সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের লক্ষ্য


বদরুদ্দীন উমর

সংস্কৃতির সংজ্ঞা বিভিন্ন লোকে, বিশেষতঃ বিভিন্ন শ্রেণীর লোকে, ভিন্ন ভিন্নভাবে দিতে পারেন এবং দিয়ে থাকেন। অর্থাৎ সংস্কৃতি বলতে কে কি বোঝাতে চান তার মধ্যে পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে একটি বিষয়ে কোন মতবেদের অবকাশ নেই, এবং সে বিষয়টি হলো এই যে সংস্কৃতি বলতে যা কিছুই বোঝানো হোক সেটা কোন ব্যক্তিগত ব্যাপার নয়, কোন নিছক ব্যক্তিগত ব্যাপার সেটা হতে পারে না। কারণ সংস্কৃতিতে কোন না কোন সমাজের নিজস্ব গঠন চরিত্রের প্রতিফলন ব্যতিত অন্য কিছু নয়।

সংস্কৃতি বলতে যদি সঙ্গীত চর্চা, সাহিত্য চর্চা, অথবা যে কোন ধরনের শিল্প চর্চা বোঝায়, যদি তার দ্বারা কোন বিশেষ ব্যক্তি, গোষ্ঠী, শ্রেণী প্রভৃতির আচর-আচরণ, জীবন-যাপন প্রণালী বোঝায় তাহলে দেখা যাবে যে প্রত্যেক ক্ষেত্রেই সেই সংস্কৃতির একটি বিশেষ চরিত্র আছে। এবং এই চরিত্রের ভিত্তি হচ্ছে মূলতঃ সামাজিক। তাই কোন বিশেষ সমাজকে বাদ দিয়ে কোন ধরনের বিশেষ সংস্কৃতির চিন্তা করা অথবা বলা সম্পূর্ণ অবাস্তব এবং অবৈজ্ঞানিক।

ইতিহাসে মানবিক কর্মকান্ডের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন অনেক ব্যক্তির আবির্ভাব প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত দেখা গেছে যাদেরকে আপাতঃদষ্টিতে মনে হয় ব্যক্তিগতভাবে এত প্রতিভা সম্পন্ন, গড়পড়তা লোকের এত বেশী উচ্চে, যে তারা যে সমাজে বসবাস করেছেন অথবা করেন সে সমাজের থেকে তাদের উদ্ভব নয়, তারা যেন স্থান কাল উভয়েরই উর্দ্ধে। এ্যারিস্টটল, প্লেটো, কান্ট, হেগেল, মার্কসের মতো দার্শনিক ও চিন্তাবিদ; কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, নিউটন, আইনস্টাইন প্রভৃতি বৈজ্ঞানিক; হোমার, শেক্সপিয়ার, গ্যেটে, টলস্টয়, রবীন্দ্রনাথ প্রভৃতির মতো কবি সাহিত্যিক রাফেল, মাইকেল এঞ্জেলো, লেনার্দো দা ভিঞ্চি প্রভৃতির মতো কবি শিল্পী; আলেকজান্ডার, জুলিয়াস সীজার, নেপোলিয়ান, হিটলার, লেনিন প্রভৃতি ইতিহাসের একেকজন নায়ক সম্পর্কে এই ধরনের ধারনা অনেকেই পোষণ করে থাকেন। তারা যে এই ধারণা অনেকে পোষণ করেন তার অভিব্যক্তি তাদের এই চিন্তার মধ্যে দেখা যায় যে, বিশেষ পর্যায়ে অমুক ব্যক্তির আবির্ভাব না ঘটলে তমুক কাজটি সম্ভব হতো না। অর্থাৎ ব্যক্তির ভূমিকা এ ক্ষেত্রে এমন যা তার সামাজিক অবস্থান দ্বারা ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। এর অপর একটি অর্থ দাঁড়ায় এই যে, ঐ ধরনের কোন বিশেষ ব্যক্তির আবির্ভাব ইতিহাসে না ঘটলে তিনি যে কীর্তি মানব সমাজে রেখে গেলে সে কীর্তি তার অবর্তমানে অন্য কারো দ্বারা অর্জন করা সম্ভব হতো না এবং সে ক্ষেত্রে একটা শূন্যতা চিরদিনের জন্য বিদ্যমান থাকতো।

আসলে চিন্তা- চেতনা, সাহিত্য ও শিল্প সাধনা, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, সমাজ পরিবর্তন ইত্যাদির ক্ষেত্রে ব্যক্তি হিসেবে যারা ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখে থাকেন তারা নিজেরাও নিজেদের সমসাময়িক ইতিহাসেরই সৃষ্টি। কাজেই ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা যদি আমরা অনুধাবন করি তাহলে দেখা যাবে যে, ব্যক্তি ইতিহাসের গতিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অল্প বিস্তর প্রভাবিত করতে সক্ষম হলেও কোন ব্যক্তিরই অবস্থান কৃতিত্বকে তার নিজের সমাজের এবং নিজের ঐতিহাসিক কালপর্বের উর্দ্ধে মনে করা একেবারে ভুল।

সংস্কৃতি সমাজ থেকেই উদ্ভুত হওয়ার কারণে দেখা যায় যে, বিশেষ বিশেষ সমাজের বিশেষ বিশেষ ঐতিহাসিক পর্যায়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মধারা ও কর্মতৎপরতা দেখা যায় তাদের মধ্যে একটা পারস্পরিক সম্পর্ক থাকে। ভারতে যখন বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব যথেষ্ট সে সময়ে জাতকের ব্যিাত কাহিনী এবং অজন্তা ইলোরার চিত্রকর্মের সম্পর্ক এ কারণেই খুব ঘনিষ্ঠ। ভারতীয় ও ইউরোপীয় সমাজের বিন্যাসের পার্থক্যের কারণে ভারতীয় সঙ্গীত, চিত্রশিল্প ইত্যাদিতে যে সব বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় ইউরোপীয় ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে সেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, বাণিজ্যের প্রসার, ভাষার বিকাশ, ধর্মীয় আন্দোলন, রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তা ইত্যাদি এক পারস্পরিক যোগসূত্রে গ্রথিত। কাজেই শুধু ব্যক্তিই নয়, সমাজের জনগণের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে সব কাজকমে জড়িত থাকেন সেগুলি পরস্পর বিচ্ছিন্ন নয়। বিশেষ ঐতিহাসিক পর্যায়ে বিশেষ বিশেষ সমাজের অন্তর্নিহিত তাগিদগুলি সমাজের অবস্থানকারী জনগণের মধ্যে অনেক বৈচিত্র সহ নিজেদেরকে ব্যক্ত করে। সে সময়ে কিছু কিছু ব্যক্তি সেই সব তাগিদের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হন। এই ব্যক্তিদের ভূমিকাই ইতিহাসে বিরাট ব্যতিক্রমী ভূমিকা হিসেবে দেখার চেষ্টা অনেকেই করে থাকেন। যারা এ কাজ করেন তাদের চিন্তা যে অবাস্তব এবং ভুল সে কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যক্তি বিশেষের কীর্তি যে চূড়ান্ত বিশ্লেষণে সামাজিক তাগিদেরই প্রতিফলন একথা সত্য। কিন্তু সমাজ বলতে কি বোঝায়? সমাজ বলতে কি এমন এক যৌথ জীবন বোঝায় যেখানে বড় ধরনের কোন পার্থক্য নেই, কোন বৈষম্য নেই, কোন দ্বন্দ্ব বিরোধিতা নেই? মানব ইতিহাসের প্রারম্ভিক আদিমতম পর্যায়ে মানুষে সে ধরনের একটা যৌথ জীবনের মোটামুটি ধারণা ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া গেলেও পরবর্তী পর্যায়ে মানব সমাজে গুরুতর ভেদাভেদের সৃষ্টি হয় এবং এই ভেদাভেদের মধ্যে সর্ব প্রধান হয় শ্রেণী বিভেদ। বিশেষ কতকগুলি ঐতিহাসিক কারণে সমাজে দেখা দেয় ব্যক্তিগত সম্পত্তি যা রচনা করে এই শ্রেণীভেদের ভিত্তি। এই শ্রেণীভেদ অনুযায়ী সমাজ বিভক্ত হয় দুটি মূল অংশে যার একটি হলো, শোষক ও নির্যাতক এবং অপরটি হলো শোষিত ও নির্যাতিত। ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে অবলম্বন করে গঠিত হয় পরিবার, গঠিত হয় রাষ্ট্র এবং মানব জীবন প্রবাহে দেখা দেয় অনেক নোতুন ধরনের দ্বন্দ্ব সংঘর্ষ।

এই শ্রেণী বিভক্ত সমাজ ইতিহাসের কোন বিন্দুতে স্থির থাকে না। তার মধ্যে যে সকল পরিমাণগত আভ্যন্তরীন পরিবর্তন সংগঠিত হতে থাকে তার পরিণামে সমাজের মধ্যে ঘটে এক ধরনের গুনগত পরিবর্তন। ব্যক্তি সম্পত্তি ভিত্তিক শ্রেণী বিভক্ত সমাজে এই গুণগত পরিবর্তনের অর্থ দাঁড়ায় সম্পত্তি মালিকানার ধরনের মধ্যে পরিবর্তন, ব্যক্তি সম্পত্তির অবসান নয়। ইতিহাসে এই ধরনের গুণগত পরিবর্তনের ফলে আবির্ভাব ঘটে দাস প্রথার পর সামন্ত প্রথার এবং সামন্ত প্রথার পর পুঁজিবাদী প্রথার। এই পুঁজিবাদী প্রথাই মানব ইতিহাসে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের সর্বশেষ প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়। এই পর্যায়ের পর আবির্ভাব ঘটে সমাজতান্ত্রিক সমাজের, যে সমাজের লক্ষ্য হয় সম্পত্তির ব্যক্তি মালিকানার উচ্ছেদ ও সাম্যবাদের প্রতিষ্ঠা।

সংস্কৃতি আলোচনা প্রসঙ্গে সমাজ ও শ্রেণী সম্পর্কে উপরোক্ত কথাগুলি বলার দরকার হলো এ জন্যেই যে, সংস্কৃতি সম্পর্কে কোন আলোচনা যেমন সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নভাবে করা চলে না তেমনি তাকে বিচ্ছিন্ন করা চলে না শ্রেণী থেকেও। কাজেই যে কোন সংস্কৃতির এবং সেই সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্বকারী এক অথবা একাধিক ব্যক্তির সাংস্কৃতিক চরিত্র শ্রেণী নিরপেক্ষ নয় এবং তা হতে পারে না।

মানব ইতিহাসে সংস্কৃতি চর্চার শুরু এমন এক পর্যায়ে যখন সে উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তন সৃষ্টি করে সৃষ্টি করেছে অবসর। আহার নিদ্রা মৈথুনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ব্যয় করে অতিরিক্ত সময় হাতে না আসা পর্যন্ত সংস্কৃতি চর্চার-শিল্প, সঙ্গীত, সাহিত্য চর্চার- যে কোন প্রশ্ন উঠতে পারে না সেকথা বলাই বাহুল্য।

এবার দেখা দরকার এই অবসরের অধিকারী হলো কারা? এ অধিকারী হলো তারাই, সেই শ্রেণীর লোকেরাই, যারা হলো সম্পত্তির মালিক। কাজেই মানব ইতিহাসে সংস্কৃতির সর্বোচ্চ ধারক ও বাহক যে ব্যক্তি সম্পত্তির মালিকরাই হবে সেটা স্বাভাবিক। সংস্কৃতি চর্চাকে এখানে খুব সংকীর্ণ অর্থে বুঝলে অথবা ধরে নিলে ভুল হবে। এই সংস্কৃতি চর্চা বলতে বোঝায় অর্থনৈতিক উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে শিল্প সাহিত্য, সঙ্গীত সাধনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা সমস্ত কিছুই।

শ্রেণী বিভক্ত সমাজে সম্পত্তিশালী শ্রেণী নিজের শোষণ স্বার্থেই সংস্কৃতিকে গড়ে তোলে, গড়ে তোলে নিজের জীবন যাপন ও জীবন উপভোগের বিশাল ব্যবস্থা। এ কাজ করতে গিয়ে তাদেরকে অবশ্যম্ভাবীরূপে এমন কতকগুলি কাজ করতে হয় যে কাজগুলি একদিকে সম্পত্তিশালী শ্রেণী হিসেবে তার নিজের অবস্থানের মধ্যে ভাঙন সৃষ্টি করে এবং অন্যদিকে ঘটায় সামাজিক অগ্রগতি। এই অগ্রগতির মূল ধারা নির্ধারিত হয় উৎপাদন শক্তি এবং উৎপাদন সম্পর্কের মধ্যে পরিবর্তনের দ্বারা।

সমাজের অল্প সংখ্যক বা সংখ্যালঘু অবসরভোগী সম্পত্তি মালিকরা যে কোন শ্রেণী বিভক্ত সমাজের সাংস্কৃতিক জীবনের উচ্চতম শিখরগুলি সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ করলেও তাদের দ্বারা সৃষ্ট সংস্কৃতির মধ্যেই সমাজের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক চিত্রের পরিচয় পাওয়া যায় না। তার জন্য তাকাতে হয় উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত শ্রমজীবী জনগণের জীবনের দিক। এই জনগণের অবসর এবং সুযোগ-সুবিধা অন্যদের তুলনায় অনেক থাকলেও যেহেতু যেহেতু তারা উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেহেতু তাদের শ্রমের দ্বারাই সৃষ্টি হয় সম্পদ এবং সম্পত্তি এবং যেহেতু তাদেরও একটি সমষ্টিগত অর্থাৎ সামাজিক জীবন আছে সেজন্য তাদেরও আছে এক ধরনের সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতির মান শোষক শ্রেণীর সংস্কৃতির মানের থেকে অনেক নিম্ন। কিন্তু নিম্ন হলেও তার একটি নিজস্বতা আছে, একটি অন্তর্নিহিত শক্তি আছে যে শক্তি নিয়ে তারা নিজেদের শ্রেণীস্বার্থ রক্ষার্থে শোষকশ্রেণীর মুখোমুখি হন, তাদের মোকাবেলা করেন।

এই সংখ্যাগরিষ্ঠ শোষিত ও নির্যাতিত মানুষদের সংস্কৃতির মান শ্রেণী বিভক্ত সমাজে অন্যদের থেকে নিচুস্তরের হলেও শ্রেণী বিভক্ত সমাজের মধ্যে কাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তাদের সাংস্কৃতিক চিন্তা চেতনার মান বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং নিজেদের সেই চেতনার উপর দাঁড়িয়ে শিল্প সাহিত্য এবং সাধারণভাবে সংস্কৃতির অন্যান্য মাধ্যমের সাহায্যে তারা শোষক শ্রেণীর শোষক শ্রেণীর মুখোমুখি হন। সংস্কৃতি ক্ষেত্রে তাদের এই মুখোমুখি অবস্থান শোষক শ্রেণীর সঙ্গে তাদের শ্রেণী সংগ্রামের থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। উপরন্তু তাদের এই সাংস্কৃতিক সংগ্রাম সাধারণভাবে তাদের শ্রেণী সংগ্রামেরই একটি বিশেষ রূপ্

শোষক শ্রেণীর সংস্কৃতি চর্চার, তাদের কীর্তিমান শিল্প সাহিত্যিকদের শিল্প সাহিত্য চর্চার নির্দিষ্ট শ্রেণী চরিত্র থাকলেও তারা সব সময়ই সেই শ্রেণী চরিত্রকে আড়াল করে শিল্প সাহিত্যকে সমাজ বিচ্ছিন্ন, রাজনীতি বিচ্ছিন্ন হিসাবে তত্ত্বগতভাবে এবং অবিশ্রান্ত প্রচারের মাধ্যমে সকলের সামনে উপস্থিত করে থাকেন। কিন্তু যখনই শোষিত শ্রেণীর লোকেরা অথবা তার পক্ষভূক্ত লোকেরা শোষিত শ্রেণীর অবস্থান থেকে সংস্কৃতি চর্চা, শিল্প সাহিত্য, সঙ্গীত চর্চা করতে নিযুক্ত হন তখনই শোষক শ্রেণীর পক্ষ থেকে বলা হয় যে, সেই ধরনের সংস্কৃতি চর্চা কোন সত্যিকার সংস্কৃতি চর্চা নয়, তা হলো সংস্কৃতি চর্চার নামে শিল্প সাহিত্য সঙ্গীতের অবমূল্যায়ন মাত্র। সংস্কৃতি চর্চার নামে সেই ধরনের কর্মকান্ড রাজনৈতিক প্রচার ধর্মী এবং সে কারণেই তা কখনো সৃষ্টিশীল শিল্প সাহিত্য সঙ্গীতের জন্ম দিতে পারে না।

শোষক শ্রেণীর পক্ষে তার বিপরীত শ্রেণীর সংস্কৃতি চর্চার বিরোধিতা এভাবে তার পক্ষে খুব স্বাভাবিক। কারণ শোষিত শ্রেণীর সংস্কৃতি চর্চা শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে তার রাজনৈতিক সংগ্রামের এমন এক অতি শক্তিশালী হাতিয়ার যে হাতিয়ার ব্যতিরেকে সংগ্রামে জয়যুক্ত হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। সংস্কৃতি বলতে শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত ইত্যাদি যাই বোঝানো হোক, প্রত্যেকটি ক্ষেত্রেই তা একেকটি তত্ত্বের দ্বারা কাঠামোগতভাবে সীমিত থাকে। শোষক শ্রেণী যে সংস্কৃতি চর্চা করে তারও একটা নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক কাঠামো থাকে এবং একইভাবে শোষিত শ্রেণীরও থাকে সংস্কৃতি চর্চার একটি নির্দিষ্ট তাত্ত্বিক কাঠামো। এই তাত্ত্বিক কাঠামো ইতিহাসের নিম্নতর পর্যায়ে খুবই অস্পষ্ট থাকে। কিন্তু ইতিহাসের গতিপথে শ্রেণীবিভক্ত সমাজ একের পর এক মূল পর্যায় অতিক্রম করার সঙ্গে সঙ্গে তা স্পষ্টতর হতে থাকে। এই তত্ত্বের রূপ সব থেকে স্পষ্ট আকার ধারণ করে যখন শ্রেণী বিভক্ত সমাজ উপনীত হয় তার সর্বশেষ পর্যায়ে অর্থাৎ পুঁজিবাদী পর্যায়ে এবং শোষিত শ্রেণী প্রস্তুত হতে থাকে শোষণমূলক সমাজ উচ্ছেদের জন্য, যখন তারা নিযুক্ত থাকে শ্রেণী সংগ্রামকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্যে। এই পর্যায়ে তত্ত্ব নির্মাণই হয়ে দাঁড়ায় শোষিত শ্রেণীর সর্বশেষ বা চূড়ান্ত সংগ্রামের এমন এক শর্ত যে শর্ত পূরণ না হলে শ্রেণী সংগ্রামকে সঠিকভবে দাঁড় করানো, সঠিক পথে পরিচালনা করা এবং সেই সংগ্রামের মাধ্যমে শোষক শ্রেণী উচ্ছেদের লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয় না। লেনিনের বিখ্যাত উক্তি, “বিপ্লবী তত্ত্ব ব্যতীত কোন বিপ্লবী আন্দোলন হতে পারে না” এ কারণেই শ্রমিক শ্রেণীর বিপ্লবী আন্দোলনের ক্ষেত্রে এত তাৎপর্যপূর্ণ।

লেনিন কথিত এই তত্ত্ব যদি অনুপস্থিত থাকে তাহলে শুধু যে সঠিক রাজনৈতিক সংগ্রামই শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষে অসম্ভব হয় তাই নয়, সেই রাজনৈতিক সংগ্রামের সহায়ক শক্তি হিসেবে একটি সঠিক তাত্ত্বিক কাঠামোর অন্তর্গতভাবে শ্রমিক শ্রেণীর পক্ষে শিল্প সাহিত্য ও সঙ্গীত চর্চাও সম্ভব হয় না। এই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে বলা চলে যে, শ্রমিক শ্রেণীর রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং সাংস্কৃতিক সংগ্রাম উভয়েরই নিশ্চিত ভিত্তি রচিত হয় তত্ত্বের দ্বারা এবং এই তত্ত্ব রচনাই তাদের সংস্কৃতি চর্চা ও সংস্কৃতি সাধনার ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামের সর্বোচ্চ রূপ।

শ্রমিক শ্রেণী সম্পত্তি মালিক পূঁজিবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে মানুষের সামাজিক জীবনকে শোষণমুক্ত করতে, তার জীবন থেকে সম্পত্তি মালিকানা সৃষ্ট সকল প্রকার কুৎসিত সম্পর্ক উচ্ছেদ করতে এবং এ সবের মাধ্যমে জীবনকে সৌন্দর্যমন্ডিত করতে।

সাহিত্য সংগীত চিত্রকলা ইত্যাদি সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও সংস্কৃতির মূল চরিত্রটি ধরা পড়ে মানুষের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গীর মধ্যে, মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও আচার-আচরণের মধ্যে। মানুষ যে সৌন্দর্য সাধনা করে তার অভিব্যক্তি ঘটে তার শিল্প সাহিত্য সংগীত ইত্যাদির মধ্যে। কিন্তু সেই অভিব্যক্তির সর্বোচ্চ রূপ হলো সুন্দর জীবন। সুন্দর জীবনের চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই। এজন্য সুন্দর জীবন সৃষ্টিই সংস্কৃতির সর্বোচ্চ লক্ষ্য।

এই লক্ষ্য অর্জন রাজনৈতিক চেতনা, রাজনৈতিক চিন্তাধারা এবং রাজনৈতিক সংগ্রাম ব্যতীত সম্ভব নয়। রাজনীতির সঙ্গে সংস্কৃতির এই সম্পর্ক অবিচ্ছিন্ন এবং ওতপ্রোত হলেও সাধারণ সময়ে এই সম্পর্ক খোলাখুলিভাবে চোখের সামনে ধরা পড়ে না। সেটা ধরে পড়ে সমাজের এক এক সংকট মূহুর্তে, ক্রান্তিকালে, এক চরিত্র থেকে অন্য চরিত্রে পরিবর্তিত হওয়ার অথবা উত্তরণের সময়। এক কথায় বলা চলে বিপ্লবী পরিস্থিতিতে।

আমাদের এই বাংলাদেশেও আজ সেই বিপ্লবী পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এজন্য এখানে সংস্কৃতির মূল চরিত্র এখন খুব স্পষ্টভাবেই রাজনৈতিক। এবং ঠিক এ কারণেই আজকের বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংগ্রামের সঙ্গে সংস্কৃতি চর্চা বা সংস্কৃতিক সংগ্রাম একেবারে অবিচ্ছিন্ন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন