ভস্মস্তূপ থেকে ভেসে আসা কন্ঠস্বর

কাদের মোরাদি
যে দিকেই তাকাই না কেন, আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে লোকটির মুখ। আমার মনে হয়, রাস্তায় কিংবা বাজারে, এমনকি সব জায়গাতেই, সে আমাকে অনুসরণ করছে। যখন রাস্তায় পথচলা মানুষের দিকে তাকাই, তখন আমি শুধু তাকেই খুঁজি। লোকটি কাঠের ক্রাচের উপর ভর করে হাঁটে, কেননা তার পা হাঁটুর উপর থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। পরনে ময়লা সাদা পোশাক। পোশাকের গায়ে রক্তের শুকনো কালশিটে দাগ। মাথার পাগড়িটা গলার চারপাশে গোল করে পেঁচানো।
এই অদ্ভুত এবং ভয়ার্ত লোকটি আমাকে কিছুতেই একা থাকতে দেবে না, এমনকি রাতের বেলা ঘুমের মধ্যেও নয়। সব জায়গাতেই সে আমার সঙ্গে থাকে। আমি অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু তার হাত থেকে নিস্কৃতি পাইনি। সে আমার সঙ্গ ছাড়ে না, বরং আমার সঙ্গে সব সময় কথা বলে। আমাকে শান্তিতে থাকতে দেবে না। সে আমার কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিসিয়ে একটা কিছু বললো, যা অর্থহীন এবং পুনরাবৃত্তি।
ভাবলাম লোকটিকে খুঁজে বের করবো এবং কথা বলবো। প্রয়োজনে তাকে অনুরোধ করবো যেন সে আমাকে একা থাকতে দেয়। তাকে বলতে চাই, আমি নিষ্পাপ। আমি এমন কোন অন্যায় কাজ করিনি, যার জন্য আমাকে অপরাধী হতে হবে। কিন্তু কোথাও তাকে খুঁজে পাইনি।
বাজারের কাঠ বিক্রির দোকানে প্রথম তাকে দেখেছি এবং সে রাতেই আমি তাকে আমার ঘরের ভেতর দেখি। তার কাছ থেকে আমি দৌড়ে পালিয়ে যাই। আমাদের আর দেখা হয়নি। হয়তো পরে আমি তাকে আরেকবার দেখেছি।
সে রাতে এক মহিলার চিৎকারে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। তখন মধ্যরাত। অনিচ্ছা সত্তেও আমি বিছানা থেকে উঠি। ঘরটা অন্ধকারাচ্ছন্ন। বাতির সুইচ খুঁজে পেতে বেশ কসরত করি। সুইচ খুঁজে পাওয়ার আগেই রাতের আঁধার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে গুলির আওয়াজ এবং সঙ্গে রাতের নিস্তব্ধতাকে বিদীর্ণ করে ছড়িয়ে পড়ে সেই মহিলার আর্ত চিৎকার। সুইচ খুঁজে আমি বাতি জ্বালাতে চাইলাম।কেননা আমি দারুণ ভয় পেয়েছি। হয়তো রাস্তায় কেউ কাউকে গুলি করে মেরেছে। কিন্তু বাতির সুইচের কি হলো? ঘরের ভেতর কাঠের হিটার জ্বালানো। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। হিটারের দিকে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। ভয়ে আমার সমস্ত শরীর কাঁপতে থাকে। কিভাবে হিটার নিজে নিজেই জ্বলেছে? অনেকদিন ধরেই আমি একা। হিটার দেখলেই আমার মেজাজ গরম হয়। যদিও আমার ঘরটা ঠাণ্ডা, তবুও আমি হিটার জ্বালাই না।
ভয়ার্ত দৃষ্টিতে আমি হিটারের জ্বলন্ত শিখার দিকে তাকাই। আসলে আমি জেগে আছি কিনা, সেটা পরখ করার জন্য কয়েকবার চোখ দু’টোকে রগড়ে নিলাম। কিন্তু সত্যি আমি জেগে আছি এবং ঘরের ভেতর হিটার জ্বলছে। হিটারের ছোট ছোট ছিদ্র দিয়ে আগুনের শিখার প্রতিবিম্ব এসে পড়েছে কার্পেটের উপর। ভেতরে জ্বলন্ত কাঠ ভাঙ্গার মড়মড় শব্দ হচ্ছিল।
সে সময় আমার বুকের ধুকপুকানি আর শরীরের কাঁপুনি বেড়ে যায়। তবুও আমি আলোটা জ্বালাতে চাইলাম। আর তখনই লোকটির কণ্ঠস্বর আমাকে চমকে দেয়।
‘ভয় পেয়ো না ... ভয় পেয়ো না।’
ভয়ে চট জলদি আমি হিটারের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাই। নিজের চোখকে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আগন্তুক আমার ঘরের ভেতরেই এবং হিটারের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়ে আমি লাফিয়ে উঠি এবং প্রায় চিৎকারের মতো করে জিজ্ঞেস করি, ‘আপনি কে?’
লোকটির গলার চারপাশে গোল করে পাগড়ি পেঁচানো। সে নরম কন্ঠে বললো, ‘ভয় পেয়ো না।’
লোকটি পঙ্গু। পা নেই। তার পা হাঁটুর উপর থেকে কেটে ফেলা হয়েছে। কাঠের ক্রাচে ভর করে সে দাঁড়িয়ে আছে। আমি ভেবে পেলাম না আমার কি করা উচিত। সে হয়তো আমাকে খুন করতে চায়। আমি পালিয়ে যাওয়ার কথা ভাবলাম। কিন্তু লোকটি আমাকে রীতিমত হতবাক করে দেয়। সে কাঁদছে।সুইচ খুঁজে পেয়ে আমি বাতি জ্বালাই এবং তার দিকে তাকালাম। লোকটির মুখ পরিচিত বলে মনে হলো। আগে হয়তো তাকে কোথাও দেখেছি। কিন্তু কোথায় তাকে দেখেছি, কিছুতেই মনে করতে পারছি না।
তৎক্ষণাৎ আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে আপনি?’
লোকটি হয়তো বিপজ্জনক কেউ নয়। হয়তো সে বিপদে পড়ে আমার এখানে এসেছে।
সে কাঁদছে। তাই আমার কোন প্রশ্নের জবাব দেয়নি। তার পরনের পোশাক সাদা, কিন্তু ময়লা এবং সেখানে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ লেগে আছে। হিটারের পাশ থেকে এক টুকরো কাঠ তুলে সে ওটার দিকে তাকিয়ে কাঁদতে থাকে। তার গাল বেয়ে নেমে আসে অশ্রুধারা। তাকে কাঁদতে দেখে আমার ভয় কেটে যায়। আমি তাকে চিনতে পারি। সে সেই লোক, যাকে আমি কাঠ বিক্রির দোকানে দেখেছি। আমার মাথা ঘুরতে থাকে। পুনরায় ভয় আমাকে চেপে ধরে। যেদিন আমি দোকান থেকে কাঠ কিনেছিলাম, সেদিন লোকটি দূর থেকে আমাকে লক্ষ্য করেছিল। আমার মনে হয়েছিল, হয়তো অন্য কারোর সঙ্গে সে আমাকে গুলিয়ে ফেলেছে। সম্ভবত সে আমাকে খুন করতে চায়। আমি তাকে বলতে চাই, আসলে সে অন্য কারোর সঙ্গে আমাকে গুলিয়ে ফেলেছে।
কিন্তু লোকটি অনবরত কাঁদছে। একসময় হাতের কাঠ দেখিয়ে বললো, ‘তুমি কি জানো, এই কাঠ আমাদের বাড়ির জানালার?’
প্রশ্নটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে কেন জানি আমার মনে হলো, লোকটি কাঠের টুকরো দিয়ে আমার মাথায় আঘাত করলো। কাঠ নাকি তার বাড়ির জানালার। এখন আমি বুঝে গেছি, আসলে লোকটি কি বলতে চায়। প্রতিশোধ নেয়ার জন্যই সে এখানে এসেছে। কয়েকটা কাঠের টুকরো এখন আমার হিটারের ভেতর জ্বলছে। আমি এক দারুণ বিপদের মধ্যে আছি। কোনভাবেই পালিয়ে যাবার পথ দেখতে পাচ্ছি না। তার কান্না দেখার জন্য আমার মনোনিবেশ করার কোন প্রয়োজন নেই। হয়তো সে একটা পাগল। পাগলের কোন হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। এটা আমার কাছে স্পষ্ট যে, সে ওই কাঠ দিয়েই আমার মাথায় আঘাত করে আমাকে মেরে ফেলবে। তবুও ভীতসন্ত্রস্ত গলায় বললাম, ‘কিন্তু আমি তো দোকান থেকে কাঠ কিনে এনেছি।’
আমার কথা শুনে লোকটি হাসলো। এমন জোড়ে শব্দ করে হাসলো, মনে হলো সে যেন রীতিমতো একটা পাগল। তারপর সে চিৎকার করে উঠলো, ‘আমি জানি, তুমি কিনে এনেছো। কিন্তু তুমি কি জানো, এই কাঠ আমার বাড়ির?’
বলেই লোকটি পুনরায় কাঁদতে শুরু করে। জামার আস্তিনে চোখের পানি মোছে। হিটারের সামনে থেকে আরেকটা কাঠ তুলে নিয়ে সে চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘হায় আল্লাহ্, হায় মা’বুদ, আমার বাড়ি ... আমার ছেলের বইয়ের সেল্ফ ... আমার ছয় বছরের মেয়ের রক্তের দাগ শুকিয়ে গেছে এই কাঠে। হায় আল্লাহ্ ... আমাদের ঘরের কি হলো। তুমি জানো না, আমরা বুলেটের এক পশলা বৃষ্টির মধ্যে ছিলাম। চোখের পলকেই আমার পরিবার হারিয়ে গেল। আমি জানি না, মাটি কি দু’ভাগ করে তাদেরকে অতলে টেনে নিয়েছে, নাকি তারা দূর আকাশে কোথাও উড়ে গেছে। তবে তারা কেউ বাড়িতে নেই। সব জায়গায় আমি খুঁজেছি ... আমার স্ত্রী, ছোট্ট মেয়ে, আমার ছেলে, আমার পা দু’টো, এমনকি ঘর, সেল্ফ এবং দরোজা। তুমি জানো না, ওগুলো কোথায়? হুম? না, তুমি জানো না। তুমি শুধু কাঠ জ্বালিয়ে ঘর গরম করতে জানো। আহা, ওরা কি রকম উষ্ণতা এনে দিয়েছে তোমার ঘরে।’
প্রায় হড়হড় করে কথাগুলো বলেই লোকটি হাসিতে ফেটে পড়ে। ভয়ানক অট্টহাসি। আমি জানি, লোকটি কাণ্ডজ্ঞানহীন নয়। তার কথাবার্তাও অসংলগ্ন নয়। তবে তার কণ্ঠস্বরে হাসি আর কান্না এবং একধরনের ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। পুনরায় আমি বললাম, ‘আমি তো এই কাঠ কিনে এনেছি।’
বলেই আমি দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। আমার ভয় হচ্ছিল, লোকটির সঙ্গে হয়তো কোন আগ্নেয়াস্ত্র বা ছুরি থাকতে পারে। আমি তার হাসি এবং কান্নার শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলাম। আমি এক মুহূর্তও অপেক্ষা করিনি। এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তায় দাঁড়াই। একটা পাথরের সঙ্গে আমার পায়ের ধাক্কা লাগে। আমি রাস্তায় ভস্মস্তুপের তাপ টের পেলাম।
আমার কানের ভেতর লোকটির কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম। ভস্মস্তুপের ভেতর থেকে কন্ঠস্বর ভেসে আসছে। চিৎকার করে বলছে, ‘পালা, পালা, জ্বালা, জ্বালা, জ্বালা।’
তাড়াতাড়ি আমি উঠে দাঁড়াই এবং দৌড়াতে শুরু করি। ক্রাচে ভর করে লোকটি আমাকে অনুসরণ করে। আমি প্রাণপনে দৌড়াতে থাকি, কিন্তু লোকটির কন্ঠস্বরও আমার সঙ্গে দৌড়াতে থাকে এবং আমার কানের ভেতর অনুরণন হতে থাকে। এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যে, মনে হয় পঙ্গু লোকটি আমার মস্তিস্কের ভেতর এবং কানের ফুটোয় বসে থেকে আমার সঙ্গে কথা বলছে। কখনো সে কাঁদছে, আবার কখনো হাসছে। তবে সে প্রচণ্ড রাগান্বিত। বারবার সে সজোরে চিৎকার করছে।
‘কি অদ্ভুত এক পৃথিবীতে আমরা বাস করছি! কাঠ কাটার জন্য বাবা-মায়েরা তাদের ছেলেমেয়েদের হাতে তুলে দেয় কুড়াল। যুদ্ধে বিধ্বস্ত বাড়ি-ঘরের দরোজা-জানালার কাঠ দেদারছে বিক্রি হচ্ছে দোকানে। তুমি তা জানো না। তুমি শুধু দোকান থেকে কাঠ কিনে এনে ঘর গরম করতে জানো। দোকানে ভাঙ্গা দরোজা-জানালা পাল্লায় তুলে ওজন করে বিক্রি করা হয়। আর সবাই তা কিনে। যদিও অনেকের বাড়ি-ঘরের দরোজা-জানালা, এমনকি ছবির কাঠের ফ্রেম, বোমার আঘাতে পুড়ে গেছে, কিন্তু অন্য সব মানুষের বাড়ি-ঘরের দরোজা-জানালার কাঠ পাল্লায় তুলে ওজন করে বিক্রি হচ্ছে দোকানে। এগুলো অইসব লোকদের জীবনের অংশ এবং তাদের স্মৃতির সঙ্গে মিশে আছে। কাঠগুলোর সাথে জড়িয়ে আছে প্রত্যেকটি মানুষের জীবন, তাদের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ। ভেবো না, আমি তোমাকে ধরতে এসেছি। দেখতেই তো পাচ্ছ, আমার পা নেই। তাই দৌড়ে পালানোর কোন প্রশ্নই আসে না। ওরা আমার দুটি পা-ই কেড়ে নিয়েছে এবং বিনিময়ে আমাকে কাঠের এই ক্রাচ দিয়েছে। হয়তো ভাবছো, আমি একটা আস্ত উন্মাদ। কি, ভাবছো না? তুমি কি জানো, বাড়িটা আমার বাবার ছিল? প্রত্যেকটা কাঠের টুকরোর গায়ে আমি আমার ফেলে আসা জীবনের স্মৃতির রঙিন ছবি দেখতে পাই। আমার মেয়ের হাসির মিষ্টি সুর শুনতে পাই। অই কাঠটা দেখো? ওটা আমাদের পুরনো বাড়ির। হ্যাঁ, পালাও! এই কাঠের কাছ থেকে পালিয়ে যাও। আমার ছেলেমেয়ের স্পর্শ থেকে দূরে চলে যাও। এই কাঠের মধ্যে আমি আমার পুরনো ঘর-বাড়ির গন্ধ খুঁজে পাই। তোমার বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমি আমার বাড়ি-ঘরের ঘ্রাণ পেয়েছি। গন্ধটা এসেছে কাঠ থেকে, যা জ্বালিয়ে তুমি ঘর গরম করছিলে। আমার বাড়ি-ঘর, ছেলেমেয়ে এবং অতীত জীবনকে দেখতে এসেছি। এই কাঠের মধ্যে আমি আমার পুরনো ঘরের স্পর্শ অনুভব করে স্বস্তি পেতে চাই। কখনো কি তোমার কোন ঘর-বাড়ি ছিল? দীর্ঘ দিনের শেষে নিজের ঘরে ফিরে এসে তুমি কি কখনো শান্তি এবং আশ্বস্ত বোধ করেছো? এই কাঠগুলো আমার প্রয়োজন। যত মূল্যই হোক না কেন, আমি কাঠগুলো কিনতে চাই। কাঠগুলো আমি সযত্নে তুলে রাখবো, যাতে আমার ফেলে আসা জীবনের চিহ্ন, ছেলেমেয়েদের এবং শান্তিময় জীবনের স্মৃতি দেখতে পারি। হায় আল্লাহ্, হায় মা’বুদ।’
আমি থামি। পুনরায় পেছন ফিরে তাকাই। খুব বেশি অন্ধকার নয়। চাঁদের অনুজ্জ্বল আলোয় ঢেকে গেছে বাড়ি-ঘর এবং সড়ক। রাস্তাটা বেশ শান্ত। কোথাও কোন পথচারীর পায়ের শব্দ নেই। বোধহয় লোকটি আমার পিছু নেওয়া থেকে বিরত আছে, কিন্তু তবুও আমি পুনরায় দৌড়ুতে থাকি। একসময় শুনতে পেলাম উল্টো দিক থেকে লোকজন আমার দিকে ছুটে আসছে। ছেলেমেয়ে এবং মহিলাদের চেঁচামিচি উচ্চ থেকে আরো উচ্চতর হচ্ছে ।
আমি রাস্তার একপাশে থেমে দেখি অসংখ্য মহিলা এবং ছেলেমেয়েরা আমাকে পাশ কেটে চলে গেল। সবার শরীরে গরিবী হালের পোশাক এবং সবাই আহত। তাদের মাথা এবং মুখমণ্ডল ব্যান্ডেজ দিয়ে মুড়ানো। গায়ের কাপড়ে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ লেগে আছে। ওরা কিছু একটা বলছিল, কিন্তু কান্না এবং চিৎকারের জন্য কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। আমার মনে হচ্ছিল পায়ের নিচের মাটি কাঁপছে, এমনকি আকাশের এক কোণে ঝুলে থাকা চাঁদের সাথে তারাগুলোও কাঁপছে। প্রত্যেক মহিলা এবং ছেলেমেয়েদের হাতে কাঠের টুকরো। পুরনো বাড়ি-ঘরের দরোজা-জানালা, আলমারি ও বইয়ের শেল্ফ ভেঙে কাঠের টুকরোগুলো আনা হয়েছে। সবাই চিৎকার করে বলছে, ‘আমাদের বাড়ি, আমাদের ঘর।’
ওরা কাঠের টুকরোগুলো উপরের দিকে উঁচিয়ে ঘোরাচ্ছিল। তাতে আমার ভীষণ ভয় করছিল। আমি দৌড়ে অন্য রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াই। একসময় নিজেকে আবিস্কার করি আমি কাঠের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। চাঁদের আলোয় বাজারের দোকানগুলো উজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। বাজারে লোকে লোকারণ্য। শত শত নারী-পুরুষ, ছেলেমেয়ে, গরুর গাড়ি, দাড়ি-পাল্লা, আগ্নেয়াস্ত্র, ক্রেতা এবং বিক্রেতা। সব জায়গাতেই কাঠের স্তুপ। কোনটা অর্ধেক পোড়া, কোনটার গায়ে রক্তের দাগ। মানুষজনের মুখ ধুলোবালিতে একাকার। দাড়ি-পাল্লার একদিকে কাঠ, অন্যদিকে বাটখারা। টাকা পয়সা এক হাত থেকে অন্য হাতে বদল হচ্ছে।
‘দেখ, দেখ, কেমন করে ওরা আমার জীবন বিক্রি করছে, কেমন করে কাঠ কিনে নিয়ে আগুনে পোড়াচ্ছে। পালাও। অবশ্যই তুমি পালিয়ে যাও।’ আচমকা বাজারের ভীড়ের মাঝ থেকে বেরিয়ে আসে পা-বিহীন লোকটি। আমার দিকে দৌড়ে এসে সে ক্রাচ দিয়ে আমাকে আক্রমণ করে। মাথায় আঘাত করার জন্য আমি এক ধরনের সূক্ষ্ম ব্যথা অনুভব করি এবং আর্তচিৎকার করতে থাকি। একসময় আমি উঠে দাঁড়াই। বাতি জ্বালিয়ে আমি হিটারের দিকে তাকালাম। সব কিছু ঠিকঠাক আছে। তবে ঘরের ভেতর কেমন জানি ভয়াবহ নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে, এমনকি বাইরের গুলির আওয়াজ এবং বোমার শব্দ অনেকটা ম্লান। হয়তোবা সে রাতেই যুদ্ধের বিরতি হয়েছে।
পরদিন ঘরের সমস্ত কাঠ আমাদের রাস্তার দোকানদারকে দিয়ে দিই। কিন্তু দুঃস্বপ্ন আমাকে কিছুতেই শান্তিতে থাকতে দেয়নি। যেখানে যাই না কেন, লোকটির কন্ঠস্বর আমার কানের ভেতর অনুরণিত হতে থাকে। আমি আর কোন ভস্মস্তুপ দেখতে পাইনি। একসময় ওখান থেকে অন্যত্র চলে যাই।
বসন্তকালের শুরুর দিকে কোন এক সকালে, আগের রাতে তুষার পড়ার জন্য যখন বাইরের আবহাওয়া ছিল ঠাণ্ডা, আমি হাঁটতে বেরিয়েছি। অসময়ে তুষারপাত এবং ঝড়ের জন্য গাছের সমস্ত ফুল ঝরে গিয়েছে, যার জন্য সবারই মন খারাপ লাগছিল।
আমাদের রাস্তার শেষপ্রান্তে অবস্থিত গোরস্থানের পাশ কেটে আমি যেতে থাকি। তাকিয়ে দেখি কয়েকজন পথচারী একটা শবের উপর বাঁকা হয়ে আছে। লাশটা পঙ্গু লোকটির, যার পা ছিল না। লাশর পাশেই ক্রাচ পড়ে আছে। পাগড়িটা তখনো তার গলায় জড়ানো। পড়নের কাপড় ময়লা এবং তাতে রক্তের দাগ লেগে আছে। রাতের বেলা কুকুর তার মুখের খানিকটা খেয়ে ফেলেছে। গুলিতে সে মারা গেছে। হাতের মুঠোয় সে কয়েক টুকরো কাঠ ধরে রেখেছে। কাঠগুলো নীল রঙের। মনে হয় কারোর জানালা কিংবা শেল্ফের। কেউ তাকে চেনে না কিংবা কেউ জানে না কেন তার কাছে কাঠের টুকরো। আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছি। গোরস্থানের দিকে তাকাই। দেখি, একটা নিঃসঙ্গ বৃক্ষের সমস্ত পুষ্পরাজি বিবর্ণ হয়ে গেছে।
লেখক পরিচিতি: কাদের মোরাদির জন্ম দক্ষিণ আফগানিস্তানে। তিনি কাবুলে পড়াশোনা করেন। গত শতাব্দীর আশির দশকে আফগানিস্তানের বিভিন্ন ম্যাগাজিনে তার ছোটগল্প প্রকাশিত হয়। তখন থেকেই তিনি নিজেকে একজন সফল গল্পকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার বাস্তববাদী গল্পে ফুটে উঠেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের আগ্রাসন, পরবর্তী সময়ের যুদ্ধের ঘটনাবলী এবং তালিবানদের শাসন। পার্শ্ববর্তী পাকিস্তানে কয়েক বছর নির্বাসিত জীবন কাটানোর পর স্থায়ীভাবে বসবাস করার উদ্দেশে তিনি ১৯৯৯ সালে নেদারল্যান্ডে গমন করেন। ‘দারি’ ভাষায় দুটি ছোটগল্পের সংকলন ছাড়াও তিনি উপন্যাস রচনা করেন। অনূদিত গল্পটি ‘এ ভয়েস ফ্রম দ্য এসেজ্’ গল্পের অনুবাদ। ‘দারি’ ভাষা থেকে ইংরেজিতে গল্পটি অনুবাদ করেন দাউদ রাজাউই। ইংরেজিতে গল্পটি ২০০৪ সালের অক্টোবর সংখ্যা ‘আফগানম্যাগাজিন.কম’-এ প্রকাশিত হয়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন