঐক্য ‘ প্রতিশ্রুতির’ ব্যাপার নয়, Ñ সেটা হবে ফাঁকা বড়াই, আত্মপ্রতারণা। বুদ্ধিজীবী গোষ্ঠীগুলির ‘ সম্মতি’ থেকে ঐক্য ‘ সৃষ্টি করা’ যায় নাÑ এটা হল সবচেয়ে শোচনীয়, সবচেয়ে বাতুল, সবচেয়ে অজ্ঞ একটা বিভ্রান্তি।

ঐক্য জয় করতে হবে এবং একরোখা, অধ্যাবসায়ী পরিশ্রমে কেবল শ্রমিকেরা নিজেরা, সচেতন শ্রমিকেরা নিজেরাই সেটা সাধন করতে সক্ষম।

প্রকান্ড প্রকান্ড অক্ষরে ‘ ঐক্য’ কথাটি লেখা, তার আশ্বাস দেওয়া, নিজেকে ঐক্যের পক্ষপাতি বলে ‘ ঘোষণা করা’ Ñএর চেয়ে সহজ আর কিছু নেই। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ঐক্যকে অগ্রসর করা সম্ভব কেবল পরিশ্রম করে এবং অগ্রণী শ্রমিকদের, সমস্ত সচেতন শ্রমিকদের সংগঠন দিয়ে। সংগঠন ছাড়া ঐক্য অসম্ভব। সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে সংখ্যালঘিষ্ঠের নতি স্বীকার ছাড়া সংগঠন অসম্ভব। (চ-৩১৯, ঈড়ষষবপঃবফ ডড়ৎশং, ঠড়ষ-২০, ১৯৬৫)”

আমাদের এখানে, বাংলাদেশে এই কথাটি খুবই চালু আছে Ñ “এক ডজন কর্মসূচির তুলনায় সত্যিকারের আন্দোলনে প্রতিটি পদক্ষেপ বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ” মার্কসের এই কথাটি নিয়ে শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করতে চায় বিশেষত মধ্যশ্রেণীর ‘কমিউনিস্ট’, ‘সমাজতন্ত্রী’ আর গণতন্ত্রী পেটি বুর্জোয়ারা। এ জন্য আমরা লেনিনের শরণাপন্ন হচ্ছি। লেনিন বলছেন, “আমাদের আন্দোলনের প্রকৃত অবস্থার সঙ্গে যাদের সামান্যতম পরিচয়ও আছে, তারা লক্ষ্য না করে পারেন না যে, মার্কসবাদের ব্যাপক বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে তাত্ত্বিক মান কিছুটা নেমে গিয়েছিল। বহুলোক, আন্দোলনের বাস্তব তাৎপর্য এবং বাস্তব সাফল্য দেখে, অতি সামান্য তত্ত্বগত শিক্ষা নিয়ে বা কোনও রকম শিক্ষা ছ্ড়াাই আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন। এর থেকে আমরা বুঝতে পারি যে, রাবোচিয়ে দিয়েলো যখন বিজয়ীর ভঙ্গিতে মার্কস এর লেখা থেকে উদ্ধৃতি দেয় ঃ ‘এক ডজন কর্মসূচির তুলনায় সত্যিকারের আন্দোলনে প্রতিটি পদক্ষেপ বেশি গুরুত্বপূর্ণ,’ তখন সে কতখানি কৌশলহীনতার পরিচয় দেয়। তত্ত্বগত বিশৃঙ্খলার এই যুগে এই কথার পুনরাবৃত্তির অর্থ হল শ্মশানে দাঁড়িয়ে শোকাকুল আত্মীয়দের কাছে ‘এমন সুখের দিনটির বারবার ফিরে আসার আকাঙক্ষা ’ জানানো। তাছাড়া মার্কস এর এই কথাগুলো নেওয়া হয়েছে গোথা কর্মসূচি সম্পর্কে মার্কস এর চিঠি থেকে, যাতে তীক্ষè ভাষায় তিনি নিন্দা করেছেন মূলনীতি গঠনে পল্লবগ্রাহিতার। পার্টি নেতৃবৃন্দের কাছে তিনি লিখেছেন ঃ ঐক্য যদি আপনারা গড়তেই চান, তাহলে আন্দোলনের বাস্তব লক্ষ্য পূরণের জন্য চুক্তিবদ্ধ হোন, কিন্তু নীতিগত ব্যাপারে কোন দরকষাকষি করতে দেবেন না, তত্ত্বগত ব্যাপারে কোনও ‘সুবিধা ’ দেবেন না। এই ছিল মার্কস এর চিন্তাধারা ; অথচ আমাদেরই ভিতর এমন লোক আছেন যারা মার্কস এর নাম করে তত্ত্বের তাৎপর্যকে ছোট করবার চেষ্টা করেন। ” (ঈড়ষষবপঃবফ ডড়ৎশং, ঠড়ষ- ৫, চ- ৩৬৯, ১৯৬৫)

আমরা শ্রমিকশ্রেণীর ঐক্য, কমিউনিস্ট ও কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্নদের ঐক্যের পক্ষে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সে ঐক্য হতে হবে সঠিক অর্থে বাংলাদেশে একটি কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার লক্ষ্যে। অন্য সব ঐক্য শুধুমাত্র ফাঁকা আওয়াজ। কারণ, তাতে শ্রমিকশ্রেণীর কিছু থাকে না। শ্রমিকশ্রেণীকে শ্রেণী হিসেবে গঠিত করার মধ্যদিয়ে একটি কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার লক্ষ্যে সমস্ত শক্তি নিয়োগ করা উচিত।

বিপ্লব-বিপ্লব খেলা ঃ আমরা একটি কমিউনিস্ট পার্টির বৈশিষ্ট্যগুলো থেকে ইতোমধ্যে জেনেছি বাংলাদেশের কোন একটি পার্টিও মার্কস-এঙ্গেল্স-লেনিন বর্ণিত বৈশিষ্ট্যের সাথে মিলে না। ফলে ভাষার আন্দোলনসহ পাকিস্তান আমলের কোন আন্দোলনই কথিত কমিউনিস্টপার্টিগুলো কমিউনিস্টসূলভ আন্দোলন করেনি। আর মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে কয়েকটি দল সি.পি.বি,ন্যাপ(মোজফফর)ইত্যাদি যেমন বাকশালে বিলীন হয়ে যায়, তেমনি আওয়ামীলীগ থেকে জন্ম নেয় জাসদ ও জাসদ থেকে জন্ম নেয় বাসদ। তাদের মুক্তিযুদ্ধ ও তার পূর্ববর্তী ইতিহাসের বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি আওয়ামী ঘরানার,কারণ এরাই ‘মুজিববাদ’ শ্লোগানের ছিল অন্যতম কান্ডারী , এবং এটাই স্বাভাবিক।

এই পার্টি দু’টি চারপাশ দেখে বুঝতে পেরেছেÑ এদেশের উৎপাদন পদ্ধতি ও রাষ্ট্রচরিত্র পুঁজিবাদী। কিন্তু এরা মনে করে যেহেতু এই রাষ্ট্র পুঁজিবাদী, সেহেতু এখানে বুর্জোয়া বিপ্লব হয়েছে। তাদের সমস্যা হল যেহেতু বুর্জোয়া বিপ্লব হয়েছে তাহলে সেটা কোন ঘটনার মধ্য দিয়ে তা নির্ধারণ করা। এরা মনে করে সেটা ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ; যেহেতু এই দু’টি দলের নেতারা মুক্তিযুদ্ধে মুজিববাহিনীর মধ্য দিয়ে সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন দেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে, এখন এদের কারো কারো ভাষায়, জনগণ সকল ধরনের শোষণ মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল মুক্তিযুদ্ধে, তাই এটি একটি বিপ্লব, এবং সেটা বুর্জোয়া বিপ্লব, অথচ মুক্তিযুদ্ধের আগে এরাই মুক্তিযুদ্ধকে বলতো সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। এদের নেতা শেখমুজিব স্বপ্ন দেখার কারণেই জাতির পিতা যেমন, এখানেও তাই স্বপ্নের কারণেই মুক্তিযুদ্ধ বুর্জোয়া বিপ্লব। স্বপ্নই যদি শর্ত হবে তাহলে মুক্তিযুদ্ধকে নয়াগণতান্ত্রিক নয়, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক নয়, সমাজতান্ত্রিক নয় একেবারে সাম্যবাদী বিপ্লব বলতে হয়। বলবোই যদি কম বলবো কেন! জনগণ সকল ধরনের শোষণ মুক্তির স্বপ্নইতো দেখেছিল মুক্তিযুদ্ধে, যেমন দেখেছিল পাকিস্তান আন্দোলনে। তাহলে পাকিস্তান আন্দোলন কোন বিপ্লব?

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে কেন সংবিধানে সমাজতন্ত্র সংযোজিত হলো, এই দিকটা ভাবলেও যে কেউ বুঝতে পারবে, ভুলভাবে হলেও মুক্তিযুদ্ধে এমন একটি অংশ নিশ্চয়ই ছিল; যারা মুক্তিযুদ্ধকে সমাজতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ মনে করেছেন, এখন প্রশ্ন দাঁড়ায়, তারা কারা? যারা এটা মনে করতেন? উত্তর হচ্ছে আওয়ামীগের একটি তরুণ অংশ; যারা পরবর্তীতে জাসদ ও বাসদ নামে নিজেদের পরিচিত করে। সোজা বাংলায় একটি প্রশ্ন সামনে এসে দাঁড়ায়-মুক্তিযুদ্ধের সময় বললেন, সমাজতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ করছেন, আর পরবর্তীকালে বলছেন, সেটা বুর্জোয়া বিপ্লব ছিল। কোনটা সঠিক? সাংবিধানিকভাবেও তো সমাজতন্ত্র কায়েম করলেন, এবার তাহলে কমিউনিজম এর জন্য বিপ্লব করুন। বাসদ-জাসদের ভাষাতেই বলি- সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কবার হয়? বুর্জোয়া বিপ্লব অসম্পন্ন থাকলে যদি আবার বুর্জোয়া বিপ্লব করতে না হয়, তাহলে সমাজতন্ত্রের বিপ্লবই বা আবার কেন? চলুন সাম্যবাদী বিপ্লব করি?!

সমাজের ভিত্তি ও কাঠামোর মধ্যে কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছাড়াই একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হতে পারে, তা রক্তাক্ত পথেই হোক আর শান্তির পথেই হোক, তা সামাজিক বিপ্লব নয়।

আর সামাজিক বিপ্লব হল সমাজের উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে আমূল পরিবর্তন, উৎপাদন ক্ষেত্রে মানুষে মানুষে সম্পর্কের পরিবর্তন, মানুষের প্রতি মানুষের বিবেচনাবোধের পরিবর্তন। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের পর এই পরিবর্তন কী ঘটেছিল? উত্তর হবেÑ না।

আওয়ামীলীগ বুর্জোয়া পার্টি বলেই তারা যদি বুর্জোয়া রাষ্ট্র কয়েম করে, তাহলে পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকরা, পরাধীন ভারতবর্ষের ইংরেজরা বুর্জোয়া ছিল না? একদল বুর্জোয়ার হাত থেকে আরেক দল বুর্জোয়ার হাতে ক্ষমতা যাওয়াই কি বুর্জোয়া বিপ্লব? ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবে সামন্তদের সাথে বুর্জোয়ারা ক্ষমতার ভাগাভাগি করে নেয়, ১৮২৮ সালের বিপ্লবে ব্যবসায়ী বুর্জোয়ারা সামন্তদের চূড়ান্তভাবে হটিয়ে দেয়, ১৮৪৮ সালে শিল্পবুর্জোয়ারা ব্যবসায়ী বুর্জোয়াদের হটিয়ে ক্ষমতা নেয় ফরাসি দেশে। অর্থাৎ প্রথমত, একটি দেশে কয়েকবার বুর্জোয়া বিপ্লব হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এই বিপ্লবগুলি প্রমাণ করে বিপ্লবে অধিকতর প্রগতিশীল শ্রেণীর হাতে ক্ষমতা যায়। এখন কথা হচ্ছে ’৭১ সালে কোন শ্রেণীর হাত থেকে কোন শ্রেণীর হাতে ক্ষমতা গিয়েছিল? সামন্তদের হাত থেকে বুর্জোয়াদের হাতে? ব্যাবসায়ী বুর্জোয়াদের হাত থেকে শিল্পবুর্জোয়াদের হাতে? নাকি শিল্পবুর্জোয়াদের হাত থেকে লুম্পেন বুর্জোয়দের হাতে?

এবার আমরা বাসদের ‘বাংলাদেশের উৎপাদন পদ্ধতি ও রাষ্ট্রচরিত্র’ গ্রন্থ থেকে বক্তব্য টেনে মার্কসবাদ লেনিনবাদ অনুসারে যাচাই করা যাক। এই গ্রন্থের সর্বশেষ পৃষ্ঠায় তারা সিদ্ধান্ত টেনেছে, “কাজেই বাংলাদেশের অবস্থিত সমাজব্যবস্থার বৈপ্লবিক বূপান্তরের জন্য উৎপাদন পদ্ধতি ও রাষ্ট্রচরিত্র বিশ্লেষণ করে আমরা যে সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছি ঃ

১. বাংলাদেশের বিগত স্বাধীনতা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণী রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে এবং বুর্জোয়া শ্রেণীর আভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলশ্রুতিতে ক্ষমতার পটপরিবর্তন, ব্যক্তি বা দলের রদবদল ঘটলেও শ্রেণী হিসেবে মূলত বুর্জোয়া শ্রেণীই রাষ্ট্রক্ষতায় অবস্থান করছে এবং ততটুকু এখানে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে। এখানকার বুর্জোয় শ্রেণী জাতীয়-আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বিবেচনায় সাম্রাজ্যবাদের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে সম্ভাব্য সকল উপায়ে পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে সংহত ও বিকশিত করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ একটি জাতীয় বুর্জোয়া রাষ্ট্র বা পুঁজিবাদী রাষ্ট্র।”

আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে- জাতীয় বুর্জোয়া শ্রেণীর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদের সাথে লড়াই করে যারা জাতীয় পুঁজির বিকাশ ঘটায়। তাহলে যে বুর্জোয়ারা তাদেরই ভাষ্যমতে সাম্রাজ্যবাদের সাথে গাঁটছড়া বাঁধে, তারা কি আর জাতীয় বুর্জোয়া থাকে? আর বাংলাদেশ যদি একটি জাতীয় বুর্জোয়া রাষ্ট্র হয়, তাহলে তারা জাতীয় সম্পদ রক্ষার আন্দ্লোন করছেন কেন? আর ততটুকু অর্থে যদি এখানে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে সত্যিকার অর্থে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিনা?

তাছাড়া আমরা ’৭০-’৭১ এর তৎকালীন আওয়ামীলীগের ঢাকা মহানগর কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মুহাম্মদ নূরুল কাদিরের “দু'শো ছেষট্টি দিনে স্বাধীনতা” গ্রন্থ থেকে যখন জানতে পারি ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি সম্পাদনের পর অক্টোবর মাসে ভারতের সঙ্গে প্রবাসী সরকার যে ৭ দফা চুক্তি করে, যে চুক্তিতে স্বাক্ষর শেষে তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও সর্বাধিনায়ক সৈয়দ নজরুল ইসলাম মূর্ছা যান। সেই মৈত্রী চুক্তির দফাগুলো ছিল ঃ ১. যারা সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে শুধু তারাই প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে নিয়োজিত থাকতে পারবে। বাকীদের চাকুরীচ্যুত করা হবে এবং সেই শূন্যপদ পূরণ করবে ভারতীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা(যেহেতু মুক্তিযুদ্ধে অতি নগন্য সংখ্যক প্রশাসনিক কর্মকর্তা যোগ দিয়েছিল, সেহেতু প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে পুরো বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা ভারতীয়রা গ্রহণ করবে, অর্থাৎ বাংলাদেশের পরিচালক হয়ে উঠবে-আবির হাসান)। ২. বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে অবস্থান করবে। ১৯৭২ সালের নভেম্বর মাস থেকে আরম্ভ করে প্রতি বছর এ সম্পর্কে পুনরীক্ষণের জন্য দু’ দেশের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ৩. বাংলাদেশের কোন নিজস্ব সেনাবাহিনী থাকবে না। (সেনাবাহিনী না থাকলে, রাষ্ট্র তাহলে কাকে বলে? এবং এই কারণেই পাকিস্তান বাহিনীর সমর্পণকৃত অস্ত্র ভারতীয় বাহিনী দখল করে নেয় ও ভারতে পাচার করে। Ñআবির হাসান) ৪. অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য মুক্তিবাহিনীকে কেন্দ্র করে একটি প্যারামিলিশিয়া বাহিনী গঠন করা হবে। ৫. সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে (মুক্তিযুদ্ধ নয় Ñআবির হাসান) অধিনায়কত্ব দেবেন ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধান, মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক নন এবং যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিবাহিনী ভারতীয় বাহিনীর অধিনায়কত্বে থাকবে। (অর্থাৎ বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীকে নেতৃত্ব দেবেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি না, অন্য দেশের সেনা অফিসার Ñআবির হাসান)। ৬. দু’ দেশের বাণিজ্য হবে খোলাবাজার (ওপেন মার্কেট) ভিত্তিক। তবে বাণিজ্যের পরিমাণ হিসাব হবে বছর-ওয়ারী এবং যার যা পাওনা, সেটা স্টার্লিং-এ পরিশোধ করা হবে। ৭. বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের প্রশ্নে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলবে এবং ভারত যতদূর পারে এব্যাপারে বাংলাদেশকে সহায়তা দেবে (অর্থাৎ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি না থাকলে সেই রাষ্ট্রটিকে স্বাধীন রাষ্ট্র বলা যায় কী?)

আশা করি, চুক্তিটির দফাগুলো সকলে বুঝেছি। যারা নিজ দেশকে অন্যদেশের হাতে তুলে দেয় তারা কি কোনভাবেই জাতীয় বুর্জোয়া হয়? এবং রাষ্ট্রটি কি আর জাতীয় রাষ্ট্র দুরে থাক, স্বাধীন রাষ্ট্রও কি থাকে? এটি একটি এক নদী রক্তের দামের প্রশ্ন। নাকি দাসখতে সইকারীদের অংশীদার হিসেবে বাসদ ও জাসদ নেতারা ইতিহাস বিকৃতির চেষ্টা করছেন, স্বাধীনতাবিরোধী চরিত্র ঢাকার চেষ্টা করছেন?

আমরা জানি লেনিন অক্টোবর বিপ্লবের আগে এপ্রিল মাসে এই বিপ্লব কেমন হবে সেটি নিয়ে ‘বর্তমান বিপ্লবে প্রলেতারিয়েতের কাজ’ শিরোনামে একটি থিসিস রচনা করেন; যা এপ্রিল থিসিস নামে হাজির। সেখানে তিনি বলেন, “কিন্তু আমরা কি বিষয়ীবাদিতার মধ্যে বুর্জোয়া-ডেমোক্রাটিক বিপ্লব ‘এড়িয়ে’ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে পৌঁছানোর চেষ্টার মধ্যে পতিত হওয়ার বিপদের মুখোমুখি হইনি, যে বুর্জোয় ডেমোক্রাটিক বিপ্লব এখনো অসম্পূর্ণ, এখনো নিঃশ্বেষ করেনি কৃষক আন্দোলন?”

অর্থাৎ লেনিন বলছেন, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন না করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করার কোন সুযোগ নেই, আর কৃষক আন্দোলন নিঃশেষ করার মানে হচ্ছেÑ ভূমির উত্তরাধিকার বিলোপ ও কৃষকের জমির ক্ষুধা মেটানো। লেনিন তাঁর “গণতান্ত্রিক বিপ্লবে সোশ্যাল-ডেমোক্রাসির দুই রণকৌশল” গ্রন্থে লিখেছেন, “বুর্জোয়া গণতন্ত্র আছে একাধিক রকমের। রাজতন্ত্রীরা উচ্চ পরিষদের পক্ষপাতি এবং সার্বজনীন ভোটাধিকার ‘চায়’ অথচ গোপনে ধূর্ততা সহকারে একটা খন্ডিত সংবিধানের জন্য জারতন্ত্রের সঙ্গে আপোষরফার চেষ্টা করছে, তারাও বুর্জোয়া গণতন্ত্রী। আবার যারা জমিদার এবং সরকারি আমলাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে নিয়েছে এবং ‘সরল প্রজাতান্ত্রিকতার’ মনোভাব নিয়ে ‘জারকে ভাগাবার’ কথা বলছে, সেই কৃষকরাও বুর্জোয়া গণতন্ত্রী। ..................। যে লোক গণতান্ত্রিক বিপ্লবের যুগে গণতান্ত্রিকতার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে এবং তার বিভিন্ন রূপের চরিত্রের মধ্যে পার্থক্য দেখতে না পায় এবং হাজার হলেও তা হল ‘বুর্জোয়া বিপ্লব’, ‘বুর্জোয়া বিপ্লবের’ ফলÑ এই মর্মের ‘বুদ্ধিমত্তায়’ সীমাবদ্ধ থাকে সে-লোক খাসা মার্কসবাদী বটে!”

বাসদ-জাসদ, গোপন-প্রকাশ্য যেসব দলের নেতা-কর্মীরা শ্রেণীচ্যুত হয়েছেন তারা বুর্জোয়া বিপ্লবকে ভয় পান। লেনিনের ভাষায়, শ্রমিকেরা বুর্জোয়াদের কাছে, ট্রাস্ট সংগঠকদের কাছে শিখতে ভয় পায় না, ভয় পায় শ্রেণীচ্যুত বুর্জোয়ারা।

কেউ করতে চান সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, কেউ নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব। অর্থাৎ নয়া গণতান্ত্রিক, বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কাকে বলে এই ব্যাপারটা কেউই বোঝেন নাই। একদল আধা সামন্তবাদ আছে বলে নয়া গণতান্ত্রিক, আরেক দল বুর্জোয়া ব্যবস্থা আছে বলে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করতে চান। এই ভুল শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই হয়েছেÑ অক্টোবর বিপ্লবকে যখন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বলা হয়। লেনিন অক্টোবর বিপ্লবের পরিকল্পনা নিয়ে যখন এপ্রিল থিসিস উপস্থাপন করেন, তখন কামেনেভ নিচের এই অভিযোগটি করেন, “কমরেড লেনিনের সাধারণ পরিকল্পনাটি আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব শেষ হয়ে গেছে এই ধারণা থেকে এটা উদ্ভূত এবং এই বিপ্লবকে আশু সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে রূপান্তরের হিসাবের ভিত্তিতে তৈরি...”।

তখন লেনিন সরাসরি এই অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “এটা অশুদ্ধ। আমাদের বিপ্লবকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে ‘আশু’ রূপা›তরের মোটেই কোন ‘হিসাব’ আমি করিনি। বরং কার্যত এর বিরুদ্ধে হুঁিশয়ারি দিয়েছি, যেখানে ৮ নং থিসিসে বলেছি ঃ ‘সমাজতন্ত্র’ ‘প্রবর্তন’ আমাদের আশু কর্মসূচি নয়...।”
আমাদের দেশের কথিত কমিউনিস্টরা বুর্জোয়া বিপ্লব কী তা তারা জানেন না, হয়ত পড়েছেন কিন্তু গণিতের মতো করে বোঝার চেষ্টা করেননি। লেনিন প্রাগুক্ত গ্রন্থে বলেছেন, “বুর্জোয়া বিপ্লব হল এমন বিপ্লব যা বুর্জোয়া অর্থাৎ পুঁজিবাদী সামাজিক-অর্থনৈতিক কাঠামোর বাইরে যেতে পারে না। বুর্জোয়া বিপ্লব পুঁজিবাদী বিকাশের চাহিদা প্রকাশ করে। (যা পরে নয়া অর্থনৈতিক কর্মসূচি নামে হাজির হয় রুশ দেশে Ñআবির হাসান), এবং তার ভিত্তি ধ্বংস করা তো দূরের কথা, তার সে ভিত্তি আরো প্রসারিত এবং গভীরতর করে। সুতরাং এই বিপ্লব শুধুমাত্র শ্রমিকশ্রেণীর না, সমগ্র বুর্জোয়া শ্রেণীর স্বার্থও ব্যক্ত করে।” তিনি আরো বলেছেন, “...পুঁজিবাদের আরো বিকাশ ব্যতিত অন্য কোন কিছুর মধ্যে শ্রমিক শ্রেণীর মুক্তি সন্ধান করতে হবে এই চিন্তা প্রতিক্রিয়াশীল। রাশিয়ার মতো দেশে (আমাদের মতো দেশেও নয় কি? Ñআবির হাসান) শ্রমিক শ্রেণী যন্ত্রণা ভোগ করে পুঁজিবাদের জন্য ততটা নয় যতটা পুঁজিবাদের অপর্যাপ্ত বিকাশের জন্য। সুতরাং শ্রমিক শ্রেণী পুঁজিবাদের সর্বাপেক্ষা ব্যাপক, সর্বাপেক্ষা স্বাধীন এবং সর্বাপেক্ষা দ্রুত বিকাশে দ্বিধাহীনরূপেই আগ্রহী। পুরনো ব্যবস্থার অবশিষ্টাংশে যা কিছু পুঁজিবাদের ব্যাপক, স্বাধীন ও দ্রুত বিকাশের অন্তরায়, তার অবসান ঘটানো শ্রমিকশেণীর কাছে অবধারিতভাবেই সুবিধাজনক।”

এখন আমাদের দেশেও যারা পুঁজিবাদের সর্বাঙ্গীন বিকাশ বাদ দিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করতে চাচ্ছেন, লেনিনের ভাষায় তাদের প্রতিক্রিয়াশীল বলা ছাড়া আর কিই বা বলা সম্ভব? বাসদ রাষ্ট্র চরিত্র সিদ্ধান্তের সারমর্ম ভুল এক নম্বর থেকেই ভুল দুই নম্বরে চলে গিয়েছে, এদের ভাষায় বিপ্লবের মূল প্রশ্ন যেহেতু রাষ্ট্র ক্ষমতা থেকে বুর্জোয়াদের উচ্ছেদ, সেহেতু এই বিপ্লব সমাজতান্ত্রিক।মজার বিষয় তারা বুর্জোয়া শ্রেণীকে উচ্ছেদ করবে আরেক ধরনের বুর্জোয়া শ্রেণীকে মিত্র হিসেবে নিয়েই! এরা জানেই না-সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে কৃষকও শ্রেণী হিসেবে বুর্জোয়ার মতো বিশ্বাসঘাতক। এবং কৃষকের কাছে জমি হস্তান্তর যে কোনক্রমেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নয়, তা লেনিনের নিচের বক্তব্য থেকে বোঝা যাবে-“কৃষকদের কাছে সমস্ত জমির হস্তান্তরই হবে পূর্ণ গণতান্ত্রিক বিপ্লবের পরিচায়ক, এটাই বিপ্লবকে শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যাবার সামাজিক ভিত্তি, কিন্তু এটা কোনক্রমেই সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব নয়, ‘সামাজীকরণ’ নয়, যে কথা বলে পেটিবুর্জোয়াদের মতপ্রবক্তারা, সোশ্যালিস্ট-রেভলিউশনারিরা। কৃষক অভ্যুত্থানের সাফল্যে এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জয়ে কেবল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের জমিতে সমাজতন্ত্রের জন্য সত্যকার এবং চূড়ান্ত সংগ্রামের পথ পরিষ্কার হবে। এই সংগ্রামে কৃষক ভুম্যধিকারী শ্রেণী হিসাবে ঠিক সেই রকম বিশ্বাসঘাতক এবং অনির্ভরযোগ্য ভূমিকা পালন করবে, যে ভূমিকা আজ বুর্জোয়ারা পালন করছে গণতন্ত্রের সংগ্রামে(অর্থাৎ রাশিয়াতেও বুর্জোয়ারা গণতন্ত্রের বিকাশ বাধাগ্রস্ত করত বাংলাদেশের মতো-লেখক)। এটা ভুলে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে সমাজতন্ত্র ভুলে যাওয়া, প্রলেতারিয়েতের সত্যকার স্বার্থ এবং কর্তব্যের ক্ষেত্রে নিজেকে এবং অন্যকে প্রতারিত করা।”

আমাদের দেশে যারা শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত মিলে সমাজতন্ত্র করতে চাচ্ছেন, তারা কি নিজেদের ও অন্যদের প্রতারিত করছেন না? রাশিয়ার সেই সব পেটি বুর্জোয়া মত প্রবক্তা এরা কি নন?

মার্কস বলেছেন, বিপ্লব ইতিহাসের রেল ইঞ্জিন। বিপ্লব নির্যাতিত ও শোষিতদের উৎসব। বিপ্লবের মুহূর্তে জনগণ নিজেকে মর্যাদার যে স্তরে দেখতে পায়, যা ঘটাতে পারে, অন্য সময়ে তা অকল্পনীয়। কিন্তু ভারতবর্ষের পুরো ইতিহাসে কথিত পার্টিগুলি এই বিপ্লব ঘটনাটাই বুঝেন নি, নিজেরাই জানেন না, কখন কী করতে হবে। যাই হোক লেনিনের এই বক্তব্য থেকে নিশ্চয়ই আমরা পরিষ্কার হতে পারবো, কোন বিপ্লবে প্রলেতারীয়শ্রেণী কাদের নেতৃত্ব দেবে। লেনিন বলেছেন, “কৃষক সাধারণকে টেনে প্রলেতারিতেকে গণতান্ত্রিক বিপ্লব শেষপর্যন্ত চালাতে হবে যাতে শক্তিবলে স্বৈরতন্ত্রের প্রতিরোধ চূর্ণ এবং বুর্জোয়াদের অস্থিরমতিত্ব বিকল করে দেওয়া যায়। প্রলেতারিয়েতকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সুসম্পন্ন করতে হবে, জনগণের অর্ধ প্রলেতারীয় অংশকে নিজেদের পাশে সমবেত করে, যাতে শক্তিবলে বুর্জোয়ার প্রতিরোধ চূর্ণ করা যায় এবং কৃষক ও পেটিবুর্জোয়াদের অস্থিরমতিত্ব বিকল করে দেওয়া যায়।” অর্থাৎ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে কৃষকরা শত্রু কাতারের লোক। কিন্তু আমাদের দেশে তো সবাই সামজতান্ত্রিক (!) বিপ্লব করবেন কৃষক শ্রেণীকে সাথে নিয়েই! কী ইতিহাস চেতনা!(অন্যদিকে সর্বহারা পার্টির আনোয়ার কবীররা অক্টোবর বিপ্লবকে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব ধরে নিয়ে সেই ’৮৪ সাল থেকে বলে আসছেন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কৃষক থাকবে এবং শ্রমিকশ্রেণীর দ্বন্দ্ব কৃষকশ্রেণীর সাথে চলবে। এই দ্বন্দ্ব সমাজতন্ত্র থেকে সাম্যবাদে উত্তরণের পথ। তাছাড়া আনোয়ার কবীর তাঁর “ মাও সে তুঙ চিন্তাধারার সপক্ষে” গ্রন্থে লিখেছেন,“অক্টোবর বিপ্লবের পর রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় নামেও উল্লেখ রয়েছে‘ সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র’ শব্দ দু’টি।” অথচ ১৯১৮ সালের জানুয়ারির ৩ তারিখে সারা- রাশিয়া কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটি মেহনতি ও শোষিত মানুষের অধিকার ঘোষণা” টি অনুমোদন করে, এতে বলা হলঃ“ সংবিধান সভা সিদ্ধান্ত করছেঃ ১/ক) রাশিয়া এতদ্বারা শ্রমিক, সৈনিক এবং কৃষক প্রতিনিধিদের সোভিয়েত সমূহের প্রজাতন্ত্র বলে ঘোষিত হল। কেন্দ্রীয় আর স্থানীয় সমস্ত ক্ষমতা ন্যাস্ত হল এইসব সোভিয়েতের হাতে।”Ñ অথচ আনোয়ার কবীররা বলছেন সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নাকি ঘোষিত হয়েছে! হায় বিপ্লব!

মার্কস ইংল্যান্ডে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের সম্ভাবনার কথা বলেছিলেন, এটা নিয়ে অনেকে উল্টাপাল্টা বাৎচিত করেন। তাঁকে খারিজ করার চেষ্টা করেন। কারণ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব কী এটা তারা জানেন না। কারণ তৎকালীন ইংল্যান্ডে কৃষক বলতে আমরা যা বুঝি, যিনি বা যারা জমিতে কামলা বা মজুর নিয়োগের পাশাপাশি নিজেরাও শ্রম দেন, সেই অর্থে কৃষক ছিল না। মনে রাখতে হবে ঋধৎস থেকে ঋধৎসবৎ শব্দটি এসেছে। ঋধৎসবৎ মানে হচ্ছে খামার মালিক। আজকের আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে কোন কৃষক নেই, তাই সেখানকার বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক। পুঁজিবাদ বিকাশের একপর্যায়ে কৃষকদের উচ্ছেদ করেছে, আর সৃষ্টি করেছে খামার মালিক। খামার হচ্ছে পুঁজিবাদী উৎপাদন ক্ষেত্র; যেখানে শ্রমিক কারখানার মতোই শুধুমাত্র শ্রম বেচেন। তাই তৎকালীন ইংল্যান্ডে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কথাই বলেছিলেন মার্কস। অনেকে যে বলেন, লেলিন রাশিয়ায় অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে মার্কসকে ভুল প্রমাণ করেছেন, আসলেই কী? লেলিন তো রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করেননি। কোথাও যদি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হতো, তাহলে সেটা অবশ্যই সবার আগের ইংল্যান্ডেই হওয়ার শর্ত ছিল।

তাই অক্টোবর বিপ্লব পরবর্তী সময়ে যেমন রাশিয়ায়, তেমনি আমাদের দেশেও কৃষকশ্রেণী হাজির ছিল ও আছে, সেকারণেই অক্টোবর বিপ্লব যেমন বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব, আমাদের দেশেও কৃষকশ্রেণী থাকায় বিপ্লবের স্তর বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক-ই। তবে তফাৎ হচ্ছে ইউরোপ- আমেরিকায় বুর্জোয়া বিপ্লবে বুর্জোয়াদের নেতৃত্ব থাকায় কৃষকরা উচ্ছেদের মধ্যদিয়ে বড় বুর্জোদের কর্তৃত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আর আমাদের দেশের মতো ক্ষুদে কৃষক প্রধান দেশে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্বের গণতান্ত্রিক বিপ্লবে বড় বুর্জোয়ারা উচ্ছেদ হবে। অন্যদিকে আগামীতে ইউরোপ- আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে কর্তব্য হবে বুর্জোয়াদের উচ্ছেদ আর আমাদের মতো দেশে একই বিপ্লবে কর্তব্য হবে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদে কৃষকদের উচ্ছেদÑ এই হচ্ছে মার্কসবাদী- লেনিনবাদী বিপ্লবের নীতি, এই হচ্ছে বিচারধারা, এই হচ্ছে বিজ্ঞান, ব্যক্তিগত মালিকাহীন শোষণহীন সমাজতন্ত্রে যাবার পথ। দুই অণু হাইড্রোজেন ও এক অণু অক্সিজেনের মিশেলে পানি হয়, এর ব্যতিক্রম হলে হবে না, অন্য কিছু হবে। মার্কসবাদ হচ্ছে বিজ্ঞান, একে বিজ্ঞানের মতোই অনুশীলন করতে হবে।

তিনি লিখেছেন, “সমগ্র জনগণের এবং বিশেষ করে কৃষকদের নেতৃত্ব নিতে হবে-পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য, সুসঙ্গত গণতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য, প্রজাতন্ত্রের জন্য! সমগ্র শ্রমজীবী মানুষ এবং শোষিতদের নেতৃত্ব নিতে হবে-সমাজতন্ত্রের জন্য! এই হওয়া উচিত কার্যক্ষেত্রে বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের নীতি, এই হলো শ্রেণীধ্বনি, বিপ্লবকালে শ্রমিক পার্টির প্রতিটি রণকৌশলগত প্রশ্নে, প্রত্যেকটি ব্যবহারিক পদক্ষেপে যা নিনাদিত হবে ও তার সমাধান দেবে।”

কিন্তু হায়, কোথায় সমাধান! জাসদ ও বাসদ ’৭১ এ ছোট বুর্জোয়াদের সাথে নিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করেছিল যেমন শ্রেণীধ্বনি না বুঝেই, তেমনি ভবিষ্যতেও কৃষক ও মধ্যবিত্ত নিয়ে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব করবে। (এখন প্রশ্ন বাসদ-জাসদ নেতারা ’১৯৭১ এ নিজেরাই যেখানে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে অস্ত্র ধরতে বললেন, সেখানে তারাই আবার মুক্তিযুদ্ধকে বলছেন বুর্জোয়া বিপ্লব, কোনটি সঠিক? নাকি ভদ্রলোকের এককথার মতো- চল্লিশ বছর আগেও বয়স ছিল ৭১, চল্লিশ বছর পরেও বয়স ওই ৭১, ঘুরেফিরে বটের তল!) এই যে বিপ্লব সম্পর্কে দেউলিয়াপনা, সেটা শুধু জাসদ-বাসদসহ সকল প্রকাশ্য-গোপন কথিত পার্টিগুলোরই না, এই দেউলিয়াপনা জীবিত ও মৃত সকল বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদেরও। একমাত্র এম.আর. চৌধুরী ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার আর কোনো জীবিত ও মৃত লেখকের লেখায় বিপ্লব সম্পর্কিত স্পষ্ট ধারণা আমি পাইনি।

আমরা দেখেছি কেউ ১৫ দলীয়, কেউ ৮ দলীয়, কেউ ৭ দলীয়, কেউ গণফোরামের নেতৃত্বে ঐক্যমঞ্চে, কেউ মহাজোটের মধ্য দিয়ে বুর্জোয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলোর নেতৃত্ব স্বীকার করে নেয়। হাতুড়ি-কাস্তে ফেলে দিয়ে প্রতীক হিসেবে তুলে নেয় নৌকা-ধানের শীষ(যেমন বাসদ এ কথাটি খুবই প্রচার করে সিপিবি, ওয়ার্কার্স পার্টি, সাম্যবাদী দলসহ অন্যান্য বেমো দলগুলো আওয়ামীলীগের লেজুড় বৃত্তি করে কিন্তু তারা নিজেরা আওয়ামীলীগের নেতৃত্বে ৮ দলীয় জোটে ও গণফোরামের নেতৃত্বে ঐক্যমঞ্চে ছিল, একথা তারা কোথাও বলে না। এবং গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১১ খ্রিঃ তারিখে গণফোরামের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে বিকল্পধারা বাংলাদেশের মহাসচিব মেজর(অবঃ) আব্দুল মান্নানের সাথে বক্তব্য দেন বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান। গণফোরাম নেতা ও ঘাতক এশিয়াএনার্জির উপদেষ্টা ডঃ কামাল ও বিকল্পধারার বি. চৌধুরীকে নিয়ে বাসদ খালেকুজ্জামানরা যথার্থই বাম বিকল্পধারা গড়ে তুলবেন!)। আর মহাজোটভূক্ত বেমোদের বিসমিল্লাহ ও রাষ্ট্রধর্ম প্রশ্নে আসন টেকানোর কবুল তো আছেই। এবং বরাবরই দোহাই হিসেবে হাজির করে ইশতেহারের চতুর্থ অধ্যায়ের একেবারে শেষ বাক্যটি-“শেষকথা, সকল দেশের গণতন্ত্রী পার্টিগুলির মধ্যে ঐক্য ও বোঝাপড়ার জন্য তারা সর্বত্র কাজ করে।”

কিন্তু ১৮৭২ সালের জার্মান সংস্করণের ভূমিকায় মার্কস-এঙ্গেলস এই বাক্যটির ব্যবহারিক দিকটিকে খারিজ করে দিয়েছেন। সংস্করণের ভূমিকায় লিখেছেন, “তাছাড়া বিভিন্ন বিরোধী দলের সঙ্গে কমিউনিস্টদের সম্পর্ক সম্বন্ধে বক্তব্যগুলিও (চতুর্থ অধ্যায়ে), কেননা রাজনৈতিক পরিস্থিতি একেবারে বদলে গেছে, এবং উল্লিখিত রাজনৈতিক দলগুলির অধিকাংশকে ইতিহাসের অগ্রগতি এ জগৎ থেকে ঝেটিয়ে বিদায় দিয়েছে।”

ভূমিকার সঙ্গে মূল বই মিলিয়ে না পড়া, গণিতের মতো করে বুঝতে না চাওয়ার ফলে এখনও সিপিবি নেতা এম.এম.আকাশের মতো অনেক আকাশ ইশতেহার শেষের দিকের এই উক্তির দোহাই পেড়ে আওয়ামীলীগের খোঁয়াড়ে ঢোকার জন্য প্রথম আলোয় লিখেন, ‘বামপন্থিদের ভাবতে হবে’। আর বাসদ(খালেকুজ্জামান) তো সংশোধনবাদী বাকুনিনের মতো ইশতেহারের ভূমিকা ছাড়াই নিজস্ব ঢঙে ইশতেহার প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ বাসদ (খালেকুুজ্জামান) মনে করে, ইশতেহারের ভূমিকার তত গুরুত্ব নেই। এঙ্গেলস এর ভাষায় নিজের মতের মতো করে কেটে ছেটে নেওয়া নিজস্ব মার্কসবাদ। তাই কমিউনিস্ট লীগ, ওয়ার্কার্স, জাসদ, বাসদ, সিপিবি, সাম্যবাদীদলসহ প্রায় সকল প্রকাশ্য-গোপন দলই অতীতে বুর্জোয়াদের সঙ্গে আাঁতাত করেছেন। প্রায় সকল গোপন-প্রকাশ্য দলই তাদের দলিলে স্বীকার করেছে বাংলাদেশে কোন কমিউনিস্ট পার্টি নেই। বিস্তারিত জানতে পড়তে পারেন এম.আর.চৌধুরীর“ভারতবর্ষ-পাকিস্তান পর্বে ছিল না-বাংলাদেশেও কমিউনিস্ট পার্টি নাই,” ও হেলাল উদ্দিনের “কমিউনিস্ট পার্টি নাই প্রসঙ্গে” গ্রন্থ দু’টি। আর সিপিবি’র কর্মকান্ড জানতে পড়–ন আনু মুহাম্মদের “সিপিবি’র রাজনীতি ও লেজুড়বাদ ( আবির হাসানের প্রাসঙ্গিক ভূমিকা সহ), ডাকঘর, রংপুর”।

তাছাড়া কোন কোন দল/মঞ্চ বস্ত্র ও পুস্তক ব্যবসা শুরু করেছে বিপ্লবের নাম করেই। বাসদ(খালেকুজ্জামান) খাগড়াছড়িতে বাগান, পরিবহন ব্যবসা, শেয়ার মার্কেটে বিনিয়োগ করেছে। বাসদ নেতা আব্দুল্লাহ সরকারের মতে, “পার্টি কার্যত ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটে রূপ নিয়েছে।” অর্থাৎ যে পার্টি নিজেই ব্যবসা করে, মালিক শ্রেণীর প্রতিনিধিত্ব করে, সে পার্টি যে বিপ্লবী না, তা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। অর্থাৎ বিপ্লব ও ব্যবসা জমজ ভাইয়ের মতো একসাথে চলছে।

আমরা লেনিনের সংশোধনবাদ সম্পর্কে একটি উক্তি দিয়ে বক্তব্য শেষের দিকে যাবো,“রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের (সংশোধনবাদীদের) পাপ হয়েছে এই যে, কৃষকদের বিপ্লবী প্রলেতারিতের দৃষ্টিকোণ গ্রহণের জন্য অনুপ্রাণিত না করে তারা অনিবার্যভাবেই মালিকের (অর্থাৎ বুর্জোয়াদের মনোভাব) অবলম্বন করতেই বলছেন, কিংবা তাদের সেদিকে ঠেলে দিচ্ছেন-তাঁরা সেটা চান বা না-ই চান।” আর বাসদসহ কয়েকটি দল শুধু মনোভাব নয় সরাসরি নিজেই মালিকশ্রেণীর প্রতিনিধি।অর্থাৎ শ্রমিকশ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ না করেই কথিত শ্রেণীচ্যুত এরা হয়েছে!

তিনি আরো বলেছেন ,“সংশোধনবাদের আর্থনীতিক ও রাজনীতিক ধারার একটা স্বাভাবিক পরিপূরক হলো সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের চূড়ান্ত লক্ষ্যের প্রতি তার মনোভাব।‘ আন্দোলনটাই সব, চূড়ান্ত লক্ষ্য কিছুই নয়’- বার্নস্টাইনের এই বাঁধা বুলিটিতে অনেক দীর্ঘ বিচার -বিশ্লেষণের চেয়েও ভালভাবেই সংশোধনবাদের মর্ম প্রকাশিত হয়েছে। উপলক্ষে-উপলক্ষে নিজের আচরণ বদলানো, দৈনন্দিন ঘটনাবলির সঙ্গে এবং সংকীর্ণ রাজনীতির ক্রমাগত পরিবর্তনশীলতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাওয়ানো,প্রলেতারিয়েতের মূল স্বার্থগুলি এবং সমগ্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থার, সমস্ত পুঁজিবাদী বিবর্তনের মৌলিক বৈশিষ্ট্যগুলি বিস্মৃত হওয়া,ক্ষণিকের বাস্তবিক কিংবা কল্পিত সুবিধার খাতিরে মূলস্বার্থ বলি দেওয়া- এই-ই হলো সংশোধনবাদের কর্মনীতি।” কথিত বামপন্থী পার্টিগুলোর ইতিহাসে তো তাই দেখছি।

আর গোপন দল গুলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রটাকেই বুঝে উঠতে পারে নি। রাজনৈতিকভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র কী, সেটা তারা জানেন না। জাপান, জার্মানীতে আমেরিকান সেনা থাকার পরও স্বাধীন রাষ্ট্র সেগুলো আর বাংলাদেশ নাকি স্বাধীন নয়! অনুন্œত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র বাংলাদেশে গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও এর রাজনীতিতে এখনো হাবুডুবু খাচ্ছেন, ঘাঁটি এলাকা গঠনের স্বপ্নে বিভোর । মাও এর নামে মাও বিরোধীতা! মাও সে তুঙ “যুদ্ধ ও রণনীতির সমস্যা” প্রবন্ধে ১৯৩৮ সালে লিখেছেন, “বিপ্লবের কেন্দ্রীয় কর্তব্য ও সর্বোচ্চ রূপ হচ্ছে সশস্ত্র শক্তির দ্বারা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল, যুদ্ধের দ্বারা সমস্যার সমাধান। মার্কসবাদ- লেনিনবাদের এই বিপ্লবী নীতি সর্বত্রই প্রযোজ্য, তা চীন দেশেই হোক আর বিদেশেই হোক। কিন্তু নীতি এক হলেও সর্বহারা শ্রেণীর পার্টি ভিন্ন পরিবেশে একে ভিন্নভাবেই প্রয়োগ করে। যেসব পুঁজিবাদী দেশ ফ্যাসিবাদী নীতি অনুসরণ করে না ও যুদ্ধাবস্থায় নেই, তারা দেশের ভিতরে বুর্জোয়া গণতন্ত্র চালু রাখে, সেখানে সামন্ততন্ত্র থাকে না। আর বাইরে তারা অন্যান্য জাতির দ্বারা অত্যাচারিত হয় না, বরং নিজেরাই অন্যান্য জাতির উপর নির্যাতন চালায়। এই সব বৈশিষ্ট্যের কারণেই পুঁজিবাদী দেশগুলোর সর্বহারা শ্রেণীর পার্টির কর্তব্য হচ্ছে দীর্ঘকাল বৈধ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিকদের শিক্ষিত করা, শক্তি সঞ্চয় করা আর এরই মাধ্যমে পুঁজিবাদের চূড়ান্ত উচ্ছেদের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। এইসব দেশে দীর্ঘকাল ধরে বৈধ সংগ্রাম চালানো, পার্লামেন্টকে মত প্রকাশের একটি মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ধর্মঘট, ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠন তৈরি ও শ্রমিকদের শিক্ষাদান করাই হলো প্রশ্ন। সেখানকার সংগঠনের রূপ হচ্ছে বৈধ আর সংগ্রামের রূপ হচ্ছে রক্তপাতহীন (যুদ্ধ নয়)। যুদ্ধের প্রশ্নে, পুঁজিবাদী দেশগুলোর কমিউনিস্ট পার্টি তাদের নিজ নিজ দেশের দ্বারা পরিচালিত সা¤্রাজ্যবাদী যুদ্ধের বিরোধীতা করে; এধরনের যুদ্ধ যদি বেঁধে যায় তবে নিজ নিজ দেশের প্রতিক্রিয়াশীল সরকারের পরাজয় ঘটানোই হচ্ছে এই সব পার্টির নীতি। যে যুদ্ধ তারা লড়তে চায় সেটা শুধু গৃহযুদ্ধ, যার জন্য তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত না বুর্জোয়া শ্রেণী সত্যি সত্যি অসহায় হয়ে পড়ছে, সর্বহারা শ্রেণীর বেশিরভাগ যতক্ষণ না সশস্ত্র অভ্যুত্থান ও যুদ্ধ করতে সংকল্পবদ্ধ হচ্ছে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত কৃষক সাধারণ সর্বহারা শ্রেণীকে স্বেচ্ছায় সাহায্য করতে এগিয়ে না আসছেন ততক্ষণ পর্যন্ত এই অভ্যুত্থান ও যুদ্ধ শুরু করা উচিত নয়। এবং যখনই অভ্যূত্থান ও যুদ্ধ শুরু করার সময় আসে প্রথমে শহরগুলোকে দখল করে তারপর গ্রামাঞ্চলে অভিযান চলে। এর বিপরীত নয়। পুঁজিবাদী দেশগুলোর কমিউনিস্ট পার্টি এমনি করেছিল এবং রাশিয়ার অক্টোবর বিপ্লব এটা সঠিক বলে প্রমাণিত করেছে।

চীনের অবস্থা অন্য ধরনের। চীনের বৈশিষ্ট্য হলো, সে স্বাধীন গণতান্ত্রিক দেশ নয়, বরং একটি আধা-ঔপনিবেশিক ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক দেশ; আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তার কোন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নেই, বরং সে সামন্ততান্ত্রিক অত্যাচারে জর্জরিত; আর বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার জাতীয় স্বাধীনতা নেই বরং সে সা¤্রাজ্যবাদের দ্বারা নিষ্পেষিত। সুতরাং পার্লামেন্টকে ব্যবহার করার কোন সুযোগই আমাদের নেই। এবং ধর্মঘটের জন্য শ্রমিকদের সংগঠিত করারও কোন আইনসংগত অধিকার আমাদের নেই। মূলতঃ, এখানে কমিউনিস্ট পার্টির কর্তব্যটি কিন্তু অভ্যুত্থান ও যুদ্ধ শুরু করার আগে দীর্ঘকাল বৈধ সংগ্রামের ভেতর দিয়ে যাওয়া নয়, প্রথমে শহরগুলি দখল ও পরে গ্রামাঞ্চলগুলোকে অধিকার করে নেওয়া নয়, বরং পার্টিকে এর ঠিক বিপরীত পথ অতিক্রম করা উচিত।”

অথচ আনোয়ার কবীরদের রচনায় পড়–ন - রুশ বিপ্লবের পথ ছাড়া যেমন পুঁজিবাদী দেশের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব অসম্ভব, চীন বিপ্লবের পথ ছাড়া সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা নিপীড়িত কৃষক প্রধান দেশে জাতীয় গণতান্ত্রিক বিপ্লব অসম্ভব।

তাঁরই ভাষায়, মাও সে তুঙ মার্কসবাদী- লেনিনবাদী মতবাদকে আরও স্পষ্ট ও বিকশিত করেছেন এভাবে ১) এই সমগ্র “উৎক্রমণ” পর্বটাই হচ্ছে সমাজতন্ত্র; ২) এই উৎক্রমণ পর্বে স্বভাবতঃই রাষ্ট্র ও সর্বহারা একনায়কত্ব থাকবে;

আনোয়ার কবীরের বক্তব্য অনুসারে রাশিয়া ও চীনে যদি সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, তাহলে তো সর্বহারা (প্রকৃতপক্ষে হবে- প্রলেতারীয়) একনায়কত্ব ছিল নিশ্চয়ই? তাহলে দেখা যাক মার্কসবাদের প্রতিষ্ঠাতারা প্রলেতারীয় একনায়কত্ব সম্বন্ধে কী বলেছেন। কার্ল মার্কস এর “ ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ” বইয়ের ভূমিকায় এঙ্গেলস বলেছেন, “তা বেশ, ভদ্রমহোদয়গণ আপনারা কী জানতে চান সেই একনায়কতন্ত্র দেখতে কেমন? প্যারিস কমিউনের প্রতি চোখ ফেরান। এটা ছিল প্রলেতারিয়েতের একনায়কতন্ত্র।”

কার্লমার্কস দেখাচ্ছেন প্রলেতারীয় একনায়কত্বে কী কী হয়েছিল,“সরলতম ধারণায় কমিউনের অর্থ হল কেন্দ্রীয় স্থানগুলোতে, প্যারিসে ও ফ্রান্সের অন্য বড় বড় শহরে পুরনো সরকারি যন্ত্রটিকে প্রাথমিকভাবে ধ্বংস করা এবং তাকে প্রতিস্থাপিত করা প্রকৃত স্ব-শাসন দিয়ে, শ্রমিকশ্রেণীর সামাজিক মজবুত ঘাঁটি প্যারিস ও অন্যান্য বড় শহরে সেই শাসন হলো শ্রমিকশ্রেণীর সরকার। অবরোধের মধ্যদিয়ে সেনাবাহিনীর হাত থেকে অব্যাহতি লাভ করে প্যারিস তার বদলে প্রতিষ্ঠা করেছিল এক জাতীয় রক্ষী বাহিনী, তার সংখ্যাধিক ছিল প্যারিসের মেহনতীরা। একমাত্র এই অবস্থার দরুনই ১৮ মার্চের অভ্যুত্থান সম্ভব হয়েছিল। এই বাস্তব ঘটনাটাই একটা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়া দরকার ছিল, আর সরকারি ক্ষমতা জবরদখলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জনগণ, বড় বড় শহরে জাতীয় রক্ষী বাহিনী দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা দরকার ছিল জনগণের বিরুদ্ধে সরকারের রক্ষক স্থায়ী সেনাবাহিনীকে। কমিউন তৈরী হয়েছিল সকল নাগরিকের ভোটে নির্বাচিত দায়িত্বশীল ও স্বল্পমেয়াদে প্রত্যাহারযোগ্য বিভিন্ন মহল্লা এর পৌরপ্রতিনিধিদের নিয়ে। সেই সংস্থায় সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বভাবতই মেহনতীরা অথবা শ্রমিকশ্রেণীর স্বীকৃত প্রতিনিধিরা। পার্লামেন্টারি সংস্থা না হয়ে তাকে হতে হল একটি কাজের সংস্থা, একাধারে কার্যনির্বাহক ও আইন প্রণয়নী সংস্থা। পুলিশকে একটা কেন্দ্রীয় সরকারের হাতিয়ার হওয়ার বদলে হতে হল কমিউনের সেবক, প্রশাসনের অন্যসমস্ত বিভাগের কর্মকর্তাদের মতো তারাও কমিউনের দ্বারা নিযুক্ত ও সর্বদায় প্রত্যাহারযোগ্য, কমিউনের সদস্যদের মতো সমস্ত কর্মকর্তাকেই কাজ করতে হত শ্রমজীবীর মজুরিতে। বিচারপতিদেরও হতে হল নির্বাচিত, প্রত্যাহারযোগ্য ও দায়িত্বশীল। সমাজ জীবনের সমস্ত বিষয়ে উদ্যোগ থাকল কমিউনের হাতে। এককথায়, সমস্ত সরকারি কাজকর্ম, এমন কি অল্প যেসব কাজের ভার কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে, তাও সম্পন্ন করতো কমিউনের প্রতিনিধিরা, এবং সেইহেতু তা থাকল কমিউনের নিয়ন্ত্রণাধীনে।. . . স্থায়ী সেনাবাহিনী আর সরকারি পুলিশের উচ্ছেদের সঙ্গে সঙ্গে ভাঙা হয়েছিল নিপীড়নের কায়িক শক্তিটাকে।”

এখন প্রশ্ন হচ্ছে রাশিয়া,চীন, কিউবা, উত্তর কোরিয়া কোথাও কি আমরা মার্কস বর্ণিত বিষয়গুলি বাস্তবায়িত হতে দেখেছি? এমনকি সমাজতান্ত্রি কর্মসূচি না দিয়েও এপ্রিল থিসিসের যে কর্মসূচি লেনিন হাজির করেছিলেনÑ পুলিশ, ফৌজ ও আমলাতন্ত্র লোপ এবং মজুরি ও বেতন সমান করার কাজটি কি কোথাও বাস্তবায়িত হয়েছে? উত্তর হবে- না। মজুরি - বেতনের প্রশ্নটিকে না বুঝলে বিপ্লবের স্তর বোঝাপড়ায় গলদ থাকবেই। এমনকি লেনিন “রাষ্ট্র ও বিপ্লব” গ্রন্থে বলেছেন,“বিনা ব্যতিক্রমে সমস্ত পদাধিকারীর নির্বাচন ও যেকোন সময়ে তাকে অপসারণের ব্যবস্থা, তাদের বেতনকে‘মজুরের’ সাধারণ ‘বেতনে’ নামানো,- এইসব সরল ও ‘স্বতঃবোধগম্য’ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হল শ্রমিক ও অধিকাংশ কৃষকদের সার্থকে পুরোপুরি ঐক্যবদ্ধ করার সঙ্গে সঙ্গে পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে যাবার সেতু স্বরুপ।” অর্থাৎ পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে যাবার সাধারণ সেতুই নির্মিত হল না অথচ আমরা সবাই ঘোষণা দিয়ে বসে আছি রাশিয়া- চীন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। হায়রে বোঝাপড়া! হরিপদ কেরানীর সঙ্গে আকবর বাদশার কোন ভেদ নেই!

আর মৌলিক পরিবর্তন না করে কেউ যদি রাষ্ট্রের নাম সমাজতান্ত্রিক রাখেই, তাতে শ্রমিকশ্রেণীর যায় আসেনা, তা স্টালিনই করুক আর মাও সে তুঙই করুক।
(প্রকৃতপক্ষে স্টালিন সমাজতন্ত্রে কৃষক অর্থাৎ ক্ষুদে উৎপাদকের অস্তিত্ব এবং মাও জাতীয় বুর্জোয়াদের অন্তর্ভূক্ত রেখেছিলেন। এটা তাঁদের ভুল ছিল, অপরাধ নয়। কারণ তাঁরা দু’জনেই প্রলেতারীয় একনায়কত্বকে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মান্য করেছেন।)

বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির তাত্ত্বিক গুরু প্রয়াত আব্দুল হক“ ইতিহাসের রায় সমাজতন্ত্র” প্রবন্ধে লিখেছেন,“ ১৯১৭ সালের ৭ই নভেম্বর মহান লেনিনের নেতৃত্বে সংগঠিত হইল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। রাশিয়ার বুকে দেখা দিল সমাজতন্ত্রের নতুন পতাকা।” একই লেখায় তিনি আরও লিখেছেন,“... কিন্তু সমাজতন্ত্র যেদিন প্রতিষ্ঠিত হইবে এবং পৃথিবীতে যেদিন আর শ্রেণী শোষণ বিদ্যমান থাকিবে না, সেই দিন আর রাষ্ট্র থাকিবে না।” বুঝুন ঠ্যালা, তাঁর কথা অনুযায়ী সমাজতন্ত্রে যদি রাষ্ট্র না থাকে, তাহলে কি রাশিয়ায় বা চীনে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হয়েছিল বা সমাজতন্ত্র ছিল?

বাংলাদেশে যারা বৈধ ও আইনসঙ্গত সংগ্রাম ছেড়ে গোপন পার্টি করছেন, তাদের কাছে প্রশ্নÑ আমাদের দেশে কি সাংবিধানিকভাবে পার্লামেন্টকে ব্যবহার সুযোগ নেই? (আর হ্যাঁ, পার্লামেন্টকে ব্যবহার বলতে মাওবাদীরা যেন এটা না বোঝেন যে, বুর্জোয়াদের জোয়ালোর আওতায় মজুরি দাসত্বের চাপে চালানো নির্বাচনে প্রলেতারিয়েতকে আগে সংখ্যাধিক্য অর্জন করতে হবে, পরে ক্ষমতা অধিকার করতে হবে। এটা হবে সিপিবি-জাসদ-ওয়ার্কার্স-বাসদদের মতো ভন্ডামির চূড়ান্ত, সাবেকী ক্ষমতার অধীনে ভোটাভুটিকেই শ্রেণীসংগ্রাম ও বিপ্লবের স্থলাভিষিক্ত করা।) শ্রমিকদের ধর্মঘট করার অধিকার নেই? যদি থাকে তাহলে তারা মাও সে তুঙ এর পরামর্শ শুনছেন না কেন? বিগত ৪০ বছরে তারা কতটা ঘাঁটি এলাকা তৈরী করতে পেরেছেন?

উল্টো পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের মতো এখানকার বাঙালি বুর্জোয়ারা কি চাকমা, মারমা, সাঁওতালদের উপর নির্যাতন করছে না? যদি উত্তর হয় হ্যাঁ তাহলে নিজেদের মাওবাদী বলে তারা মাও সে তুঙ এর নির্দেশ কি মানছেন? গোপন সমস্ত পার্টি (!) মিলে বিপ্লবের নামে কোন খেলায় এরা মেতেছেন? এগুলোকি বিপ্লবী পার্টির বৈশিষ্ট্য?
গণসংহতি নামের একটি মঞ্চ ও মতিউর রহমান-বিনায়ক সেন গ্রুপ আলাদা আলাদাভাবে সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদের বিকল্প ‘তৃতীয়পথ’ ‘মধ্যপথ’ ‘অন্যপন্থা’ অনুসন্ধানে ব্যস্ত। অর্থাৎ মুক্তি ও মুনাফার মাঝামাঝি পথ এরা খুঁজছে। কেউ একটু বামে, কেউ একটু ডানে এই তফাৎ!

গণসংহতিকে নিয়ে যদি নামের কারণেই আলোচনা করতে হয়, তাহলে নামের কারণেই আওয়ামীলীগ, জাতীয়তাবাদী দলকে নিয়েও আলোচনা করতে হয়। কারণ আওয়ামীলীগ- বিএনপিও কথায় কথায় জনগণ শব্দটি ব্যবহার করে। অথচ জনগণ শব্দটি একটি পরিবর্তনশীল শব্দ। জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তুলুন- এর মধ্যদিয়ে কিছুই বোঝা যায় না, যদি না জনগণ শব্দটিকে ব্যাখ্যা না করা হয়।

এককথায় বলা যায়, একটি পার্টি যদি কমিউনিস্ট পার্টির বৈশিষ্ট্য ধারণ না করে, তাহলে তাদের দ্বারা যে আন্দোলনই হোক না কেন, তা শ্রমিকশ্রেণীর স্বার্থের বদলে বুর্জোয়াশ্রেণীর স্বার্থকেই রক্ষা করবে।

যেহেতু বাংলাদেশে কোন কমিউনিস্ট পার্টি নেই, তাহলে এখানকার কমিউনিস্টদের ক্ষেত্রে যা করণীয়, তা হচ্ছে একটি কমিউনিস্ট পাটি গড়ে তোলা। যেমন লেনিন বলতেন ঃ “আসুন আমরা গড়ি প্রলেতারীয় কমিউনিস্ট পার্টি; বলশেভিকবাদের শ্রেষ্ঠ অনুগামীরা ইতোমধ্যে সেটার উপাদানগুলো সৃষ্টি করেছেন; আসুন আমরা আমাদের সদস্য শ্রেণীকে সমবেত করি প্রলেতারীয় শ্রেণীগত কাজকর্মের জন্য, তাহলে প্রলেতারিয়ানদের মধ্য থেকে,সবচেয়ে গরীব কৃষকদের মধ্য থেকে ক্রমেই আরো বেশি সংখ্যায় মানুষ আমাদের পক্ষে সারবন্দি হবে।” আমরা সকলেই বিভিন্ন সময়ে যেহেতু স্বীকার করেছি বাংলাদেশে কোন কমিউনিস্টপার্টি নেই, সেহেতু আসুন এই পার্টি গড়ে তোলার মতাদর্শীক সংগ্রাম শুরু করি। আসুন বিজ্ঞানের মত করে মার্কসবাদ-লেনিনবাদকে বুঝতে চেষ্টা করি। এবং সেই অনুসারে একটি কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার জন্য জোর কদমে এগিয়ে যাই। নইলে ষোল আনাই মিছে।


(লেখক এই বিষয়ে লিখিত সমালোচনা আশা করেন। যে কেউ সমালোচনা পাঠাতে পারেন: abirhasan1917@yahoo.com অথবা মিটন এন্টারপ্রাইজ, লালবাগ, রংপুর এই ঠিকানায়। ফোন: 01717-727148, 01191-133853, 01832-502733)

লেখাটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছে ডাকঘর, রংপুর। প্রাপ্তিস্থান: দেবদারু, চারুকলার সামনে বইয়ের দোকান, ঢাকা।

২টি মন্তব্য:

  1. লেনিন মার্কসের সাথে প্রতারণা করেছে । লেনিনবাদ সমাজতন্ত্রের বিকৃতি । In details: www.icwfreedom.org

    উত্তরমুছুন
  2. "বিপ্লব কী, বিপ্লবের স্তরগুলো কী কী, বিভিন্ন পরিস্থিতিতে জনগণ কারা, কমিউনিস্ট কারা, কমিউনিস্ট পার্টি কী, ক্ষমতা দখলের পথ ও পদ্ধতিসমূহ কী কী ইত্যাদি বিষয় স্বতঃসিদ্ধ গাণিতিক নিয়মের মতো প্রতিষ্ঠিত।"
    এ ধরণের যান্ত্রিক কথা আপনি কোথায়
    পেলেন?

    উত্তরমুছুন