নয়া-গণতন্ত্রের সংস্কৃতি


মাও সে তুঙ


একটি বিশেষ সংস্কৃতি হচ্ছে তৎকালীন সমাজের অর্থনীতি ও রাজনীতির ভাবাদর্শগত প্রতিফলন। চীনে একটি সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতি আছে, আর তা হচ্ছে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদী শাসনের বা তার আংশিক শাসনের প্রতিফলন। এই সংস্কৃতিটি কেবলমাত্র সাম্রাজ্যবাদীদের দ্বারা প্রত্যক্ষভাবে পরিচালিত সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলিই লালন করে না, উপরন্তু কিছু কিছু নির্লজ্জ চীনাদের দ্বারাও লালিত হয়ে থাকে। দাস সুলভ মতাদর্শের সব রকম সংস্কৃতিই এর আওতায় পড়ে। এ ছাড়া চীনে আধা-সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতিও আছে। আধা-সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতি ও রাজনীতি থেকেই এর উদ্ভব। যারা নতুন ভাবধারা ও নতুন সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কনফুসিয়াসের ভজনা, কনফুসীয় ধর্মগ্রন্থাদি, পুরনো বিধি-বিধান ও আচার-আচরণ এবং পুরনো ভাবধারা প্রভৃতির প্রচার করে ও মেনে চলার কথা বলে, তারা সবাই এই আধা-সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতির ধারক ও বাহক। সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতি ও আধা-সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতি হচ্ছে দুই ভাই; এর খুবই অন্তরঙ্গ। চীনের নতুন সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এই দুই সংস্কৃতি মৈত্রী স্থাপন করেছে। এই ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল সংস্কৃতি সাম্রাজ্যবাদী ও সামন্তবাদী স্বার্থবাহী। তাই এই সংস্কৃতিকে উচ্ছেদ করতেই হবে। যতক্ষণ পর্যন্ত এই সংস্কৃতির উচ্ছেদ সাধন করা না যাবে ততক্ষণ পর্যন্ত অন্য কোনো ধরনের নতুন সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। ধ্বংস ছাড়া কোনো গঠন কর্ম হয় না, বাধা না পেলে প্রবল জোয়ারের সৃষ্টি হয় না, বিরতি ছাড়া গতির অর্থ নেই; জীবন-মরণ সংগ্রামে উভয়ই আবদ্ধ।


নয়া সংস্কৃতি হচ্ছে নয়া রাজনীতি ও নয়া অর্থনীতির প্রতিফলন। এই সংস্কৃতি হলো এই রাজনীতি ও অর্থনীতির স্বার্থবাহী।
ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির উদ্ভবের কাল থেকে চীনা সমাজের চরিত্র ক্রমশ পরিবর্তিত হয়েছে। এ সমাজ আর এখন পুরাদস্তর সামন্ততান্ত্রিক সমাজ নয়, যদিও সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতিই এখনও প্রধান, তবুও এ সমাজ এখন আধা-সামন্ততান্ত্রিক। সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতির তুলনায় ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি নতুন। বুর্জোয়া, পেটিবুর্জোয়া ও শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক শক্তিও নতুন। নতুন ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির উদ্ভব ও প্রসারের সঙ্গে সঙ্গেই এদের উদ্ভব ও প্রসার হয়েছে। ভাবাদর্শ ক্ষেত্রে এই নতুন সংস্কৃতি এই নতুন রাজনীতি ও অর্থনীতিরই প্রতিফলন এবং এরই স্বার্থবাহী। ধনতান্ত্রিক অর্থনীতি ব্যতিরেকে, বুর্জোয়া, পেটিবুর্জোয়া, শ্রমিক শ্রেণী ব্যতিরেকে, এই সব শ্রেণীর রাজনৈতিক শক্তি ব্যতিরেকে নতুন ভাবাদর্শ বা নতুন সংস্কৃতির উদ্ভব হতে পারবে না।
এই নতুন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক শক্তি গুলোই বিপ্লবী শক্তি। এই শক্তি পুরনো অর্থনীতি, পুরনো রাজনীতি এবং পুরনো রাজনীতির বিরোধী। পুরনো সব কিছুই দুই অংশে বিভক্ত। একটি হচ্ছে চীনের নিজস্ব আধা-সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতি, আর অপরটি হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সংস্কৃতি। সাম্রাজ্যবাদী নেতৃত্বে এই দুইটি অংশ মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ। উভয় অংশ ন্যক্কারজনক, তাই এদের সম্পূর্ণ ধ্বংস সাধন প্রয়োজন। চীনা সমাজের পুরনো এবং নতুনের মধ্যে যে সংগ্রাম তা হচ্ছে জনগণের নতুন শক্তির (বিভিন্ন বিপ্লবী শ্রেণীর) সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদী ও সামন্তবাদী শক্তির সংগ্রাম। এ হচ্ছে বিপ্লব আর প্রতি বিপ্লবের মধ্যেকার সংগ্রাম। অহিফেন যুদ্ধের কাল থেকে হিসেব করলে এ সংগ্রাম চলছে বিগত একশো বছর ধরে; আর ১৯১১ সাল থেকে হিসেব করলে এ সংগ্রাম এসেছে প্রায় তিরিশ বছর ধরে।
আগেই বলা হয়েছে বিপ্লবকেও নতুন ও পুরনো এই দুই শ্রেণীভুক্ত করা যায়। একটি ঐতিহাসিক যুগে তা পুরনো হয়ে যায়। চীনের বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লবের এক শতাব্দীর ইতিহাসকে দুইটি প্রধান স্তরে ভাগ করা যায়। প্রথম স্তরটি আশি বছরের এবং দ্বিতীয় স্তরটি বিগত বিশ বছরের। প্রতিটি স্তরেরই নিজস্ব মৌলিক ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রথম আশি বছরের চীনা বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব হচ্ছে পুরনো ধরনের, আর আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় রাজনৈতিক অবস্থার পরিবর্তনের কারণে শেষ বিশ বছরের বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক বিপ্লব হচ্ছে নতুন ধরনের। প্রথম আশি বছরের বৈশিষ্ট্য ছিল পুরনো গণতন্ত্র, শেষ বিশ বছরের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে নয়া-গণতন্ত্র। সংস্কৃতি ও রাজনীতির ক্ষেত্রেও এই স্বাতন্ত্র্য বিদ্যমান।

(নয়া গণতন্ত্রের সংস্কৃতি লেখাটি মাও সে তুঙ রচনাবলী এর নয়া গণতন্ত্র থেকে সংগৃহীত)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন