আমাদের আন্দোলনের জ্বলন্ত প্রশ্ন


ভি. আই. লেনিন


আমাদের স্বপ্ন দেখা উচিত!” এই কথাগুলো আমি লিখলাম এবং হয়ে উঠলাম আতঙ্কিত। আমি মনে মনে কল্পনা করলাম, একটা “ঐক্য সম্মেলনে” বসে আছি আমি আর আমার উল্টো দিকে বসেছেন ‘রাবোচেয়ে দিয়েলো’র সম্পাদকবৃন্দ ও লেখকগণ। কমরেড মার্তিনভ উঠে দাঁড়ালেন, এবং আমার দিকে ফিরে, কঠোর ভাষায় বললেনঃ “আপনাকে জিজ্ঞেস করতে চাই, আগে পার্টি -কমিটিগুলোর মতামত না নিয়েই, কোন স্বায়ত্বশাসিত সম্পাদকমন্ডলীর স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে কি?” তারপর উঠলেন কমরেড ক্রিচেভ্স্কি (বহু আগেই কমরেড পেখানভকে প্রগাঢ়তা দান করেছিলেন যে-মার্তিনভ, তাঁকে দার্শনিক দিকে দিয়ে আরো গভীরতা দান করে), যিনি আরো কঠোরভাবে বললেন, “আমি আরো এগিয়ে যেতে চাই। আমি জিজ্ঞেস করতে চাই, স্বপ্ন
দেখার অধিকার কোনো মার্কসবাদীর আদৌ আছে কি, যখন সে জানে যে মার্কসের মতে মানবজাতি সবসময় এমন সব করণীয়ই নিজের জন্য নির্ধারিত করে যার সমাধান সে করতে পারে, রণকৌশল হল পার্টি -করণীয়গুলোর বৃদ্ধি-বিকাশেরই এক প্রক্রিয়া, যা পার্টির বিকাশের সাথে সাথে একত্রেই বৃদ্ধি পায়?”


এই সব রূঢ় প্রশ্নের কথা ভাবতেই আমার সারা গা হিম হয়ে আসে, আর কিছু নয় শুধু লুকোবার একটু জায়গা খুঁজে পাওয়ার জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠি আমি। পিসারেভের পেছনেই লুকোবার চেষ্টা করব আমি।
স্বপ্ন আর বাস্তবের মধ্যেকার ফারাক সম্পর্কে পিসারেভ লিখেছিলেনঃ “ফারাক আছে নানা ধরনের। ঘটনাবলীর স্বাভাবিক গতির আগে আগে চলতে পারে আমার স্বপ্ন, কিংবা ঘটনাবলীর স্বাভাবিক গতি যে দিক পানে কখনও এগিয়ে যাবে না সেই দিকেই হয়ত আমার স্বপড়ব ডানা মেলতে পারে তির্যকভাবে। প্রথমোক্ত ক্ষেত্রে আমার স্বপ্ন কোন অনিষ্ট ঘটাবে না; শ্রমজীবী মানুষের উদ্যমকে এমনকি সেটা পোষণ করতে ও বাড়িয়েও দিতে পারে…….. এ ধরনের স্বপ্নে শ্রমশক্তিকে বিকৃত বা অসাড় করার মতো কিছু নেই। পক্ষান্তরে, এইভাবে স্বপড়ব দেখবার ক্ষমতা থেকে মানুষ যদি পরিপূর্ণভাবে বঞ্চিত হয়, যদি সে মাঝে মাঝে অগ্রগামী হতে না পারে, এবং যে-সৃষ্টিকে তার হাত যথার্থই আকৃতি দান করতে কেবল শুরু করেছে তার একটা সামগ্রিক ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র যদি মনে মনে সে ধারণা করতে না পারে, তাহলে কলা, বিজ্ঞান ও ব্যবহারিক প্রচেষ্টার ক্ষেত্রে ব্যাপক ও শ্রমসাধ্য কাজ হাতে নেওয়া এবং সেটাকে সম্পূর্ণতা দান করায় প্রবৃত্ত করার মতো উদ্যম কোথায় থাকবে, তা আমি মোটেই কল্পনা করতে পারি না।……… স্বপড়ব আর বাস্তবের মধ্যেকার ফারাক কোন অনিষ্ট ঘটায় না, শুধু যে-ব্যক্তিটি স্বপ্ন দেখছে সে যদি গভীরভাবে বিশ্বাস করে তার স্বপ্নকে, যদি জীবনকে সে পর্যবেক্ষণ করে মনোযোগের সাথে, পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্যকে তুলনা করে দেখে তার শূণ্যে-নির্মিত সৌধের সথে, আর, সাধারণভাবে বলতে গেলে, তার আকাশ-কুসুম স্বপ্নগুলিকে বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য যদি কাজ করে নিষ্ঠার সাথে। স্বপ্ন ও জীবনের মধ্যে যদি কোন সম্পর্ক থাকে তাহলে সে তো অতি উত্তম।”১
দুর্ভাগ্যক্রমে, আমাদের আন্দোলনে এ ধরনের স্বপ্ন-চারণা অত্যন্ত বিরল। আর এর জন্যে সবচেয়ে বেশি দায়ী তারাই যারা বড়াই করে নিজেদের সংযত অভিমত নিয়ে, “মূতর্- নির্দিষ্ট বাস্তবের” সাথে তাদের “নিবিড় সম্পর্ক” নিয়ে, আইনী সমালোচনার আর বে-আইনী “ লেজুড়বৃত্তিরই” যারা প্রতিনিধি।

টীকা:

* Lenin on Art and literature. Page no-20
১. ডি.আই. পিসারেভের নিবন্ধ “অপরিপক্ক চিন্তার ভ্রান্তি” থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছেন লেনিন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন